জিন বদলিয়ে উত্পাদিত (বিটি) বেগুন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা তাহা স্বাধীন গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণের পূর্ব পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে না ছাড়িবার নির্দেশ দিয়া হাইকোর্ট সাধুবাদ পাইবার মতো কাজ করিয়াছেন। বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য সবজি বেগুন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন জাতের বেগুন পাওয়া যায়। সেই সকল জাতের বেগুনসমূহকে জেনিটিক্যালি মডিফায়েড করিয়া বহুজাতিক বীজ কোম্পানি মনসান্তো ও ভারতীয় সহযোগী একটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বাংলাদেশে বিটি বেগুন প্রচলনের জোর প্রচেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে। বারি’র গাজীপুর কেন্দ্রীয় গবেষণা খামার ব্যতিরেকেও আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রসমূহে যেমন— রংপুর, যশোর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বগুড়া ও বরিশালে গবেষণা চলিতেছে। যতোদূর জানা যায়, দেশের নয়টি স্থানীয় জাতের বেগুন বিটি বেগুন উদ্ভাবনের কাজে ব্যবহার করা হইয়াছে। এই জাতসমূহ হইতে উদ্ভাবিত বিটি বেগুন বাজারজাতকরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হইয়াছে এবং কৃষিমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী অনুমোদন প্রদানের আভাসও দিয়াছেন। ফলে, উচ্চ আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা বিটি বেগুন প্রচলন প্রয়াসের রাশ ক্ষণিকের জন্য হইলেও টানিয়া ধরিতে পারিয়াছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান মনসান্তো ও ভারতের প্রতিষ্ঠান মাহিকো যৌথভাবে জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিটি বেগুন উদ্ভাবকদের দাবি, এই বেগুনে কীটনাশকের ব্যয় কমিয়া যাইবে, ফলনও হইবে বেশি। প্রচার চালানো হইতেছে: এই বেগুনে পোকা ধরিবে না, কখনও পচিয়া নষ্ট হইবে না, কীটনাশক দেওয়ারও প্রয়োজন হইবে না। ফলে দেশে বেগুন চাষে বিপ্লব ঘটিবে। জিইএসি এই বীজ বাজারে ছাড়িবারও অনুমতি দেয়। সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরই এর বিরোধিতা শুরু করে পরিবেশবাদী ও কৃষকরা। তাহাদের অভিযোগ, এই সবজির মাধ্যমে মানুষের শরীরে ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের জীবাণু ছড়াইয়া পড়িবে। বীজের ওপর একাধিপত্যের কারণে ইচ্ছামতো দাম বাড়াইবে উত্পাদক কোম্পানি। পরিবেশবিদরা বলিতেছেন, জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত বিটি বেগুন মানবশরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগ তৈরি করিতে পারে। পরিবেশেরও ক্ষতি করিবে এই বীজ। ২০০৫ সাল হইতে ভারত, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনে বিটি বেগুন উদ্ভাবনের কাজ শুরু হইলেও ভারত ও ফিলিপাইন সরকার বিটি বেগুন চাষ ও বাজারজাতকরণের অনুমতি প্রদান করেনি এর ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার অনুমোদন প্রদানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করিতে যাইতেছে। এই উদ্ভাবিত জাতের বেগুনের চাষাবাদ করা হইলে যেমন মানব স্বাস্থ্য, কৃষি প্রাণ বৈচিত্র্য ও পরিবেশের উপর মারাত্মক আঘাত আসিবে তেমনি হারাইয়া যাইবে আমাদের হাজার বত্সরের বেগুনের জাত, বেগুনের জন্য আমাদের নির্ভরশীল হইতে হইবে বহুজাতিক বীজ কোম্পানির উপর।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মানব সৃষ্ট একটি প্রযুক্তি যাহাকে আধুনিক সভ্যতার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসাবে উপস্থাপন করা হইতেছে। বলা হইতেছে, এই প্রযুক্তি অল্প জমিতে বেশি উত্পাদন করে, বেশি মানুষের চাহিদা পূরণের যুগান্তকারী আবিষ্কার এইটি। পক্ষান্তরে তথ্যাভিজ্ঞমহলের অভিমত; এই প্রযুক্তি হইল বহুজাতিক বীজ-সার-কীটনাশক ব্যবসায়ীদের বৈধতাদানের যুগান্তকারী আবিষ্কার। একদিকে দরিদ্র দেশসমূহের কৃষকের বীজের অধিকার হরণ করা, অন্যদিকে সার-কীটনাশকের বেড়াজালে আবদ্ধ করিয়া কৃষককে পরনির্ভরশীল করিবার মোক্ষম উপায় হইল জেনেটিক প্রযুক্তি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০০২ সাল হইতে জিনপ্রযুক্তির শস্য তুলা চাষ হইতেছে। সেখানে নিয়মিতভাবে হাজার হাজার তুলা চাষির আত্মহত্যা দেখাইয়া দিতেছে উচ্চফলনের লোভ দেখাইয়া জিএম বীজ ও চাষ পদ্ধতি কৃষকের জীবনের জন্য কতোটা ভয়াবহ পরিণতি লইয়া আসিতে পারে। এইসব কারণেই ভারত ২০১০ সালে জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত বিটি বেগুন বাজারজাতকরণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। বিটি বেগুনই জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রথম সবজি হিসাবে বাজারজাতের অনুমতি পাইয়াছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ জিনপ্রযুক্তির সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা উত্পাদন করিলেও কোনো দেশই এই প্রযুক্তির সবজি চাষের অনুমতি দেয় নাই। তাহা হইলে বাংলাদেশ কেন জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিটি বেগুন বাজারে ছাড়িবার অনুমতি দিবে?
