মাছে-ভাতে বাঙালির দেশে মত্স্য-নিরাপত্তা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৯
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমে আমাদের মৌলিক প্রাপ্তি হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা বদ্বীপ বেঙ্গল ডেল্টার উর্বরতম মাটি। এ মাটিকে নিয়ে অহংকার করেছেন ইতিহাসের মহামানবেরা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের বিভিন্ন লেখনিতে এ মাটিকে সোনার সাথে তুলনা করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়ার আজীবন স্বপ্ন ছিল এ মাটি-কেন্দ্রিক। পৃথিবীর অন্যতম তিনটি বড় নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাবাহিত পলি দ্বারা গঠিত এ মাটি এবং এর গঠন প্রক্রিয়া এখনও চলমান। ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি অতি উর্বর প্রকৃতি যাতে সৃষ্টি হয়েছে এক সুবিশাল জীব-বৈচিত্র্যের। প্রায় ৬০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ১৬০০ প্রজাতির মেরুদন্ডী প্রাণীর বিচরণ এখানে। মেরুদন্ডী প্রাণীগুলোর মধ্য প্রায় অর্ধেকের মত রয়েছে মত্স্য প্রজাতি যার বিস্তার প্রতি ২০০ বর্গকিলোমিটারে একটি করে। এ প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করলে এক চমত্কার চিত্র ফুটে উঠে। যুক্তরাষ্ট্র আয়তনে বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৬৭ গুণ বড় এবং সেখানে মত্স্য প্রজাতির সংখ্যা ১১০০টি। ভৌগলিক বিস্তার অনুযায়ী সেখানে প্রতি ৮৫০০ বর্গকিলোমিটারে রয়েছে একটি মত্স্য প্রজাতি। সে হিসাবে বাংলাদেশ মত্স্য প্রাচুর্যের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৪০ গুণেরও বেশি ধনী। এ কারণেই আমাদের খাদ্য তালিকায় প্রধান খাদ্য ভাতের সাথে মিশে আছে মাছ, ফলে আমরা মাছে-ভাতে বাঙ্গালি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ বিশাল মত্স্য ভাণ্ডার অনিয়ন্ত্রিত বিদেশি প্রজাতি অনুপ্রবেশের কারণে আজ হুমকির সম্মুখীন। মত্স্য বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে প্রায় ৩০০ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ থেকে মাত্র হাতে গোনা ১০-১২টি মাছকে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। এতেই বাংলাদেশ মাছ চাষ তথা একোয়াকালচারের মাধ্যমে মাছ উত্পাদনকারী ১৫টি সেরা দেশের মধ্য পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ মিলে একোয়াকালচার হতে মোট মাছ উত্পাদন করে ১২.৬১ লাখ টন, অথচ ছোট্ট বাংলাদেশ এককভাবে উত্পাদন করেছে প্রায় ১৭.২৬ লাখ টন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে একোয়াকালচার একটি নবীন গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্র। বিগত ৩০ বছরের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশীয় রুই-কাতলা জাতীয় বড় মাছ চাষের আওতায় আসে। কয়েক বছর আগেও দেশীয় শিং-মাগুর মাছ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা যাবে কি না -তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। বর্তমানে পোনা উত্পাদন, খাদ্য উত্পাদন ও চাষ-পদ্ধতি উদ্ভাবন হওয়ার মাধ্যমে এ সমস্ত মাছের চাষ প্রক্রিয়া নিবিড়তর হচ্ছে এবং সার্বিক মত্স্য উত্পাদন বেড়ে যাচ্ছে। এরকম অনেক সম্ভাবনাময় মত্স্য প্রজাতিকে চাষ প্রক্রিয়ায় আনার জন্য গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিং-মাগুর মাছের মত এরকম প্রজাতিগুলো চাষের আওতায় আসার কারণে একোয়াকালচার পদ্ধতি বাণিজ্যিক রূপ লাভ করছে। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান স্বল্পসময়ে অতি লাভের আশায় একের পর এক ভিনদেশি মত্স্য প্রজাতি আমদানি করে যাচ্ছে। কিছু প্রজাতি আনা হয়েছে কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে আর কিছু অনুমতি ছাড়া, তবে উভয় ক্ষেত্রে কোন প্রকার কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আভিধানিক অর্থে কোয়ারেন্টাইন হলো এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোন জীবকে স্থানান্তরের সময় আলাদাভাবে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয় যাতে করে জীবটি কোন ধরনের রোগের বিস্তার ঘটাতে না পারে অথবা কোন রোগ দ্বারা আক্রান্তও হতে না পারে। সামপ্রতিক সময়ে উন্নত জাতের তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, পিরানহা, থাই কই, ভিয়েতনাম কই, কুচিয়া প্রভৃতি নামের মাছগুলো কোনরকম কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই আনা হয়েছে যার ভবিষ্যত্ নেতিবাচক পরিণাম অবশ্যম্ভাবী। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অনুমোদনহীন চিংড়ি পোনার (পিএল) প্রবেশ বাংলাদেশের চিংড়ি খামারে রোগের কারণ বলে স্থানীয় পোনা ব্যবসায়ীরা মনে করেন। গত কয়েক দশকের ইতিহাস থেকে জানা যায় বাংলাদেশসহ অন্যান্য অনেক দেশে উন্নত জাতের ব্রুড মাছের নামে মাছ অনুপ্রবেশের কারণে ভাইরাসজনিত রোগ বিশেষ করে ‘হোয়াইট স্পট ডিজিস’ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। EUS (Epizootic Ulcerative Syndrome) নামক মাছের রোগ নব্বইয়ের দশকে প্রথমে বাংলাদেশে দেখা যায়, যার উত্পত্তি মূলত স্থল জাপান, কিস্তু এটি বাহারী ও ব্রুড মাছ আমদানি-রফতানির মাধ্যমে এশিয়ার অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এ রোগটি বিস্তারের কারণে মাছ চাষীদের প্রতিবছরই বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে কৃষির অন্যান্য ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার Plant Quarantine Act–2011 প্রণয়ন করে। এর আওতায় কোন উদ্ভিদ এবং অনুজীব দেশে আমদানি বা বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এটি কেহ অমান্য করলে শাস্তি প্রদানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ স্থল বন্দরগুলোতে ফাইটো-স্যানিটারী পদ্ধতি স্থাপন করে উদ্ভিদ বা অনুজীবের অনুপ্রবেশকে কোয়ারেন্টাইন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর Animal Quarantine Act-2005 এর আওতায় বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকার ১৭টি জেলাতে বিভিন্ন স্থল-বন্দর দিয়ে পশু আমদানির পথে ২৪টি কোয়ারেন্টাইন স্টেশন স্থাপনের কাজ শুরু করেছে। ইতিমধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটিসহ মোট ৪টি পশু কোয়ারেন্টাইন স্টেশনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ব্যাংককে ১৯৯৮ সালে এফএও কর্তৃক আয়োজিত বাংলাদেশের উপকূলীয় চিংড়ি চাষে রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি কর্মশালায় বাংলাদেশে মত্স্য কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি চালুর ব্যাপারে একটি সুপারিশমালা প্রণীত হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় জলজপ্রাণী স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তৈরি, ডায়াগনোসিস সেন্টার নির্মাণসহ কোয়ারেন্টাইনের অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু অনেকদিন পরে গত ২০১২ সালে সরকার কোয়ারেন্টাইন আইন প্রণয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও তার কোন অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্বে জলজ প্রাণীর অন্তঃ ও আন্তঃ দেশীয় স্থানান্তরের ফলে নানান রোগের বিস্তারে সতর্কতা অবলম্বন অতীব জরুরি। কারণ এশিয়ার অনেক দেশে বাণিজ্যিক একোয়াকালচারে বিভিন্ন ঔষধ ব্যবহারের কারণে ঐ সমস্ত দেশের মাছে বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী রোগ জীবাণুর সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো মাছ আমদানি করা মানে রোগ জীবাণু আমদানি করা যা আমাদের দেশীয় মাছ ও অন্যান্য প্রাণির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। মত্স্য হ্যাচারী আইন-২০১০ অনুযায়ী মহাপরিচালক বা তার নিকট হতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পূর্বানুমোদন গ্রহণ ব্যতিত কোন ব্যক্তি বিদেশ হতে কোন জীবিত মত্স্য, রেণু, পোনা বা পিএল (পোস্ট লার্ভা) আমদানি করতে পারবে না। কিন্তু এ আইনে কোয়ারেন্টাইন সম্পর্কে কোন প্রকার দিক-নির্দেশনা নেই। দেশীয় প্রজাতির কোন উন্নত জাতের ব্রুড মাছ (অবশ্যই শতভাগ কৌলিতাত্ত্বিক মিল রেখে) আনতে গেলে বিমান বন্দরসহ অন্যান্য বন্দরগুলোতে কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি স্থাপনের আন্তর্জাতিক বিধান রয়েছে। সাধারণত নির্দিষ্ট বিমান বন্দর হতে ৩০ মিনিটের ড্রাইভিং দূরত্বে কোয়ারেন্টাইন স্টেশন স্থাপন করতে হয়। ঢাকাস্থ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের কাছাকাছি কোথাও এ ধরনের স্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে। মত্স্য অধিদপ্তরের অধীনে গাজীপুরের বোর্ড বাজারস্থ মত্স্য বীজ উত্পাদন খামারটিকে কোয়ারেন্টাইন স্টেশনে রূপান্তরিত করা যেতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ে অনেক মত্স্য হ্যাচারী স্থাপিত হওয়ার কারণে বাণিজ্যিক এলাকায় এ ধরনের খামারের গুরুত্ব কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী কোন জলজ প্রাণী আমদানির সময় প্রয়োজনে তিন বছর পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইন ভিত্তিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, কিন্তু বাংলাদেশ এ বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে মত্স্য অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। লেখক :প্রফেসর, একোয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন