দেশে একটি নির্বাচন যখন আসন্ন এবং এই নির্বাচনকে ঘিরিয়া যত অনিশ্চয়তা তৈয়ারি হইয়াছে তাহার হাওয়া লাগিয়াছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। বিনিয়োগের বড় বাধা ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারতো রহিয়াছেই। ইহারই মধ্যে অর্থমন্ত্রী মহোদয়কে আনিয়া ঘটা করিয়া সুদের হার কমাইবার জন্য দাবি করিলেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রীকে সুদের হার কমাইবার অনুরোধ করিলে তিনিও সহায়ক উদ্যোগ লইবেন বলিয়া আশান্বিত করিয়াছেন। যদিও তাহার এই ‘অথরিটি’ আর কতদিন রহিয়াছে, কিংবা আদৌ আছে কি না তাহা বলাই বাহুল্য। তিনি বহুবার বলিয়াছেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এইসবে হস্তক্ষেপ করা যায় না। যাহা হউক, একটু পেছনে গেলে অনেক কথাই মনে পড়িয়া যাইবে। দেখা যাইবে যে, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার লইয়া অনেক কথা হইয়াছে। এইকথা সবাই স্বীকার করিবেন যে, বিশ্বের কোথাও এত বেশি হারে সুদ দিতে হয় না বিনিয়োগকারীদের। সুদের হার সিঙ্গল ডিজিটে আনিবার বহু চেষ্টা হইয়াছে। এইসব চেষ্টা যখনি সফলকাম হইতে চলিতেছিল, তখনি উল্টা বাধা হাজির হয়। যাহার কারণে, ব্যাংক ঋণের হার সিঙ্গল ডিজিটে নিয়া আসার কাজটি দুরূহ হইয়া পড়ে। ১৩ শতাংশ সুদ হারের মধ্যে ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সীমা প্রত্যাহার করিবার ফলে ইচ্ছামত সুদ চার্জ করিবার সুযোগ চলিয়া আসে। সরকার যদিও এই সিদ্ধান্ত নিয়াছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ কিংবা তারও বেশি হারে ব্যাংকগুলিকে লগ্নি করিতে দেখা যায়। ব্যাংক ঋণের উপর সুদের সর্বোচ্চ সীমা বা ল্যান্ডিং ক্যাপ প্রত্যাহার করিবার ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি মূলত: সুদ আয়ের দিকেই বেশি ঝুঁকিয়া পড়ে। যদিও তাহাদের যুক্তি পরিচালনা খরচ যোগাইতে হইলে আমানতের সুদের হারের সঙ্গে একটি ভাল মাত্রায় তারতম্য থাকিতে হইবে।
প্রশ্ন থাকিতে পারে যে, সুদের হার কেন সরকার বাড়াইলো। ইহা প্রায়শই শুনিতে পাওয়া যায় যে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়িয়া যাইতেছে। বাজেটে যেই পরিমাণ ঋণ নিবে বলিয়া লক্ষ্য স্থির করিয়াছে তাহাতে ঋণের সীমা স্থির থাকিতেছে না। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকার বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমানোর কৌশলটি গ্রহণ করিল। সেই কৌশলের অংশ হিসাবেই সুদের হার বাড়ানো হয়। যাহাতে করিয়া বেসরকারি খাতে অর্থায়ন দুর্বল হইয়া পড়ে। এখন ইহার খারাপ দিকটাও কিন্তুু রহিয়াছে। তাহা হইতেছে এই ধরনের পদক্ষেপ লইলে শিল্পায়ন হয় না। দেশে বিনিয়োগ ও নূতন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় না। যাহা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করিয়া তুলিবার পথে যথেষ্ট। আর সেই পরিস্থিতিইতো এখন চলিতেছে। বিনিয়োগ হইতেছে না। বেশি হারে সুদ দিয়া শিল্পখাতে বিনিয়োগ করিবার সাহস কাহার আছে? আরও রহিয়াছে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। যাহারা বিনিয়োগে আছেন তাহারাও এমন পরিস্থিতিতে এখন ভাল নেই। খেলাপি হইয়া যাইতেছেন। আর একবার খেলাপি হইলে নিয়মতান্ত্রিক যাহা শাস্তি, তাহাও মাথা পাতিয়া লইতে হইবে। কিন্তুু এই কথা জিজ্ঞাসা করিবার কেহ নাই যে, উদ্যোক্তা খেলাপি হইয়াছে কাহার দোষে? তাহার দোষে? নাকি সরকার তাহাকে জ্বালানি সরবরাহ করিতে পারে নাই। যদি যথাযথ জ্বালানি সরবরাহ করিতে না পারে, তাহা হইলে সেই ব্যর্থতার দায়ভার কেন একজন উদ্যোক্তার কাঁধে পড়িবে। বিশেষত যিনি উচ্চ সুদের বোঝা কাঁধে লইয়াছেন। কিছু মানুষের কাজের সুযোগ করিতে চাহিয়াছেন। যাহার বিনিময়ে দেশমাতার যদি ন্যূনতম উপকার হইয়া থাকে। কিন্তুু কে বলিবে এইসব সত্য, সত্য যে বলা বড় কঠিন!
সর্বোপরি, বেশি সুদে ঋণ লইয়া শিল্প গড়িয়াছেন, এমন উদ্যোক্তারা আজ কঠিন বিপাকে পড়িয়াছেন। তাহারা আবার ইহাও দেখিতেছেন যে, কাহারও কাহারও পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক হইতে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হইতেছে। আবার ইহাও বলা হইতেছে ব্যাংকিং খাতে বিপুল অংকের অলস অর্থ পড়িয়া আছে। এই অলস অর্থ ইহাই প্রমাণ করে যে, দেশে বিনিয়োগ হইতেছে না। অলস অর্থ বাড়িতেছে দেখিয়া ব্যাংকগুলি আমানতের ওপর সুদের হারও কমাইয়া দিয়াছে। কিন্তু যাহা করিলে বিনিয়োগ বাড়িতো, অর্থাত্ ঋণের সুদের হার কমাইলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হইতো, তাহা কিন্তু করা হইতেছে না। অর্থমন্ত্রী মহোদয় ব্যবসায়ীদের বলিয়াছেন, তিনি বিষয়টি বিবেচনা করিবেন। আমরা মনে করি, দ্রুততম সময়েই তিনি সঠিক উদ্যোগ নিবেন। কেননা, বাংলাদেশের মত জনবহুল দেশে অর্থনীতি বেগবান করিতে না পারিলে ইহার বিরূপ প্রভাব রাজনীতিকেও প্রভাবিত করিবে।
