তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০১৩ পাস হইয়াছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী জানাইয়াছেন যে, তথ্য প্রযুক্তি (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১৩ জারির মাধ্যমে ২০০৬ সালের মূল আইনে যেইসব সংশোধনী আনা হইয়াছিল তাহাকে আইনে রূপ দেওয়ার জন্যই এই বিলটি আনা হইয়াছে। বলা হইয়াছে যে, তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে আইনটি যুগোপযোগী করাই এই বিলের উদ্দেশ্য। আপাত দৃষ্টিতে উদ্দেশ্য সাধু বলিয়াই মনে হয়। তবে মূল আইনের ৫৪ ধারায় কম্পিউটার ও কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির অনিষ্ট সাধন, ৫৬ ধারায় কম্পিউটার সিস্টেমের হ্যাকিং-সংক্রান্ত অপরাধ, ৫৭ ধারায় ইলেক্ট্রনিক ফর্মে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ এবং ৬১ ধারায় সংরক্ষিত সিস্টেমে প্রবেশ-সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৪ বত্সর এবং ন্যূনতম ৭ বত্সর কারাদণ্ডের যেই বিধান রাখা হইয়াছে তাহা লইয়া প্রশ্ন উঠিতে পারে। এই ধরনের অপরাধে গুরুদণ্ড দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হইতে পারে না। ইহা অনস্বীকার্য যে, তথ্য প্রযুক্তির যতো প্রসার ঘটিতেছে, ইহার অপব্যবহারের মাত্রাও ততো বৃদ্ধি পাইতেছে। এই অপব্যবহার যে ইতিমধ্যে ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদাহানির গণ্ডি ছাড়াইয়া সামাজিক সমপ্রীতি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হইয়া উঠিয়াছে তাহাও কমবেশি সকলেই জানেন। ফলে এ-সংক্রান্ত উদ্বেগ এখন বিশ্বজনীন। আমাদের অভিজ্ঞতাও কম তিক্ত নহে। কিন্তু সদ্য পাস হওয়া আইনে পুলিশকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের যেই ক্ষমতা দেওয়া হইয়াছে তাহাতে এই প্রশ্নটিই বড়ো হইয়া উঠিয়াছে যে, কুইনাইন জ্বর সারাইবে, কিন্তু কুইনাইন সারাইবে কে?
লাগামহীন ক্ষমতা যে লাগামহীন নিপীড়ন ও দুর্নীতির জন্ম দেয় তাহা কোনো নূতন কথা নহে। মনীষীগণ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া আসিতেছেন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে যে, যখন যাহারা এই ধরনের ভারসাম্যহীন আইন করিয়াছেন তাহারা নিজেরাই তাহার শিকার হইয়াছেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করিতে গিয়া এই আইনের যে অপব্যবহার হইবে না তাহার নিশ্চয়তা কে দিবে? একদিকে বিস্ময়কর দ্রুত গতিতে তথ্য প্রযুক্তির প্রসার ঘটিতেছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান হারে সর্বস্তরের মানুষ তাহার সাথে যুক্ত হইতেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রবক্তা হিসাবে সরকার নিজেই ইহার সব চাইতে বড়ো পৃষ্ঠপোষক। এমতাবস্থায়, কোনিট প্রযুক্তির অপব্যবহার আর কোনিট নয় এবং কে অপরাধী বা কে অপরাধী নয়— এতো গুরুতর ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এককভাবে পুলিশের উপর ছাড়িয়া দেওয়া কোনো অবস্থাতেই সুবিবেচনাপ্রসূত হইতে পারে না। ইহা জাতিসংঘের সার্বজনীন মৌলিক অধিকারের ঘোষণা এবং আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের চেতনার সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ নহে। গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান শক্তি ও ভিত্তি হইল সহনশীলতা, ন্যায়বিচার এবং বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। এই ধরনের বিধান যে সেই শক্তি ও ভিত্তিকেই দুর্বল করিয়া দেয়— তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী অব্যাহতভাবে যেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়িয়া তোলার কথা বলিয়া আসিতেছেন সেই চেতনারও পরিপন্থী। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি ভাবিয়া দেখিবেন।
