গত বুধবার আন্দোলনরত শিক্ষকদের হাতে লাঞ্ছিত হইয়াছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। আবার উপাচার্যও দুই শিক্ষককে লাঞ্ছিত করিয়াছেন বলিয়া অভিযোগ করিয়াছে বিরোধীরা। উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারসহ কয়েকজন সিন্ডিকেট সদস্যকে সঙ্গে নিয়া সিন্ডিকেট সভায় যোগ দিতে প্রশাসনিক ভবনে গেলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এইসময় তাহার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষকরা প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটক বন্ধ করিয়া দিয়া পথ রোধ করিয়া দাঁড়ান। ভিসি তাহাদের সরাইয়া প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই সময় দুইজন শিক্ষককে ধাক্কা দেওয়া হইয়াছে মর্মে অভিযোগ করেন বিরোধী শিক্ষকগণ। ইহা লইয়া বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে কে বা কাহার ধাক্কায় ভিসি নিচে পড়িয়া যান। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের ওপর চেয়ার ছুঁড়িয়া মারে এমন অভিযোগও আনা হয় নূতনভাবে। এইসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও নানা ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরিয়া আন্দোলনের কারণে এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টির লেখাপড়ার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হইতেছে।
দীর্ঘদিন ধরিয়া চলমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকটের কোন সুরাহা হইতেছে না। ভিসির পদত্যাগ দাবিকারী শিক্ষকদের আন্দোলন গত কয়েকদিনে নূতন মাত্রা লাভ করিয়াছে। ইহার আগে ভিসি কয়েক দিন নিজ অফিসে অবরুদ্ধ ছিলেন। বাড়ির সম্মুখে স্ত্রীসহ তাহাকে পাল্টা অবস্থান কর্মসূচি গ্রহণ করিতেও দেখা গিয়াছে। ইহা জনসাধারণের মাঝে বিশেষ কৌতূহল যেমন সৃষ্টি করে, তেমনি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার জন্ম দেয়। তবে সর্বশেষ যাহা ঘটিল তাহা বিবেকবান মানুষ মানিয়া নিতে পারিতেছেন না। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া বিবদমান ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে প্রায়শ হাতাহাতি ও মারামারি হয়। কখনও কখনও ঘটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। এইসবই আমাদের গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি খোদ মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরাও নিজেদের মধ্যে প্রচণ্ড বিবাদে জড়াইয়া পড়িতেছেন। এমনকি নগ্ন হামলার ঘটনাও ঘটিতেছে। ইহা দেশবাসী মোটেও আশা করে না। অনেক সময় নিয়ম-নীতি না মানিয়া কেবলই শিক্ষক রাজনীতির স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগ প্রদান ও ভোট ব্যাঙ্ক বাড়াইবার অপকৌশলের পরিণতি এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক। শিক্ষকরা যদি পেশীশক্তির চর্চা করেন, তাহা হইলে আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। এইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট হইতেছে যাহা এককথায় অশোভনীয় ও অপ্রত্যাশিত।
মূলত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিস্থিতি গত বত্সর হইতেই বেশ উত্তপ্ত। এই উত্তেজনার পিছনে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি। আবার দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতাও ইহার জন্য কোন না কোনভাবে দায়ী। এখন একজন ভিসির পদত্যাগই আন্দোলনের মূল ইস্যু। কিন্তু এইভাবে তো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও শিক্ষা কার্যক্রম চলিতে পারে না। ঘন ঘন ভিসি বদল হইলে বা ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হইলে পরবর্তীতে যিনি সেই চেয়ারে উপবিষ্ট হইবেন তাহার জন্যও সবকিছু সহজ নাও হইতে পারে। তাই ভিসির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মীমাংসা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই করিতে হইবে। সিরিজ আন্দোলনের কারণে কোন ভিসির পক্ষেই ঠিকমত ও শান্তিতে কাজ করা সম্ভব নহে। বলিতে গেলে ভিসিবিরোধী আন্দোলনের সংস্কৃতি আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করিতেছে। আমরা চার দলীয় জোট সরকারের সময়ও বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষকদের ভিসিবিরোধী আন্দোলন ও রাত্রে ভিসি বদলের মহড়া প্রত্যক্ষ করিয়াছি। এই নোংরা রাজনৈতিক খেলার বলি হইতেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। ফলে পড়িয়া যাইতেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান। আর শিক্ষার্থীরা দুঃসহ সেশনজটের কবলে পড়িয়া হা-পিত্যেশ করিতেছে। এই সরকারের আমলে বুয়েটে এইরকমের ভিসি বিরোধী আন্দোলনের কারণে কয়েক মাস অচলাবস্থা দেখা যায়। এই ধরনের পরিস্থিতি কিভাবে এড়ানো যায় তাহা উচ্চশিক্ষার স্বার্থেই সবাইকে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি নির্বাচিত। তাহার পরও কেন সমস্যা হইতেছে বা সিনেট নির্বাচন নিয়াও কেন প্রশ্ন ওঠে তাহা চিন্তার বিষয়। আমরা মনে করি, ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হইতে হইবে এবং এইরূপ ভিসিকে তাহার মেয়াদ পূর্ণ করিতে দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইলে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। যেইভাবে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা একান্ত দরকার। অতএব, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা নিরসনে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।
