[ রা জ নী তি ]

এখন দরকার শুধু সাহসী মানুষ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৯
প্রায় প্রতিবছর আগস্ট-সেপ্টেম্বরে কানাডার টরন্টোতে যাই ছেলের কাছে। প্রভূত ধারকর্জ হয় বটে, কিন্তু একমাত্র সন্তানের জন্যে এই আনন্দময় বিলাসিতা আমরা করিই। এবার যেহেতু তাদের সংসারে ‘স্বপ্ন’ যুক্ত হয়েছে, তাই এবারকার টরন্টোগমন অধিকতর উত্তেজনাকর ও অনন্য—একথা আগেও লিখেছি। আমার ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনার দায় পাঠকের ওপর চাপাতে চাই না এটা সত্যি, কিন্তু করব কী, আবেগ যে রুখতে পারি না! পাঠক ক্ষমা করবেন। এবার কানাডায় থাকার সময় কানাডারই কোনো এক সংবাদপত্রে পড়লাম এক মার্কিন কূটনীতিক গিয়েছেন লন্ডনের কোনো এক স্থানে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার জন্যে। সেই মার্কিন দূত তারেক রহমানের কাছ থেকে শুনতে চেয়েছিলেন এবার যদি বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর ব্যবস্থা করা হয় তাহলে কী হবে তাঁর দলের কার্যক্রম! মোটামুটি গোটা চারেক প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তর বেরিয়ে এসেছে সম্ভবত এরকম—প্রথম. বিএনপি ক্ষমতায় গেলে জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেবে কি না। উত্তর—না। দ্বিতীয়. প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিএনপি সুসম্পর্ক রাখবে কি না। উত্তর—হ্যাঁ। তৃতীয়. সুশাসন নিশ্চিত করবে কি না। উত্তর—হ্যাঁ। চতুর্থ. প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধমূলক কোনো কাজ করবে কি না। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি। জানি না মার্কিন দূত কথিত সাক্ষাত্কারে সন্তুষ্ট হয়েছেন কি না, কিংবা কতখানি হিসেব-নিকেশ করেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির বিষয়টি। তবে শেষ প্রশ্নটিতে উত্তরদাতার নীরবতা কিংবা এড়িয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে আবার ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশে বিএনপির ভবিষ্যত্ চরিত্র কেমন হতে পারে—তার একটা আভাস পাওয়া যায়। ওই একটি নিরুত্তর উত্তরই পূর্ববর্তী তিনটি প্রশ্নের সঠিক ও সত্য উত্তর। প্রিয় পাঠক, এ কথা বলছি, কারণ—প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধের স্পৃহা জামায়াত-বিএনপি-হেফাজতদের থাকবেই। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের তথা মানবতাবিরোধীদের বিচার হবে, কঠোর দণ্ড হবে আর জামায়াত-বিএনপি সুবোধ বালকের মতো আচরণ করবে—তা কি কখনো কল্পনা করা যায়? দ্বিতীয়ত, বাহ্যিকভাবে কিংবা একটি প্রভাবশালী দৈনিকের জরিপে বিএনপিকে ভোটের দিক থেকে যত জনপ্রিয় দেখানো হোক না কেন—বাস্তব চিত্রটি হচ্ছে বিএনপি নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হয় জামায়াত দ্বারা। বিএনপির কোনো আন্দোলন, কোনো কর্মসূচি সফল হয় না সেখানে জামায়াতের ক্যাডার না থাকলে। জামায়াতের বিপুল অস্ত্র এবং অর্থভাণ্ডার বিএনপির চলার পথের পাথেয়। জামায়াতকে সামলানোর কোনো ক্ষমতা কিংবা ইচ্ছে বিএনপির থাকবে না। কারণ কোনো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন যদি জঙ্গি কিংবা বৈদেশিক অর্থ ও অস্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয়, তাহলে তাকে প্রেম দিয়ে বশীভূত করা যায় না। তৃতীয়ত, বিএনপির প্রাণপ্রিয় সহযাত্রী জামায়াত এবং জঙ্গিবাদের লক্ষ্য হলো উপমহাদেশকে চরম অস্থিরতার আবর্তে নিক্ষেপ করা। এক্ষেত্রে তার প্রধান প্রতিপক্ষ ধর্মনিরপেক্ষ ভারত। এজন্য উপমহাদেশের ধর্মান্ধ সংগঠনগুলো এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তারা সখ্যতার সূত্রে গ্রথিত করেছে। বাংলাদেশে প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে বিএনপি এই দর্শনের বিশ্বস্ত মিত্র। অতএব বিএনপির স্বনির্বাচিত নেতা যতই বলুন না কেন যে, তাঁর দল প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে—তা কদাচ সম্ভব নয়। বিএনপি নেত্রীর বহুল আলোচিত ভারত সফরে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি এবং প্রত্যাবর্তনের পর পরই সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ, ভূমিকা এবং বাক্যবাণ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। চতুর্থত, প্রতিহিংসা এবং প্রতিশোধপরায়ণতা যদি পরিপূর্ণভাবে বিরাজমান থাকে তাহলে সুশাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে? অতএব অনিবার্যভাবে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ঊর্বর ভূমিতে পরিণত হবেই। কাজেই যে মার্কিন দূত বিশাল রাস্তা পাড়ি দিয়ে লন্ডনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে হাসিনা সরকারের বিকল্প খুঁজতে এক বিকৃত রাজনীতির দ্বারস্থ হয়েছেন, তাহলে তাঁকে এ কথা বলতেই হবে যে তিনি প্রবল ভ্রান্তিবিলাসিতায় নিমজ্জিত আছেন। একটা রব তুলে দেয়া হয়েছে যে, ২৫ অক্টোবরের পর দেশে ভয়াবহ কিছু একটা ঘটে যাবে। মানুষকে কতখানি প্যানিকি করে দেয়া যায়, তার অবিরাম চেষ্টা চলছে যেন। এখানে-ওখানে চলছে চোরাগোপ্তা হামলা। আক্রান্ত হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। আক্রান্ত হচ্ছে প্রগতিশীল তরুণ, লাঞ্ছিত হচ্ছে ফতোয়াবাজি ধর্মান্ধদের বিপন্ন শিকার নারীসমাজ। বিরোধীদলের নেত্রী হুমকি দিচ্ছেন দেশ অচল করে দেয়ার। দাবি তুলেছেন মানবতাবিরোধী স্বাধীনতার শত্রুদের মুক্ত করার। নির্দ্বিধায় উচ্চারিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মন্ত্র। জিকির তোলা হচ্ছে গৃহযুদ্ধের। তার মানে পরিষ্কার। প্রচারণার সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেয়া। ব্যাপক মিথ্যাচার দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া। মাসের পর মাস সংসদ বর্জন করে সংসদ নির্বাচনের জন্য হাস্যকর আন্দোলনের আবহ তৈরি করা। উগ্র ধর্ম ব্যবসায়ীদের উন্মুক্ত কৃপাণ হাতে গণতন্ত্রের ময়দান লণ্ডভণ্ড করার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করা। কী হবে ২৫ অক্টোবর কিংবা তার পর? কিছুই হবে না। এতদিন যা হচ্ছিল, তাই-ই হবে। হরতাল, বোমা হামলা, গাড়ি পোড়ানো, মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে অঙ্গার বানিয়ে দেয়া—এর বাইরে আর কী হতে পারে? আর মানুষ যদি রাস্তায় নামেন—বোমাবাজদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গাড়ি বের করেন, দোকানপাট-হাটবাজার খোলা রাখেন, তাহলে তো কিছুই হবে না। তাই এখন দরকার শুধু সাহসী মানুষের। লেখক :সাংবাদিক, প্রকাশিতব্য দৈনিক জাগরণ-এর সম্পাদক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন