পদার্থবিজ্ঞানে এই বারের নোবেল পুরস্কারের সহিত জড়াইয়া রহিয়াছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির অতিসূক্ষ্ম কারণ অনুসন্ধানের ফলাফল এবং একজন বাঙালি বিজ্ঞানী। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির বা পদার্থকে ‘ভর’দান করিবার নেপথ্য কণাটির সাধারণ অনুধাবনযোগ্য নাম ‘ঈশ্বরকণা’, তত্ত্বগতভাবে—‘হিগস-বোসন কণা’। এই কণা লইয়া গবেষণার জন্য ২০১৩ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার অর্জন করিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস ও বেলজিয়ামের ফ্রাঁসোয়া আঁগলার। আর তাহার সহিত পরোক্ষভাবে স্মরণীয় হইয়াছেন বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যাঁহার পদবীর নামানুসারে কণাটির নামের ভিতর রহিয়াছে ‘বোসন’ শব্দখানি।
‘ঈশ্বর কণা’ এমন এক আবিষ্কার যাহা আয়তনে অত্যন্ত ছোট অথচ যাহা না থাকিলে পদার্থের ভর থাকিত না। ভর না থাকিলে পদার্থের অন্তস্থ মহাকর্ষ বল সৃষ্টি হইত না। আর মহাকর্ষ বল না থাকিলে বিগ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট অণুপরমাণু ঘনীভূত হইয়া গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করিতে পারিত না। ধর্মগ্রন্থ হইতে আমরা যেমন বিশ্বসৃষ্টির নেপথ্যে ঈশ্বরকে পাই, তেমনি এই কণা তাহারই ভাবধারায় বিশ্বজগত্ সৃষ্টির প্রারম্ভিক নেপথ্যের ‘কারণ’-রূপে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাইতে পারে। সেই কারণেই গভীরতা অনুধাবনার্থে কণাটির পোশাকি নাম রাখা হইয়াছে ‘গড পার্টিকল’ বা ‘ঈশ্বর কণা’। এই কণা-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা এই কারণে মহামূল্যবান যে, ব্রহ্মাণ্ড জুড়িয়া কেবলই কণা। গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, গাছপালা, ফুল কিংবা মানুষ সবই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র্র কণার সমষ্টি। আর কণা যদি ভারী না হইত তবে তত্ত্বীয়ভাবে এইসব কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকিত না। কারণ, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র্র কণারা একে অন্যকে কাছে টানিত না, কেবলই ছুটিয়া বেড়াইত আলোর গতিতে।
ইহা নি:সন্দেহে আমাদের জন্য শ্লাঘার বিষয় যে, এই ঈশ্বর কণা তথা হিগস-বোসন কণা হইল সেই বিশেষ প্রকৃতির কণা যাহার প্রবক্তা ছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ১৮৯০ সালে জন্ম নেওয়া সত্যেন্দ্রনাথ বসু খুব সাধারণ বাঙালি পরিবারের সন্তান হইয়াও বিজ্ঞান বিশ্বের অসাধারণ পাণ্ডিত্যের আসন অলংকৃত করিয়াছিলেন। নোবেল পুরস্কার তাহার মনিহার হইতে না পারিলেও বিশ্বশ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যথার্থভাবে মূল্যায়ন করিয়াছিলেন তাঁহাকে। এমন কি, তাহাদের যৌথনামে ‘বোস-আইনস্টাইন সংজ্ঞা’ নামে সারা বিশ্বে সমাদৃত একটি গবেষণা পদ্ধতি আছে। পদার্থবিজ্ঞানে তাহার এমতবিধ বহু অবদান রহিয়াছে যাহার ওপর গবেষণা করিয়া এইযাবত্ কমপক্ষে তিন জন বিজ্ঞানী নোবেল পাইয়াছেন। আমাদের আরও গৌরব যে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব গবেষণা করিয়াছিলেন তাহার প্রায় তিন দশকব্যাপী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়কালেই।
‘ঈশ্বর কণা’ লইয়া বিজ্ঞানীরা সমপ্রতি অতি উত্সাহী কিছু গবেষণা করিয়াছেন। বলা যায়, পদার্থবিজ্ঞানের সর্বাধিক ব্যয়বহুল অতি আড়ম্বর গবেষণাও হইয়াছে এই ঈশ্বর কণাকে কেন্দ্র করিয়া। বিগত তিন বত্সর বিশ্বের তাবত্ মিডিয়া অতি গুরুত্বের সহিত প্রকাশ করিয়াছে এই সংক্রান্ত গবেষণার নাটকীয় সকল সংবাদ। সুইজারল্যান্ডের জেনেভার ভূতলে বিস্তৃত লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার যন্ত্রের ২৭ কিলোমিটার টানেলে আলোর গতিবেগে ছুটে চলা প্রোটন-প্রোটন কণার ভিতরে সংঘর্ষ ঘটানো হইয়াছিল নানা পর্বে। কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হইয়াছিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জন্মের এক সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ সময়ের পরের অবস্থা। সেইখানেই প্রতি সহস্র কোটি কণার সংঘর্ষের পর ধ্বংসস্তূপ ঘাটিয়া ‘ঈশ্বর কণা’র অস্তিত্ব পাওয়া গিয়াছিল গত বত্সর জুলাই মাসে।
এই জগতের যাবতীয় রহস্যের অতিজটিল তত্ত্বগত সূত্রের সন্ধান এত সহজ নহে। রহস্যের জট খুলিতে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসাবে মানুষও নাছোড়। মানবসভ্যতার সকল বৈজ্ঞানিক উত্কর্ষের নেপথ্যেই রহিয়াছে মানুষের এই নাছোড় মনোবৃত্তি। বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, অন্যসকল সীমাবদ্ধতায় সকল সত্য মুঠোবদ্ধ করা মানবজাতির জন্য সম্ভবপর নাও হইতে পারে। শুধু পরমবিস্ময়ে আমরাও কল্পনাবিষ্ট হই ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের একটি দার্শনিক ভাবনার সহিত—তিনি এইরূপ বলিয়াছিলেন—মানুষ নিজেই বিবিধ পদার্থের অতিজটিল সুষমবস্তু মাত্র, সেই অর্থে পদার্থ নিজেই নিজের অতিজটিল রহস্য অনুধাবনে নিরন্তর চেষ্টা করিতেছে। ইহাই জগতের বৃহত্ এক বিস্ময়।
