গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার সংখ্যা ক্রমাগতই বৃদ্ধি পাইতেছে। বিগত ৪ বত্সরে দেশে গণপিটুনিতে পাঁচশত ব্যক্তি নিহত হইয়াছে বলিয়া একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যে উল্লেখ রহিয়াছে। এই সকল গণপিটুনিজনিত হত্যাকাণ্ডের কোন প্রকার বিচার তো হয়ই না, বরং হত্যাকারীরা সব সময়ই ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থাকিয়া যায়। আইন হাতে তুলিয়া লওয়া জঘন্য অপরাধ কিন্তু কেন এবং কি অবস্থায় মানুষ আইন হাতে তুলিয়া লয় তাহাও বিবেচনা করিয়া দেখা দরকার। আইনের প্রতি গণমানুষের অনাস্থা সৃষ্টি হইলেও এই ধরনের গণপিটুনি এবং আরও নানান অরাজক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উপর যেমন গণতন্ত্রের তেমনি সমাজ শৃঙ্খলারও মজবুত ভিতটি গড়িয়া ওঠা নির্ভর করে। সমাজে মানুষের অপরাধপ্রবণতা তাহাদের এক প্রকার সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু অন্যায় ও অপরাধমূলক কার্যকলাপ হইতে তাহাদেরকে নিবৃত্ত করিতে বা বিরত রাখিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনই বিকল্প নাই। গণপিটুনিতে বহু নিরীহ-নিরপরাধ মানুষেরও প্রাণহানি ঘটিতেছে আর এ ক্ষেত্রে যাহারা গণপিটুনির সহিত জড়িত তাহাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা বা অনিচ্ছা প্রকারান্তরে এই ধরনের ঘটনার মাত্রা ও সংখ্যা কেবল বাড়াইয়া তুলিবে। যাহারা আইন প্রয়োগ করেন বা আইনের সুরক্ষার জন্য নিয়োজিত থাকেন তাহারাই যখন এহেন গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভাবলেশহীন থাকেন তখন বুঝিতেই হইবে যে দেশে ও সমাজে কোথাও কোন বড় ধরনের গলদ রহিয়া গিয়াছে। কোন ভয়ংকর অপরাধীকেও আইনের হাতে সোপর্দ করা এবং তাহাকে তাহার কৃত অপরাধের জন্য বিচারের সম্মুখীন করা একটি সভ্য সমাজের অবশ্য করণীয় বিষয়। কিন্তু আমাদের সমাজে তো নিয়ম-নীতি-শৃঙ্খলা অমান্য করিবার সংস্কৃতিই চালু করা হইয়াছে। ফলে সমাজে একদিকে যেমন ভয়ংকর সব অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিতেছে অন্যদিকে তেম্নি আবার জনসাধারণ আইন হাতে তুলিয়া লইতে উত্সাহী হইতেছে।
দেশে ২০১০ সালে গণপিটুনিতে ১৬৭ জন, ২০১১ সালে ১৪৫ জন এবং ২০১২ সালে ৯৯ জন ও চলতি বত্সরের অর্ধেক সময় অবধি ৭৩ জন প্রাণ হারাইয়াছে। এই সংখ্যা আমাদের সমাজ মানস ও সমাজ কাঠামোর এক অতীব দুর্বল দিক মেলিয়া ধরিতেছে বৈকি! জঘন্য কোন অপরাধীকেও এইভাবে গণপিটুনিতে হত্যা করা মানবাধিকার ও আইন বিরোধী। সুতরাং, অপরাধীকে জনগণের রুদ্ররোষের মুখে ঠেলিয়া দিয়া যাহারা অপরাধ ও অপরাধী দমনের স্বপ্ন দেখেন তাহারা আসলে আহাম্মকের স্বর্গেরই বাসিন্দা। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা মতে এহেন ঘটনা খুন হিসাবে বিবেচিত; কিন্তু পুলিশ যদি গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় আত্মপ্রসাদ লাভ করে তাহা হইলে উহাকে দারুণ অশুভ সংকেত রূপেই বিবেচনা করিতে হইবে নিশ্চয়ই। কেননা, তাহাদের নির্লিপ্তি এইসব জঘন্য অপরাধকে এক প্রকার বৈধতা প্রদানেরই শামিল। নিয়ন্ত্রণহীন জনগোষ্ঠী এইরূপে আইন হাতে তুলিয়া লইতে থাকিলে দেশের আইনী কাঠামোতে বিপর্যয় নামিয়া আসিতে বাধ্য!
২০১১ সালে শবে বরাতের রাতে আমিন বাজারে ৬ জন নিরীহ কলেজ ছাত্রকে পিটাইয়া হত্যা করিবার বিষয়টি এই ক্ষেত্রে স্মরণে আনিলে আমরা সমাজ অভ্যন্তরে লুক্কায়িত নারকীয় বীভত্সতার ভয়ার্ত রূপটিই দেখিতে পাই। এই জাতীয় ঘটনা কেবল আইনের শাসনের অনুপস্থিতিজনিত কারণেই ঘটিতে পারে এবং ঘটিয়া থাকে।
রাষ্ট্র পরিচালকরা আইনের শাসনের পরিবর্তে আইনকে নিজেদের নানান অবৈধ হীন লোভ চরিতার্থ করিবার কাজে ব্যবহার করিতে যাইয়া এই ধরনের করুণ ও হূদয় বিদারক ঘটনাবলীর ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া দেয়। আর ইহার ফলে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। মোদ্দাকথা, আইনের শাসনের বিষয়টিকে কেবল মুখের কথা হিসাবে বিবেচনা না করিয়া কার্যক্ষেত্রে উহার প্রতি সকল প্রকার সমর্থন ও শক্তি জোগানো সংশ্লিষ্ট সকলের ঈমানী কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে বৈকি!
