দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে দু’টি দেশই তাদের সবকিছু বিনিময় করে থাকে। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের সামপ্রতিক ঢাকা ও নয়াদিল্লী সফরের বিনিময়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ভারত সরকারের জোরালো উত্থাপনের মাধ্যমে প্রত্যাশা জাগে। গত দেড়বছর ধরে যেটা উভয় দেশের সমপর্কের ক্ষেত্রে রোলার-কোস্টারের রূপ ধরেছিল তা গত কয়েকমাসে কাটতে শুরু করেছে। এটা উভয় দেশের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার সমন্বয় বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সমপর্কে গত দুই দশক ধরে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বারবার হতাশ করেছে।
১২ বছর বয়সী বাংলাদেশি কিশোরী আফরোজা খাতুনকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে প্রায় চার বছর ভারতে অন্তরীণ রাখা হয়। সৌভাগ্যক্রমে সে জীবিত ফিরতে পারলেও, বন্দী থাকা অবস্থায় তার মাকে হারায়। কিন্তু জীবিত ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি কিশোরী ফেলানীর। ২০১১ সালের শুরুর দিকে বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্ন নিয়ে সে তার দেশে ফিরে আসতে চেয়েছিল। বাবার হাত ধরে সীমানা পার হতে গিয়ে বিএসএফ-এর গুলিতে লাশ হয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাঁটাতারে ঝুলতে হয়েছে ফেলানীকে। আফরোজা কিংবা ফেলানী দু’জনই অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল জীবিকার তাগিদে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার হল ফেলানী হত্যা মামলার বিচারের রায়ে ফেলানীর হত্যাকারী ঐ কনস্টেবলকে নির্দোষ প্রমাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আর্তচিত্কার ও মানবাধিকার কর্মীদের জোরালো অবস্থানের কারণে এ রায়ের বিরুদ্ধে দেওয়ানী আদালতে আপীল করার একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কী হতে যাচ্ছে তা নীরবে তাকিয়ে দেখা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ঐ অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে। এ বিষয়ে ভারতীয় নাগরিকদের গণমাধ্যমে দেয়া মন্তব্যগুলো অত্যন্ত পীড়াদায়ক ঠেকেছে। তারা এটাকে সন্ত্রাসবাদ বলছে এবং ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে এটা ঠেকানো প্রয়োজন মনে করছে। এ বিষয়ে আমিও তাদের সাথে একমত। কিন্তু এটার জন্য গুলি করে হত্যা কেন? এর পরিবর্তে গ্রেফতার করলে হয় না? বিশেষ করে যখন একজন ব্যক্তি ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করছে। কিছুদিন আগে মিডিয়াগুলোতে একক নজরদারির সম্ভাবনার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ব্যাপারে কিছু না বলাই ভালো। যে কোন দেশের জন্য সীমানার নিরাপত্তা ভাবনাটা খুবই স্বাভাবিক। এ বিষয়টি পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে। তবে ভারত এ ব্যাপারে ভারত সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, পূর্ব আলোচনা ব্যতীত তারা কোন সিদ্ধান্ত নেবে না।
ভারতের এটাও বিবেচনা করা উচিত, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা হতে হাজার হাজার মানুষ ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করছে। এদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, এশিয়ার অন্য দেশসহ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিকরা আছে। ইউরোপ ও আমেরিকাতে এ ঘটনা উভয় দেশের স্বার্থে বিবেচ্য। এ ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য কঠোর নিয়ম-শৃংখলা ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের হত্যা না করে গ্রেফতারের আওতায় আনা উচিত। সেই বিবেচনায় গত দুই দশকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রায় কয়েকশ’ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা হবে বলে ভারতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা আমাদের বারবার আশ্বস্ত করেছে। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে ভারত সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যারা বৈধ দলিল ছাড়া প্রবেশ করছে তাদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারে। তাদের আপনারা হত্যা করবেন না। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার মত অপরাধ তারা করে না। ল্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্ট চুক্তি সমপাদনে অপারগতা ভারত সরকারের বড় ধরনের ব্যর্থতা। এদিকে ভারতের সংসদের মৌসুমী অধিবেশন শেষ হয়ে গেছে। ন্যাশনাল ফুড সিকিউরিটি বিল, রাইট টু ফেয়ার কম্পেন্সেশন এন্ড ট্রান্সপারেন্সী, রিহ্যাবিলিটেশন এন্ড রিসেটলমেন্ট বিলের মত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিলে বিরোধী দলের সমর্থন আদায়ের জন্য কংগ্রেস একটি সভা আহবান করেছিল। কিন্তু এতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী রাজ্যসভায় বাংলাদেশ-ভারত ভূমি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ভারতীয় সংবিধানের ১১৯তম সংশোধনী বিলের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ও আসাম গণপরিষদের বিরোধিতার মুখে তা ব্যর্থ হয়। ভারত সরকার বিজেপি নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেও কিছু করতে পারেনি। বিজেপি নেতারা এতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থানই সবচেয়ে বড় বাধা। বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা নির্ধারণে হেগের সালিশী আদালতের রায় কি হবে তাও অনিশ্চিত। তবে ২০১২ সালে আইটিএলওএস-এর বিচারে মিয়ানমারের সাথে সমুদ্র সংক্রান্ত সমস্যার একটি সন্তোষজনক সমাধান আমরা পেয়েছি।
তিস্তার পানি বন্টনের ক্ষেত্রেও তৃণমূল কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গ অংশের নেতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী তিস্তার পানি বন্টনের ক্ষেত্রে সব আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী মত পোষণ করছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের পানির উত্স তিস্তা। মমতার সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এসবের একমাত্র কারণ হল পারস্পরিক সহযোগিতার অভাব। দু’দেশের বাণিজ্যিক সমপর্কও বিবেচ্য। বিশেষ করে ভারতে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের বাণিজ্য সচিবের সমপ্রতি ভারত সফরে বিষয়টি উঠে এসেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, বাণিজ্য সচিব নয়াদিল্লীতে ভারতের রাজস্ব সচিবের সাথে বৈঠককালে ভারতে কম শুল্কে বা বিনাশুল্কে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বিষয়ে আলোচনা করেন। শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য তিনি ভারত সরকারের প্রতি আহবান জানান।
২০১২-২০১৩ অর্থবছরে উভয় দেশের রাজস্ব অনুযায়ী ভারত ৪.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের ডেপুটি হাই-কমিশনারের সমপ্রতি কলকাতা সফরে দেয়া এক মন্তব্যে জানা যায়, সাফটা চুক্তির অধীনে ভারত বাংলাদেশের তামাক ও মাদকদ্রব্য ব্যতীত বেশ কিছু পণ্য বিনাবাধায় প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও বললেন- সাবান, ভোজ্যপণ্য, জামদানি শাড়ি এসব পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেতে রপ্তানিকারকদের বেশ বেগ পেতে হয়। যেহেতু সীমান্তে পরীক্ষা করার কোন ব্যবস্থা নেই, তাই এসব পণ্য পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠাতে হয়। এটা খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টায় সীমান্তে চেকপোস্টের ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব ।
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার একটি গঠনমূলক সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সরকার কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ভারত বরাবরই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রেও তারা ব্যর্থ। ভারত সরকারের এটা অনুধাবন করা উচিত যে তাদের এ অনীহা কেবল আশঙ্কারই জন্ম দিচ্ছে এবং তা বাংলাদেশের সাথে ভারতের ভবিষ্যত্ সমপর্ক কেমন হবে তারই ইঙ্গিত বহন করছে। তবে আমি আশান্বিত গত কয়েকদিনের ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষিতে। আমি এই ক্ষেত্রে আমাদের এবং ভারতের বিদ্যুত্ সরবরাহের জগতে দ্বৈত পদক্ষেপকে অভিনন্দন জানাই। আমি এও বিশ্বাস করি, রাজনেতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে আমরা। দুই দেশ, একটা দৃষ্টান্তস্থাপন করতে পারবো দক্ষিণ এশিয়ার বুকে।
ভাষান্তর :আকলিমা জান্নাত আরজু
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
