২৫ অক্টোবরে কি হবে? ‘যুদ্ধ হবে যুদ্ধ’। দেশের জনগণ তাই মনে করেন। আমার অতি শ্রদ্ধাভাজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লেখক কলামিষ্ট মুনতাসির মামুন। ২ দিন আগে তাঁর সাথে রূপগঞ্জ থেকে প্রাইভেট কারে ঢাকা ফিরছিলাম। নানা কথার ফাঁকে এ প্রসঙ্গ আসতেই তিনি বলেন- ‘২৪ অক্টোবরে এই হবে সেই হবে; কিছুই হবে না!’ তার সোজাসাপটা কথায় মনে বল পেলাম। ভাবলাম কিছু না হলেই ভালো। অবশ্য বাংলাদেশের বিগত দিনের ইতিহাস তাই বলে। যা গর্জে ওঠে তার সর্বশেষ গতি কমই থাকে। আমাদের দু’রাজনৈতিক দল যেভাবে গর্জে উঠছে। ২৫ অক্টোবরকে ঘিরে যে হুঙ্কার দিয়ে যাচ্ছে তাতে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হলেও শেষ কি হবে তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। সেদিন ভোরে প্রাতভ্রমণে গিয়ে রমনা পার্কে দেখা হয় অন্ধ বয়াতি রাসেলের সাথে। মাঝে-মধ্যেই তার গান শুনে অন্যদের মতো আমিও দৌড়ানোর ক্লান্তি দূর করি। ঢুগঢুগির তালে তালে সে চমত্কার করে গাইছে- ‘২৫ অক্টোবর ভাইরে, শোক বারবে; লোক মরবে, বাঁচার উপায় আর নাইরে।’ বয়াতি, বিজ্ঞজন আর আমজনতার ভাবনায় ২৫ অক্টোবরকে ঘিরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অস্বস্তিকর বলেই মনে হচ্ছে। সমঝোতার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় এখন হিসাব মিলিয়ে দেখছে কোনটিতে তাদের লাভ আর কোনটিই বা লোকসান। এজন্যই কেউ তারা মাঠ ছাড়তে চাইছে না; ছাড়ও দিতে চাইছে না। ফলে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। বিপন্ন অর্থনীতির ভঙ্গুর পুলসিরাতের ওপর দাঁড়িয়ে আজ দেশ। অতঙ্ক আর শঙ্কায় কাচুমাচু হয়ে আছে দেশের জনগণ। সবাই এ পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করে। আমরা আশা করি, ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার এবং বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক জোটের রাজনীতিবিদরা প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে, সমঝোতায় পৌঁছে দেশের শান্তি প্রত্যাশী মানুষকে রক্ষা করবেন। জানমাল নিয়ে তারা দেশজুড়ে যে শঙ্কা তৈরি করেছেন তা রক্ষার দায়িত্বও কিন্তু তাদের হাতেই।
আমাদের ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ বলছে ‘নির্বাচন হবেই’ আর আমাদের বিরোধীরা বলছে ‘নির্বাচন হতে দেবো না’। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতো করে বলছে। এর মাঝে জনগণ কোথায়? তাদের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে জনগণ না থাকলে গণতন্ত্র থাকে কি? তাদের কথা ‘হবেই’ আর ‘হতে দেবো না’ এর মাঝে জনগণতো দূরের কথা যেন আল্লাহ্ খোদাও নেই। যেন সব শক্তি (অশরীরী শক্তি) তাদের হাতেই। দেশের চলমান এ রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। এটি কি দেশ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র নয়? তাই দেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে সুসংগঠিত হয়ে দেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখা ছাড়া পথ দেখি না। আমাদের রাজনৈতিক দল আর নেতা-নেত্রীদের বোধোদয় হবে কিনা সন্দেহ যা করার তা জনগণকেই করতে হবে। কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মহাপরিকল্পনাতো প্রায় শেষ। আগামী ২৬ কিংবা ২৭ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ১৮ দলীয় জোট। ওইদিন থেকেই শুরু হবে অসহযোগ আন্দোলন। অচল করে দেয়া হতে পারে ঢাকাকে। সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধের মাধ্যমে রাজধানীকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে ১৮ দলীয় জোটের।
দেশের রাজনীতিতে এখন শেষ সময়ের হিসাব-নিকাশ চলছে। চলছে বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে রাখার তীব্র প্রতিযোগিতা; পাশাপাশি পরস্পরকে চাপে রাখার কূটকৌশল। এর সূত্র ধরেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে মরবে মানুষ; রক্তাক্ত হবে জনপথ; জ্বলবে গাড়ি, ব্যাংক, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেবল সম্পদই নষ্ট হবে না প্রতিদিনই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃস্ব হবে। হোঁচট খাবে দেশীয় অর্থনীতি। ব্যবসা-বণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দিবে। অনেকেরই ধারণা, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচনী সমঝোতায় আসতে না পারলে ব্যাপকহারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে এবং দেশ মোড় নেবে গৃহযুদ্ধের দিকে। এ আতঙ্ক থেকে অবস্থাপন্নদের অনেকেই ঈদের পর পরই সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণে থাকার কথা ভাবছেন। রাজনীতিবিদদের অনেকে পরিবারের সদস্যদের বিদেশে পাঠিয়ে নিজেরা দেশে থাকার চিন্তা করছেন এ সময়। কী হবে ঈদের পর, কী হবে ২৫ অক্টোবরের পর, আওয়ামী লীগ কি বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচনে যাবে, গেলে বিরোধী দল কি তা প্রতিহত করবে, জামায়াতের ভূমিকাই বা কী হবে? ঘুরে-ফিরে এসব প্রশ্নই এখন দেখা দিচ্ছে মানুষের মনে। সবাই আতঙ্কিত ২৫ অক্টোবর পরবর্তী দিনগুলো নিয়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত। অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতায় বড়জোর লোকসান গুণতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। আগামী নির্বাচন নির্দলীয় না অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হবে, সে ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধীদলকে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। লোক দেখানো প্রস্তাব নয়, সংলাপের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সবাই অর্থবহ উদ্যোগ নেবেন— এটাই সবার প্রত্যাশা। গণতন্ত্রের বৃহত্ স্বার্থে সহসাই সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসে চলমান রাজনৈতিক সংকট সমাধান করা উচিত। এর ব্যতিক্রম হলে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক :প্রেসিডেন্ট লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা, লিবার্টি
[email protected]
