বোধোদয়!

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:০৭
হঠ্যাত্ করিয়াই নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে উচ্চকিত হইয়া উঠিয়াছেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। মঙ্গলবার তিনি জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতেছে না। এমনকি এই দুই পক্ষ নিজেদের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান লইয়া থাকে বলিয়াও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন কারজাই। নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখিবার বিষয়ে আফগান প্রেসিডেন্টের এহেন অবস্থানের প্রতি অভিবাদন জানাইতে ইচ্ছা হয় বৈকি। কিন্তু অনেক বিশ্লেষক ভাবিতেছেন ভিন্ন কথা। মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতাধন্য এই প্রেসিডেন্টের এহেন কড়া বক্তব্যকে, আফগানিস্তানের মাটিতে বিদেশী সেনা রাখিবার চুক্তিটি শেষ হইয়া আসিবার মুখে নিজের দর বাড়াইয়া তুলিবার একটি হালকা-কৌশল হিসাবে দেখিতেছেন কেহ কেহ। ইহা ছাড়াও কারজাইয়ের বক্তব্যের মধ্যে সামনের এপ্রিলে ক্ষমতা হইতে বিদায় লইতে যাওয়া বিদেশী শাসকদের আস্থাভাজন এক শাসকের মনের আক্ষেপ ও খেদোক্তি শুনিতে পাইতেছে কেহ কেহ। সন্ত্রাসবাদী দমনের নামে অনেকদিন ধরিয়াই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী মনুষ্যবিহীন বিমান হামলা চালাইতেছে আফগানিস্তানে, যাহার পরিণতিতে নিয়মিতভাবেই প্রাণ যাইতেছে বেসামরিক নাগরিকদিগের। কিন্তু এই ব্যাপারে কারজাই যেন নিদ্রামগ্ন হইয়া থাকেন। কোন একটি হামলার ঘটনার পর পর নিয়মরক্ষামূলক কিছু প্রতিবাদ জানাইবার মধ্যেই তাহার দায়িত্ব সমাপ্ত হইতে দেখা যায়। কিন্তু এইবার তাঁহার বক্তব্য বেশ কঠোর। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানে বিদেশী সেনাদের অবস্থান বিষয়ক চুক্তিটির মেয়াদ চলতি বত্সরেই উত্তীর্ণ হইয়া যাইবে। এইদিকে ২০১৪ সাল নাগাদ দেশটি হইতে বিদেশি সেনা সরাইয়া লইয়া যাইবার কথা রহিয়াছে। এমতাবস্থাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো এমন একটি ব্যবস্থা চাহিতেছে যাহার বলে ইরাকের মত সকল সেনা প্রত্যাহার না করিয়া প্রয়োজনমাফিক নন-কমব্যাট সেনা আফগানিস্তানে রাখিয়া দেয়া যায়। বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কারজাইয়ের রহিয়াছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কারজাই নিজেও যে তাহা বুঝিতে পারিতেছেন। আর এই কারণেই তিনি যেন তাঁহাকে ক্ষমতায় টিকাইয়া রাখা পক্ষগুলির উদ্দেশ্যে বেশ কড়া বাক্যবাণ নিক্ষেপের সাহস করিয়াছেন। অবশ্য কারজাইয়ের কড়া বাক্যবাণকে কেবল নিজের দর বাড়াইয়া তুলিবার চেষ্টার মধ্যে বুঝিবার চেষ্টা করিয়া লাভ হইবে না। বরং এইবারের কথাবার্তাকে ইতিহাসে তাঁহার জন্য নির্ধারিত হইয়া যাওয়া আসনটি পাল্টাইয়া ফেলিবার একটি বৃথা-চেষ্টা হিসাবেও দেখিবার সুযোগ রহিয়াছে। নিয়ম মোতাবেক পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারিবেন না কারজাই। এমতাবস্থাতে ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার প্রয়োজনে এতদিন ধরিয়া পশ্চিমাদের প্রতি অসহনীয় মাত্রায় সংযত থাকা কারজাই মনের ঝাল মিটাইতে শুরু করিয়াছেন কি? সামনের নির্বাচনে কারজাইয়ের আপন ভ্রাতা, সাবেক যুদ্ধবাজ কিছু নেতা হইতে শুরু করিয়া নানা মেরুর লোকেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবেন। ইহাদের মধ্য হইতে কারজাই আপাতত সমর্থন দিতেছেন সাবেক বিদেশমন্ত্রী জালমাই রসুলকে। এই সমর্থনের গুরুত্ব শেষাবধি কতখানি থাকিবে তাহা বলা যায় না। তাহা হইলে কারজাইয়ের হাতে আর কি থাকিল? বাস্তবতা এই যে ইতিহাসে তাঁহার নাম একজন হামলাকারী বাহিনীর সহযোগিতা দানকারী প্রেসিডেন্ট হিসাবেই থাকিয়া যাইবে। হাজারো চেষ্টা করিয়া ইহা মুছিয়া ফেলা যাইবে না। ইতিহাসের অমোঘ এই রায়কে পাল্টাইয়া দেওয়ার মানসে এতদিনে ন্যায্য কথা বলিতে শুরু করিয়াছেন কি কারজাই? এতদিনে তাঁহার মনে হইতেছে যে বহুজাতিক বাহিনী আফগানদের জীবনে দুর্ভোগ আনিয়াছে, সন্ত্রাসবাদ দমনের যে অঙ্গীকার করিয়া তাহারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু করিয়াছে তাহা হইতে পূর্ণ নয় কেবলমাত্র আংশিক নিরাপত্তা আসিয়াছে! বিদায়কালে নহে, ক্ষমতার মধ্যগগনে থাকা অবস্থাতে এইসব কথা বলিয়া ক্ষমতাহারা হইলেও একজন নির্ভীক দেশপ্রেমিক শাসক হিসাবে কারজাইয়ের নাম ইতিহাসে খোদিত হইত। কিন্তু এখন আর তাহা হইবার নহে; এইসব খেদোক্তিতে কোন কাজ হইবে না। ইতিহাস আপনগতিতেই চলিতে থাকিবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন