চলেই যাচ্ছেন ক্রিকেট মহানায়ক

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪১
যে দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ক্রিকেটেই জীবনযাপন করে, ক্রিকেটার মাত্রই যেখানে মিডিয়ার আকাঙ্ক্ষার পাত্র। তেমন এক দেশে প্রতিনিয়ত শত কোটি মানুষের চাপ সামলে যিনি দুই দশক খেলে যেতে পারেন তার মহত্ত্ব বোঝাতে রেকর্ড ঘাঁটারই বা কি দরকার! ১৫ নভেম্বর, ১৯৮৯; করাচি: পাকিস্তানের দুর্দান্ত পেস আক্রমণে দিশাহারা ভারতের স্কোর তখন চার উইকেটে ৪১। এমন অবস্থায় উইকেটে আসলেন পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি উচ্চতার কিশোর এক ব্যাটসম্যান। ওয়াকার ইউনিসের দুর্দান্ত এক ইয়র্কারে স্টাম্প হারানোর আগে করতে পারলেন মাত্র ১৫। ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ কথাটা সত্যি নয়, তা বিশ্ব বুঝেছে। সেদিন দলকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারেননি তিনি। ২৪ বছরে বার বারই ভারতীয় দল বিপদে সওয়ার হয়েছে এই ‘লিটল’ মানুষটির কাঁধে। দলের প্রয়োজনে চওড়া হয়েছে তার ব্যাট, দেড়শ কোটি মানুষের প্রত্যাশার দায়ভার মিটিয়েছেন প্রতিনিয়ত। আরেকটি নভেম্বর যখন আসি আসি করছে সময়ের আবর্তনে সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটারে পরিণত হওয়া সেদিনের সেই ‘কিশোর’ শচীন রমেশ টেন্ডুলকার গতকাল জানিয়ে দিলেন, এই নভেম্বরেই শেষবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাঠে নামছেন তিনি; ২০০তম টেস্ট খেলেই ক্রিকেটকে বিদায় বলে দেবেন ভারতীয় এই ক্রিকেট কিংবদন্তী। চলে যাচ্ছেন, তবে বিদায়ের আগে পেছনে ফেলে যাচ্ছেন রাশি রাশি রান আর অজস্র রেকর্ডের বর্ণাঢ্য এক ক্যারিয়ার। আগামী নভেম্বরে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে শচীন টেন্ডুলকার খেলবেন নিজের ২০০তম টেস্ট। ১৪ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই টেস্ট কোথায় হবে, তা নিয়ে ভারত জুড়ে চলছে টানাহেঁচড়া। টেন্ডুলকারের ‘হোম গ্রাউন্ড’ ও বিসিসিআই সদর দপ্তর ওয়াঙ্খেড়েতে ম্যাচটি আয়োজনের জোর চাপ আছে, এদিকে রোমান্টিক ভেন্যু হিসাবে জগমোহন ডালমিয়ারা চাইছেন খেলাটা ইডেনে হোক। ইতিমধ্যে ফিরোজ শাহ কোটলাসহ আরও কয়েকটি ভেন্যু থেকে দাবি এসেছে এই ম্যাচ আয়োজনের। তবে খেলা যেখানেই হোক, ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ, সবচেয়ে বেশি রান, সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি, সবচেয়ে বেশি বলের মোকাবেলা করা, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি রান এমন হাজারো রেকর্ড। কোন ক্রিকেটারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে বোধহয় এই রেকর্ডগুলোর যেকোন একটিই যথেষ্ট। তবে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসাবে টেস্ট অভিষেকের পর এই রেকর্ড জিনিসটাকে টেন্ডুলকার এমনই অভ্যাসে পরিণত করেছেন তার মহিমা বোঝাতে এগুলোকে এখন আর খুব বেশি কিছু মনে হয় না। আর মনে হবেই বা কেন? যে দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ক্রিকেটেই জীবনযাপন করে, ক্রিকেটার মাত্রই যেখানে মিডিয়ার আকাঙ্ক্ষার পাত্র। তেমন এক দেশে প্রতিনিয়ত শত কোটি মানুষের চাপ সামলে যিনি দুই দশক খেলে যেতে পারেন তার মহত্ত্ব বোঝাতে রেকর্ড ঘাঁটারই বা কি দরকার! অধিনায়কত্ব খুব বেশি সময়ের জন্য না করলেও খেলোয়াড়ি জীবনের পুরোটা সময়ই মাঠে অলিখিত নেতার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাকেই। ওয়ার্ল্ডটেলের সঙ্গে প্রায় ৩২ কোটি রুপির চুক্তি করে সেই ১৯৯৫ সালেই সবচেয়ে ধনী ক্রিকেটারের তকমা জোটানো টেন্ডুলকারের মাঠের সাফল্য কখনোই বিতর্কিত করেনি মাঠের বাইরের টেন্ডুলকারকে। বছরের পর বছর ধরে ২২ গজে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসা এই ব্যাটিং মায়েস্ত্রো মাঠের বাইরে এখনো সেই পুরনো দিনের মতোই হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ের পরাকাষ্ঠা। ম্যাচ ফিক্সিং আর অর্থের লোভে ক্রিকেটের মহিমা যেখানে প্রতিদিনই ধূলায় লুটাচ্ছে, সেখানে ২০০১ সালে বল টেম্পারিঙের অভিযোগ বাদে কখনোই নিজের গায়ে লাগতে দেননি বিতর্কের সামান্য আঁচড়ও। মাঠের অসাধারণ আর মাঠের বাইরে দারুণ সাধারণ এই জীবনাচারের পুরস্কার হিসাবে ক্রিকেট বিধাতা তাকে দিয়েছেনও দু’হাত ভরে। অল্পবিস্তর কিছু রেকর্ড ছাড়া ক্রিকেট ছাড়ার আগে ব্যাটিংয়ের প্রায় সব রেকর্ড পকেটে পুরেই বিদায় নিচ্ছেন টেন্ডুলকার। তার বিদায়ে শ্রদ্ধাবনত তাই ক্রিকেট বিশ্ব। আমরাও কুর্নিশ করে বলতে পারি—বিদায় হে ক্রিকেট মহানায়ক। বিসিসিআই’র উদ্দেশে লেখা টেন্ডুলকারের চিঠিটি সরাসরি তুলে দেওয়া হলো পাঠকদের জন্য সঞ্জয় প্যাটেল সম্মানিক সচিব বিসিসিআই সারা জীবন ধরে একটি স্বপ্নই আমি বুকের মধ্যে লালন করেছি, সেটা ভারতের হয়ে ক্রিকেট খেলা। গত চব্বিশ বছর ধরে প্রতিটি দিন কেবল আমি এই স্বপ্নই দেখেছি। ক্রিকেট বিহীন একটা জীবনের কথা চিন্তা করাও আমার পক্ষে কঠিন। কারণ, সেই এগার বছর বয়স থেকে কেবল এই একটি কাজই করে আসছি। সারা বিশ্ব জুড়ে খেলতে পারা এবং আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা আমার জন্য ছিল দারুণ সম্মানের। বছরের পর বছর ধরে সমর্থন যুগিয়ে যাওয়া এবং যখন আমার হূদয় বলছে এখন থেমে যাওয়া উচিত, ঠিক তখনই থামার সুযোগ দেয়ার জন্য বিসিসিআই’র কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার পরিবারকে ধন্যবাদ তাদের ধৈর্য এবং সহযোগিতার জন্য। আর অবশ্যই, আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার ভক্ত, সমর্থক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের যাদের প্রার্থনা এবং শুভ কামনা আমাকে এই পর্যায়ে প্রতি মুহূর্তে নিজের সেরাটা ঢেলে দিতে উত্সাহ যুগিয়েছে। শচীন টেন্ডুলকার