[ দি ব স ]

বয়োবৃদ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন মমতা ও পরিচর্যা

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩৩
যে যা-ই বলুক, সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায় যৌবন— কেবল সাক্ষী হয়ে থাকে অতীতের সাফল্য, নিজের সৃষ্টি বা কর্মময় ঐশ্বর্য। তবে বার্ধক্য মানে শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতা নয় কেবল। তবুও অসুস্থতা আসে। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানির পেছনেও জড়িয়ে আছে অসংযত জীবনযাপন। যৌবনের মধ্যগগনে যারা জ্বলজ্বল করছেন, কিংবা সূর্য পশ্চিমে ঢলেছে যাঁদের, অস্তগামী হতে আর দেরি নেই। কখন অগোচরে চলে আসবে বার্ধক্য, টেরই পাওয়া যাবে না। তাই বলে কি সবকিছু থেমে যাবে? মনে রাখা দরকার, বার্ধক্যের গতি শ্লথ করা যায়। বার্ধক্য মানে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়। মৃত্যু অবধারিত, রোধ করা যাবে না এটা শাশ্বত সত্য। কিন্তু বার্ধক্যেও সুস্থ থাকা যায়, থাকা যায় তারুণ্যময়। বিশৃঙ্খলার পরিবর্তে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ধরে রাখতে পারে সুস্থতা। বৃদ্ধ বয়সেও প্রশাস্তি পেতে হলে সঠিক পরিচর্যার পুঁজি খাটাতে হবে যৌবনেই। কেন ফুরিয়ে যায় যৌবন? কেন পরিবর্তন আসে দেহ-মনে? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে ব্রেনের পুরুত্ব, ওজনও কমে আসে। এক গবেষণায় দেখা গেছে ৩০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে ব্রেনের ওজন পাঁচ শতাংশ কমে যায়, ৮০ বছরে দশ শতাংশ এবং ৯০ বছরে কমে প্রায় ২০ শতাংশ। প্রকৃতপক্ষে নানা কারণে বার্ধক্যে জমে যেতে থাকে স্নায়ুকোষের সাইটোপ্লাজম, ক্ষয়ে যায় নিউরনের প্রসেস বা প্রশাখা— ডেনড্রাইট। এভাবে হ্রাস পায় কোষের বিভিন্ন উত্পাদন। গঠনেও আসে পরিবর্তন। মনস্তাত্ত্বিক গড়নেও ধস নামে, স্মরণশক্তি কমে যেতে থাকে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হতে পারেন অনেক প্রবীণ। এদের হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটার (ব্রেনের রাসায়নিক উপাদান) নিঃসরণে পরিবর্তন আসে। একসময় দেখা যাবে কোষের কোলাজেন ফাইবারও ধরে রাখতে পারছে না ত্বকের টান টান সজীবতা। ভাঁজ পড়ছে ত্বকে। তখন ধূসর হতে থাকে যৌবনের উজ্জ্বলতা। তাই বলে বার্ধক্য মানে মলিন হওয়া নয়, নিঃশ্বেষ হওয়া নয়। বার্ধক্যেও নতুন তথ্য শেখা যায়, স্কিলড বা দক্ষ হওয়া যায়, কর্মক্ষম থাকা যায়। বয়োবৃদ্ধকে কাজ করা থেকে বিরত রাখা ঠিক নয়। কর্মহীন প্রবীণরা সহজে শারীরিক দক্ষতা হারিয়ে ফেলে, অথর্ব হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাড়না লুকিয়ে আছে মানুষের মনে— প্রবৃত্তির ভেতর। মৃত্যু অবধারিত জেনেও সবাই বেঁচে থাকতে চাই অনন্তকাল। চিকিত্সাশাস্ত্রের উন্নতির কারণে গড় আয়ু বাড়ছে পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর। একই সঙ্গে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধদের সংখ্যা। বর্তমানে ৬০ বছর ও তার ওপরে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি। প্রজেকশন রিপোর্ট বলছে- ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় দু’শ’ কোটি। কিছুদিনের মধ্যে গোটা বিশ্বে শিশু-কিশোরদের ছাড়িয়ে যাবে বয়োবৃদ্ধদের সংখ্যা। তাঁরা কি সুস্থ আছেন? থাকেন? অসুস্থ হলে গড়বড় হতে থাকে দেহের কলকব্জা এবং অন্তর্গত রাসায়নিক সুশৃঙ্খল কর্মযজ্ঞে— মানুষ উদ্বিগ্ন হয় সুস্থতার ভাবনায়। কিন্তু বার্ধক্য মানে কি শারীরিক এবং মানসিক ক্ষয়, পঙ্গুত্ব? না, মোটেই না। তবে নির্দিষ্ট সময়ের আগে অনেকের জীবনে চলে আসে বার্ধক্য। কেন দ্রুত আসে বৃদ্ধকাল? বায়োলজিক্যাল অক্সিডেশনের মাধ্যমে দেহে উত্পন্ন হয় অ্যানার্জি যেকোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সময় ইলেকট্রন হারায় অণু-পরমাণু বা আয়ন (ion)— এ প্রক্রিয়াকে বলে অক্সিডেশন। জীবদেহে যখন ঘটনাটি ঘটে তখন তাকে বলে বায়োলজিক্যাল অক্সিডেশন। এভাবে দেহে উত্পন্ন হয় অ্যানার্জি। কিন্তু দেহ-মনের ভেতর প্রতিকূল অবস্থা তৈরি হলে ত্রুটিপূর্ণ বায়োলজিক্যাল অক্সিডেশনের কারণে সৃষ্টি হয় ফ্রি রেডিক্যাল। এই মুক্ত মৌলিক ধাতু তখন জমতে থাকে স্নায়ুকোষ নিউরনের ভেতর। ফ্রি রেডিক্যালই নিউরনের ক্ষতের অন্যতম একটি কারণ। বৃদ্ধকাল দ্রুত চলে আসার এটিও একটি থিওরি। গবেষণায় দেখা গেছে ঝুটঝামেলা ছাড়া স্নায়ুকোষগুলো ১১০-১২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু খুব কম সংখ্যক স্নায়ুকোষই টিকে থাকে এত বছর । স্নায়ুকোষের পুরো আয়ুষ্কাল খেয়ে ফেলে ফ্রি রেডিক্যাল । ফলে ব্রেনের নানা ধরনের কাজে বাধা আসে। গবেষণায় দেখা গেছে কোলাজেন, ডিএনএ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রোটিন, জীবনের জন্য অপরিহার্য। এসব অণুগুলোর মাঝে আড়াআড়ি সংযোগের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় নিউরন। এছাড়াও ধারণা করা হয় কোষের মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়ার পর সৃষ্ট বর্জ্য পদার্থ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে অল্প অল্প জমতে থাকে কোষে— জমার পরিমাণ যত বেশি হতে থাকে তত ক্ষতি হয় কোষের, অগোচরে চলে আসে বৃদ্ধকাল। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত উপসর্গবিহীন সুস্থতা নিয়েও কেউ কেউ বৃদ্ধকাল পার করে দেয়। আবার কারও অনিচ্ছার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ঢুকে যায় গোপন ব্যাধি— নীরবে-নিভৃতে খেয়ে চলে স্মৃতির ভাণ্ডার, স্মৃতি ক্ষয় ঘটে। মানুষের জীবনে এ একটা অসহায় অধ্যায়, করুণ পরিণতি। তাই কেবল শরীরের দিকে তাকালে চলবে না, তাকাতে হবে মনের স্বাস্থ্যের দিকেও। এজন্য দিবসটি উপলক্ষে প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবার। বার্ধক্যে মনের বিষাদ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিশেষ করে বিষণ্নতা নিয়ে প্রচলিত আছে অনেক ভুল ধারণা। উনিশ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন বিষণ্নতা হচ্ছে বিভিন্ন অসুস্থতার স্বাভাবিক এবং অপ্রতিরোধ্য একটি পরিণতি। বিষণ্নতা রোগ যে এককভাবে এক ধরনের মানসিক পীড়া হতে পারে এ ব্যাপারে কমই ধারণা রয়েছে মানুষের। অনেকে আবার মনে করেন বার্ধক্য মানে বিষণ্নতার কাল। প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতি বা বয়স মূল বিষয় নয়। যেকোনো বয়সে ঘটনার হেরফেরে দেখা দিতে পারে বিষণ্নতা কিংবা বিষণ্নতা রোগ । এ ব্যাধি থেকে মুক্তিও পাওয়া যায় চিকিত্সায়। সব বয়োবৃদ্ধরা শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন না। এই বয়সে অনেকে আছেন যারা যৌবনেও নিরোগ ও তারুণ্যময় ছিলেন, সঠিক জীবনযাপনের কারণে বৃদ্ধকালেও তারা তারুণ্যদীপ্ত এবং কর্মক্ষম রয়েছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখে গেছেন, ‘বার্ধক্যকে বয়সের ফ্রেমে বাধা যায় না।’ তার এ উক্তি বৈজ্ঞানিকভাবেও নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে। Everything to gain: making the most of the rest of your life— বইয়ের লেখক রোজালিন কার্টার এবং জিমি কার্টার উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ বয়োবৃদ্ধ আমেরিকান বিষণ্ন নয়। তারা সফলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারেন, সক্রিয় কর্মক্ষম জীবন পরিচালনা করতে সক্ষম। এমনকি যারা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, আর্থিক এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখোমুখি হন, তাদের অনেকেও মানসিকভাবে অসুস্থ থাকেন। যদিও বয়সকালে নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা আসতে পারে। তারপরও বলা যায়, এ ধরনের ব্যাধি বার্ধক্যের অপ্রতিরোধ্য সমস্যা নয়। তবে বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকে উত্কণ্ঠা, স্ট্রেস বা মানসিক পীড়নজনিত সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, একাকীত্ব এবং নিঃসঙ্গ হওয়ার ভয়ে ভীত থাকেন। আগেই বলা হয়েছে, বার্ধক্য মানে বিষণ্নতার কাল নয়। তবুও বলা যায়, বার্ধক্যে বিষণ্নতার হার সবচেয়ে বেশি। এ রোগের কারণে আত্মহত্যার হারও বেশি। আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ১৩%-এর বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। এই বয়সের প্রায় ২০% আত্মহত্যা করে থাকেন। প্রকৃতপক্ষে এদের অধিকাংশ প্রয়োজনের সময় মনোচিকিত্সা পায় না অথবা তাদের পরিবারের সদস্যরা রোগের উপসর্গ বুঝতে পারেন না, পারলেও চিকিত্সকের কাছে রিপোর্ট করেন না। এমনও হতে পারে মেডিক্যাল চিকিত্সাসেবা প্রদানকারীরা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ধরতে পারেন না। অনেক সময় বিষণ্নতা রোগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে শারীরিক উপসর্গের মাধ্যমে। ফলে মনের সমস্যা আড়ালে পড়ে থাকে, শরীরের সমস্যা নিয়ে রোগী কেবল চিকিত্সকের পর চিকিত্সক বদলাতে থাকেন। কিন্তু লাভ হয় না। এসকল রোগীর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেয়া উচিত। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ বয়োজ্যেষ্ঠ রোগী আত্মহত্যার পূর্বের মাসে তাদের ফিজিশিয়ানদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, কেউ মনোরোগের চিকিত্সকের পরামর্শ নেননি। খুব নগণ্য সংখ্যকই সঠিক চিকিত্সার পরও আত্মহত্যা করেছিলেন। বয়স্ক ব্যক্তিদের মঝে নানাদিক থেকে বিপদ ডেকে আনে বিষণ্নতা। কারণ এটি বাড়িয়ে দেয় অন্য শারীরিক সমস্যাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতার কারণে স্ট্রোক (ব্রেনঅ্যাটাক) বেশি ঘটে, হার্ট অ্যাটাকের মাত্রাও বিষণ্নতা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এ ছাড়াও হিপবোন ফ্র্যাকচারের হার এবং প্রদাহজনিত তীব্রতার সমস্যাও এদের মাঝে অধিকহারে দেখা যায়। গবেষকদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে— কোনটি আগে আসে, মানসিক না শারীরিক সমস্যা? একদল মনে করেন, বিষণ্ন রোগীদের ক্ষেত্রে ব্রেনে যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে থাকে তাতে হূদস্পন্দন বিঘ্নিত হয়, কোলস্টেরলের মাত্রাও বেড়ে যায়। ফলে হূদরোগ ঘটে থাকে। অন্যদল মনে করেন, যারা বিষণ্নতায় ভোগেন তারা ডায়েটের ব্যাপারে একেবারে অসচেতন, ওষুধপত্র খাওয়ার ব্যাপারেও নিস্পৃহ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও কোনো তাগিদ নেই তাদের । ফলে এ সকল বিষণ্ন রোগীর হূদরোগের ঝুঁকি থাকে। শারীরিক অসুস্থতা এবং অসুস্থতার চিকিত্সার কারণে বয়োজ্যেষ্ঠদের মানসিক এবং আবেগীয় সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে আসা প্রায় অর্ধেক রোগী থাইরয়েড গ্ল্যাণ্ডের সমস্যা, আর্থাইটিস কিংবা অস্টিওপোরোসিস থেকে সৃষ্ট ব্যথা, দেখা ও শোনার ত্রুটি ইত্যাদি শারীরিক অসুস্থতায় ভোগেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ডিপ্রেশন (৫৪%) এবং অ্যাংজাইটির প্রকোপও বেশি। এছাড়া ইনসোমনিয়া, ডায়বেটিস, স্ট্রোক, ইনফ্লুয়েঞ্জা, পারকিনসন্স ডিজিজ, পোস্ট সার্জিক্যাল কনফিউশন ইত্যাদি রোগীর ডিপ্রেশন এবং অ্যাংজাইটি প্রায় নৈমিত্তিক একটি সমস্যা। স্মৃতিবিনাশী রোগ আলঝিমারস ডিজিজ এবং ডিপ্রেশনের ডায়াগনোসিস ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। আলঝিমারস রোগে অতি ধীরগতিতে ব্রেনের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। থেরাপির মাধ্যমে এই রোগ সৃষ্ট ব্রেনের ক্ষয় রোধ এখনো সম্ভব হয়নি। জিনথেরাপি নিয়ে আশাব্যঞ্জক গবেষণা চলছে। মনে রাখতে হবে, চিকিত্সার মাধ্যমে রোগীর উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সামর্থ্য বাড়ানো যায়, জীবনযাত্রার মান ভালো করা সম্ভব। কোনো অনাদর বা অবহেলা নয়, সমস্যা আক্রান্ত বয়স্ক মানুষটিকে নিয়ে হাজির হতে হবে মানসিক চিকিত্সা কেন্দ্রে, সাহায্য নিতে হবে মনোরোগ চিকিত্সকের। এই দায়িত্ব পরিবারের সক্ষম সদস্যদের। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত প্রবীণ রোগীদের ৮০ শতাংশ কোনো চিকিত্সা পান না। কেবল আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের অধিকাংশ রোগী এবং তাদের আত্মীয়স্বজন জানেন না যে এই রোগের চিকিত্সা সম্ভব। সাধারণত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিত্সকরাও ওষুধের মাধ্যমে চিকিত্সার ঝুঁকি নিতে চান না। অনেকে ভাবেন, বয়স্করা বিভিন্ন বিষয়ে অনড়, তাদের আচার-আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন। কিন্তু শারীরিক এবং মনোচিকিত্সা উভয় ব্যবস্থায় ভালো ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রোগীকে সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ দান, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব দূর করা। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিও প্রবীণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্য বয়সীদের মতো প্রবীণদেরও নেগেটিভ কগনিশন থাকে। এই থেরাপির মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বার্ধক্যে সজীব থাকার উপায় তারুণ্যের স্বাস্থ্য কাঠামোয় জেনেটিক বা বংশগত কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স যতই বাড়ে, জেনেটিক কারণ ততই হারাতে থাকে গুরুত্ব। তবে প্রমাণিত হয়েছে বয়োবৃদ্ধির বৈশিষ্ট্যসমূহের প্রায় অর্ধেক জেনেটিক নির্ভর। যারা আশি বছরের ওপরে বেঁচে আছেন, তাদের ক্ষেত্রে জেনেটিক ফ্যাক্টরের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না। এর থেকে প্রমাণিত হয় একজন ব্যক্তি যত্নের মাধ্যমে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারেন, ধরে রাখতে পারেন সে উন্নতির ধারা, সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের মাধ্যমে ভোগ করতে পারেন প্রকৃতির অপার ঐশ্বর্য। এ ধরনের জীবনচর্চার মধ্যে রয়েছে শরীর ও মনের সুস্থ পরিচর্যা, সচেতনতা। কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করা সম্ভব? সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে মানুষে মানুষে পারস্পরিক আবেগীয় নির্ভরশীলতা গড়ে তোলা ও বজায় রাখা যায়। এ ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা পীড়নজনিত কষ্টকর পরিস্থিতিকে সহজ করে দেয় ইমোশনাল সাপোর্ট। ইমোশনাল সাপোর্টের মাধ্যমে কমানো যায় স্ট্রেস হরমোনের প্রভাব। দীর্ঘদিনব্যাপী স্ট্রেস হরমোনের উচ্চমাত্রা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ধস নামায়। ফলে যে-কেউ নানা ধরনের শারীরিক এবং মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হতে পারেন। এই যে সামাজিক যোগাযোগ, এটি আসলে সুস্থ মানসিক শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। সুস্থ মন উপহার দেয় সু্স্থ শরীর, সুখী জীবন। যতটুকু সম্ভব সকল বয়সীদের সক্রিয় শারীরিক কাজে অংশগ্রহণ থাকতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরি। নিয়মিত আনন্দময় বিনোদনমূলক কাজের মাধ্যমে মনের স্বাস্থ্য সমৃদ্ধ হয়, দেহে সামর্থ্যও বাড়ানো যায়, বিভিন্ন পেশীর সমন্বিত কর্মোদ্দীপনা জাগানো সম্ভব। দেখা গেছে, ব্যায়াম না করার কারণে বয়স্কদের ব্রেনে নানা ধরনের নেগেটিভ প্রভাব পড়ে, স্মৃতিশক্তি কমে যায় দ্রুত। আরও দেখা গেছে, পড়াশোনা, ক্লাস নেয়া, ভ্রমণ, দাবা খেলা কিংবা পাজল সমাধানের মাধ্যমে মন উদ্দীপ্ত করা যায়, বাড়ানো যায় মনের ক্ষিপ্রতা কিংবা ত্বরিত চিন্তা করার ক্ষমতা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের কাঠামো পরিবর্তন হতে থাকে। তবু শরীরকে পূর্বের অবস্থায় ধরে রাখার মনোভাব জাগিয়ে রাখা প্রয়োজন। এই মনোভাব দৃঢ় করার মাধ্যমে বার্ধক্যের দ্রুত পরিবর্তন রোধ বা শ্লথ করা সম্ভব। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, বাড়াতে হবে স্ট্রেস মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা, ধরে রাখতে হবে সেই ক্ষমতা। এভাবে আঘাতজনিত পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। বার্ধক্য নিয়ে প্রচলিত মিথ ও বৈজ্ঞানিক সত্য বার্ধক্য নিয়ে রয়েছে নানা পুরাণ বা মিথ, রয়েছে নানা ধরনের ভুল ধারণা, কুসংস্কার। ভুল ধারণা ভাঙতে হবে, জীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সত্য অনুধাবন করতে হবে সবাইকে। প্রবীণদের মঙ্গলের জন্য এই সত্যের বিকল্প নেই। প্রচলিত আছে অসুস্থ প্রবীণরা সমাজের বোঝা, অনুত্পাদনশীল, বিশেষত কর্মক্ষম তারুণ্যের প্রতিবন্ধক। সুস্থ প্রবীণদেরও কাজে লাগাতে পারি আমরা। যেসব দেশে ব্যাপক পেনশন প্রথা চালু নেই, সেখানে বৃদ্ধ বয়সেও অনেকে কার্যক্ষম থাকেন, নিজের এবং অন্যের জন্য আয় করেন, আর্থিক ভার বহন করে উত্পাদনশীল কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে পারেন। পারিবারিক, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য বেতনভুক্ত কিংবা বেতনহীন এসব বৃদ্ধের অবদান খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাঁরা সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই বলা যায়, ‘বৃদ্ধরা সমাজের বোঝা’ এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। আমরা জেনে এসেছি— বৃদ্ধরা নতুনভাবে দক্ষ হতে পারেন না, নতুন তথ্য ধারণ করতে পারেন না, তাদের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। প্রমাণ আছে অন্য সবার মতো বৃদ্ধরাও ভালোভাবে শিক্ষালাভ করতে পারেন। তবে চর্চার বাইরে থাকেন বলে নিজেদের সামর্থ্যের ব্যাপারে তাঁদের আত্মবিশ্বাস থাকে না। বৃদ্ধদের যত বেশি দক্ষতা ও জ্ঞান থাকবে তত বেশি তাঁরা সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সমর্থ হবেন। প্রবীণরা অসহায়, নিজেদের জীবন সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এমন ধারণার বিপরীত ব্যাখ্যা হলো ব্যতিক্রমধর্মী কোনো ঘটনায় হয়তো তাঁরা জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে নাও পারেন, যেমনটি পারে না কম বয়সীরাও। কিন্তু অন্য বয়সীদের চেয়ে তাঁরা নিজেদের প্রয়োজন সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতে পারেন, সিদ্ধান্ত নিতে পারেন— কেবল নিজেদের ব্যাপারে নয়, সামাজিক যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে ফলপ্রসূ উন্নতি সম্ভব। উপসংহারে বলা যায়, বয়স্করা অর্জিত জীবনখোঁড়া অভিজ্ঞতা দিয়ে আলোকিত করেন নবীনদের। এভাবে সহজতর হয় মানুষের বেঁচে থাকা এবং উন্নতির পথ। পরিবার কিংবা সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠরা প্রকৃতপক্ষে অপরিবর্তনীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলে কনিষ্ঠদের। মানবজাতি আলো পেয়ে থাকে পূর্বসূরীদের কাছ থেকে। কেবল জীবিতকালে নয়, মৃত্যুর মধ্যদিয়েও বয়স্করা একই শিক্ষা দিয়ে থাকেন। শোকের মধ্যে থেকেও জীবিত স্বজনরা বুঝতে পারেন সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে মৃত্যুর দিকে, এই শাশ্বত আহবান থেকে কারও রক্ষা নেই। শ্রমের বিনিময়ে তাঁরা যে ঘরবাড়ি, প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, মৃত্যুর পরও সে সব ইমারত অনাগত ভবিষ্যতেও প্রত্যেককে নিশ্চিত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এভাবে প্রত্যেকের মনে মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতনতা জাগে, উত্তরসূরীদের দায়িত্ববান হতে আগ্রহ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে সচেতনতার মাপকাঠিতে অনেক পিছিয়ে আছে, ডুবে আছে নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণায়। তাই মনের সমস্যা হলে একজন মানুষ উপহাসের শিকার হন, সামাজিক নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হন। এই ভয়াবহ চিত্র কেবল বয়স্কদের ক্ষেত্রে নয়, নারী-পুরুষ-শিশু সবার ক্ষেত্রে একই সমস্যা প্রযোজ্য। নতুন শতকেও তাঁরা বৈজ্ঞানিক চিকিত্সা পান না। কবে কাটিয়ে উঠতে পারব এই অসহায়ত্ব? যৌথ পরিবারপ্রথা প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক। যৌথ পরিবারে একজন প্রবীণ নিঃসঙ্গ থাকেন না। নিঃসঙ্গতা প্রবীণদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। আবার যৌথ পরিবারে তাঁদের জন্য প্রয়োজন সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান, স্বস্ত্তিদায়ক জীবনযাপন। যেকোনো ধরনের স্ট্রেস, অনাদর-অবহেলাও ক্ষতিকর। উন্নত দেশগুলোর কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের দিকে ফিরে তাকাতে পারি— নতুন জেনারেশনে ভেঙে যাচ্ছে একান্নবর্তী পারিবারিক কাঠামো। প্রবীণরা ঠিকমতো মর্যাদা পাচ্ছেন না, নানা ক্ষেত্রে অবহেলা ও অযত্নের শিকার হচ্ছেন। এই আক্ষেপ অনেকের। বর্তমানে যে-সকল গৃহকর্তা-কর্ত্রী নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি গড়ে তুলেছেন তাদের জন্য ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ দুর্দশা— বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া বুড়ো বয়সে তাঁদের থাকার আর কোনো গতি থাকবে বলে মনে হয় না। আর্থ-সামাজিক পুঁজিবাদী জীবনযাপন এই নির্মম পরিণতির দিকে সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজনীতিবিদ, প্রশাসক— এখনো যাঁরা নবীন, নীতিপ্রণয়নের ক্ষমতা যাঁদের হাতে, প্রবীণদের জন্য সুস্থ সামাজিক পরিবেশ নির্মাণের আন্দোলনে তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে প্রথমে। গণসচেতনতা বাড়ানোর জন্য প্রিন্টিং এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে পালনে করতে হবে বড় ধরনের ভূমিকা। অনাগত দুর্দিনে দৈহিক জটিলতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলা করার পদক্ষেপ হিসেবে বয়োবৃদ্ধদের জন্য বাসযোগ্য একটি ক্ষেত্র তৈরি করার উপযুক্ত সময় এখনই, জরুরি। লেখক : মনোচিকিত্সক ও কথাশিল্পী [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন