সিস্টেম লসের নাম করিয়া ভয়াবহ বিদ্যুত্ চুরির ঘটনা ঘটিতেছে ডেসকোতে (ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি)। এই অভিযোগ নূতন নহে। সমপ্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হইয়াছে এই সংক্রান্ত বিবিধ তথ্য ও পরিসংখ্যান। অভিযোগ উঠিয়াছে, কোম্পানির একশ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় ঘটিতেছে এই বিদ্যুত্ চুরির ঘটনা। ফলে সরকার সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধি করিয়াও তাত্পর্যপূর্ণভাবে হ্রাস করিতে পারে নাই লোডশেডিংয়ের চাপ।
বিদ্যুতে সিস্টেমলস হয় বিবিধ কারণে। তাহার ভিতরে যাহা যান্ত্রিক, অর্থাত্ মিটার রিডিং শুরুর পূর্ব অবধি সঞ্চালন লাইন হইতে শুরু করিয়া বিদ্যুত্ বিতরণের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের কারণে ঘটিত সিস্টেম লস বাদ দিলে যাহা থাকে তাহা হইল, অবৈধ সংযোগ ও মিটার রিডিং টেম্পারিংসহ বিভিন্ন দুর্নীতি। ডেসকোর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহিত কিছু গ্রাহকের যোগসাজশের মাধ্যমে গঠিত সংঘবদ্ধ চক্রের ছত্রছায়ায় বত্সরের পর বত্সর বিদ্যুত্ চুরির সিলসিলা চলিতেছে। যেইহেতু যাহারা চুরি আটকাইবে তাহারাই এই দুষ্কর্মের পৃষ্ঠপোষক, সুতরাং তাহার মূলোত্পাটন এত সহজ নহে। পত্রিকান্তরেই জানা গিয়াছে, বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ভিতরে বর্তমানে ডেসকোতে সর্বাধিক সিস্টেম লস হইতেছে ৯ শতাংশ। অভিযোগ যে, এই সিস্টেম লসের পুরো অঙ্কই নাকি শুভঙ্করের ফাঁকি! বাস্তবে সিস্টেম লস যাহা দেখানো হইতেছে তাহার বেশিরভাগ বিদ্যুত্ ডেসকোর গোপন নিলাম গ্রহীতারা অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিক্রি করিতেছে। জানা যায়, এক সময় ডেসকোতে সিস্টেম লস ছিল ৪৭ শতাংশ, শক্ত হাতে পড়িয়া তাহা অর্ধ দশক পূর্বে নামিয়া আসে ১১ শতাংশে। বিদ্যুত্ বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন, ইহাও ছিল ডেসকোর আরেক শুভঙ্করের ফাঁকি। কারণ কাগজে-কলমে এই সংখ্যা বলা হইলেও বাস্তবে তাহা দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। প্রকৃতপক্ষে বিবিধ যান্ত্রিক কারণে বিদ্যুত্ বিভাগের পক্ষ থেকে ডেসকোর সিস্টেম লস ৪/৫ শতাংশের অধিক হইবার কথা নহে। ডেসকোকে এই পর্যায়ে সিস্টেম লস নামাইয়া আনিবার নির্দেশও দেওয়া হইয়াছে বহুবার। কিন্তু তাহা কেন কার্যকর হইবে? তাহা হইলে তো অবৈধ উপায়ে অভাবিত অর্থ উপার্জনের পথ রুদ্ধ হইবে সকলের জন্য। একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের প্রদান করা হিসাব অনুযায়ী বিদ্যুত্ খাতে চুরি-দুর্নীতির পরিমাণ প্রতি বত্সর গড়ে ২ হাজার কোটি টাকা। ইহার ভিতরে অতিরিক্ত কারিগরি এবং বিতরণে অনিয়মের ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে দেড় হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্যখানে। সিস্টেম লস-কথিত যেই পরিমাণ বিদ্যুত্ চুরি হইতেছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইতেছে তাহা নিপাট অপচয়, কিংবা সরকারের ষোলআনা লোকসান—এমন সরলীকরণ সিদ্ধান্ত কি সঠিক চিত্র প্রকাশ করে? বিদ্যুত্ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উত্পাদনমুখী ও জনমুখী কাজে লাগিয়া থাকে। মিটার টেম্পারিং হউক, কিংবা শত সহস্র অবৈধ সংযোগ হউক, তাহাদের বহুলাংশ উত্পাদনশীল খাতেই ব্যয়িত হইতেছে। অর্থাত্ পরোক্ষভাবে তাহা আমাদের অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করিতেছে। সেইখানে যদি কিয়দখানিক ‘সিস্টেম লস’নামধারী বিদ্যুত্ লোপাট হয়, তাহা অতি ভয়াবহ নহে বটে, তবে ইহাকে উত্সাহিত করিবারও কিছু নাই। অন্যদিকে, এই চিত্রের পাশাপাশি আমরা দেখিতেছি সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের আরেকটি ভয়ঙ্কর চিত্র। কয়েক মাস পূর্বেই সংসদে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছেন—সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিকট বিদ্যুতের বিল পাওনার পরিমাণ তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। অর্থাত্ সিস্টেম লসের নামে (যাহার ব্যয় ঘটে পরোক্ষ উত্পাদনশীলতাতেও) যদি দেড় হাজার কোটি টাকা উধাও হইয়া যায়, তবে তাহার দ্বিগুণ অর্থ বকেয়া পড়িয়া রহিয়াছে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই। গ্যাসের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়াছে মোট বকেয়ার অর্ধেকই রহিয়াছে সরকারের।
প্রকৃতপক্ষে সরকারের নিজেরই এইসব বকেয়া ঠিকমতো আদায় না হইবার কারণে বিদ্যুত্ বা গ্যাস জাতীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির দায়ভার পরোক্ষভাবে চাপিয়া বসিতেছে জনগণের ওপর। সুতরাং—‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’।
