[ নি র্বা চ ন ]

তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই কি সব সমস্যার সমাধান করে দেবে?

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৭
গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়েই আবর্তিত হচ্ছে। ভাবখানা এমন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই সব সমস্যার সমাধান করে দেবে। না রাজনীতিক, না সুশীল সমাজ, না অন্য কেউ— কারো কোন উত্সাহ নেই, কারো কোন নজর নেই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে। টেকসই গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ, উচ্চতর গবেষণা ও নতুন জ্ঞান বিকাশে সক্ষম বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতি কমিশন। শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে যে ভারসাম্য দরকার তা কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বিপুল উত্সাহ নিয়ে সিরিয়ায় সৈন্য পাঠাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বৃটিশ পার্লামেন্ট তার এ উদ্যোগকে নাকচ করে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থন যোগাড় করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। একেই বলে ভারসাম্য। শক্তিশালী গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের কোন একটি বিভাগ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হলে অন্য বিভাগগুলো তার রাশ টেনে ধরে। এছাড়া গণতন্ত্র যেন ঠিকঠাকভাবে কাজ করতে পারে তার জন্য থাকে শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ নানা প্রতিষ্ঠান। শক্তিশালী গণতন্ত্রের কথা বলব কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব না, গণতন্ত্রের কথা বলব কিন্তু আচরণ ও কর্মকাণ্ডে তার কোন প্রতিফলন থাকবে না, এ ধরনের কনট্রাডিকশন নিয়ে গণতন্ত্র কিভাবে সামনে অগ্রসর হবে? গণতন্ত্র যদি জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য শাসন হয়, তাহলে সবচেয়ে আগে দরকার শক্তিশালী স্থানীয় সরকার। এব্যাপারে বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে লেখা আছে। কিন্তু ৪২ বছরে কি সেই শক্তিশালী স্থানীয় সরকার হল? আমরা যদি শক্তিশালী স্থানীয় সরকার করতে পারতাম, তাহলে গ্রাম, মফস্বল ও শহরের সকল মানুষের বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক মৌলিক প্রয়োজন ও সেবাগুলো নিশ্চিত করা সম্ভব হত। বিশেষ করে গ্রামপ্রধান বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার যদি এলাকার সার্বিক উন্নয়নের নেতৃত্ব দিয়ে শিক্ষা, চিকিত্সা, আইন-শৃংখলা, বিচারসহ মৌলিক প্রয়োজন ও সেবাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারত, তাহলে তা দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জীবনকে অর্থবহ করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত। তখন গণতন্ত্র হয়ে উঠত প্রকৃতই জনগণের জন্য। মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ করে যে জন্য বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে, বাংলাদেশ সংবিধানের প্রস্তাবনাতেও যে ধরনের সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে, শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেই কেবল তা অর্জিত হতে পারে। দ্বিতীয় যে প্রতিষ্ঠানটি টেকসই গণতন্ত্রের জন্য দরকার সেটি হচ্ছে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। অস্বীকার করছি না যে, বর্তমান সরকারের সময় নির্বাচন কমিশন সংসদের উপ-নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনসহ যে ক’টি নির্বাচন করেছে, সেগুলো ছিল সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তারপরও প্রধান বিরোধী দল এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বর্তমান নির্বাচন কমিশকে পুরোপুরি আস্থায় নেয়নি। ওদিকে নির্বাচন কমিশনের কিছু সামপ্রতিক কর্মকাণ্ডও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আইন প্রদত্ত কর্তৃত্ব প্রয়োগে তাদের খুব বেশি উত্সাহী মনে হয়নি, মোদ্দাকথা হচ্ছে, বাংলাদেশে যদি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সকল রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন একটি নির্বাচন কমিশন থাকত এবং ওই নির্বাচন কমিশন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় সক্ষম হত, তাহলে নির্বাচনকালে কে সরকারে থাকবে সে আলোচনা বা বিতর্কের কোন অবকাশই থাকত না। কিন্তু ৪২ বছরে আমরা একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গড়ে তুলতে পারিনি। এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা ঢাকতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর কত কাল এ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা পালন করবে? বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকাণ্ডে তাদের স্বাধীন বা প্রভাবমুক্ত মনে হয় না। সামরিক, ছদ্ম-সামরিক ও গণতান্ত্রিক— সব আমলেই আমরা দেখছি যে, দুর্নীতি দমন কমিশনের আচরণ সরকারি মন্ত্রী, কর্মকর্তা ও সরকারের আশীর্বাদপুষ্টদের প্রতি এক রকম, আর বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ যারা সাবেক মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাদের বেলায় ভিন্নরকম। ফলে এ দ্বিমুখী আচরণের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকাণ্ড বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশের নিম্ন আদালতগুলো প্রভাবমুক্ত নয়। সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থাও নানা সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে যে দুটো সমস্যা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দেয় না, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে, মামলার অত্যধিক ব্যয়। ফলে যে সকল ব্যক্তির মামলা চালাবার সামর্থ্য নেই, তারা মামলা করতে পারেন না। এতে তারা ন্যায়বিচারের মধ্যে প্রবেশ (Access to Justice) করতে পারেন না বা ন্যায়বিচার পান না এবং সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অর্থহীন হয়ে যায়। দ্বিতীয় যে সমস্যার কারণে বলতে গেলে কেউই ন্যায়বিচার পান না, সেটি হচ্ছে, মামলা নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় চলে যায়। একটি দেওয়ানী অথবা ফৌজদারী মামলা দুই, তিন বছরে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা কিন্তু বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। মামলা শুরু হওয়া থেকে পনের, বিশ, পঁচিশ অথবা তারও বেশি সময় পরে যখন চূড়ান্তভাবে মামলার নিষ্পত্তি হয়, তখন মামলার রায় মামলায় জয় লাভকারী ব্যক্তির কোন কাজেই আসে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এ ভূখণ্ডে এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য যেখানে সকল নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সা নিশ্চিত থাকবে। সময় পরম্পরায় এদেশের সরকারগুলো এমনভাবে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে যাতে সকল মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত হয়, অর্থবহ হয়ে ওঠে গণতন্ত্র। কিন্তু সকল কিছু বাদ দিয়ে যদি আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্কে মেতে উঠি অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মধ্যে সকল সমস্যার সমাধান খুঁজি, সেটি আমাদেরকে বিদ্যমান দুষ্টচক্রের মধ্যেই আবব্ধ করে রাখবে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়