যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনাপ্রবাহ এবং সর্বোপরি বিহর্বিশ্ব নীতি ব্যর্থতা সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়নকে অবধারিত করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অনেক তাত্ত্বিক ‘যুক্তরাষ্ট্রের পতন তত্ত্বের’ (decline of America thesis) কথা দুই দশকের বেশি সময় আগ থেকে বলে আসছেন। এতদ সত্ত্বেও দেশটির নীতি-নির্ধারকগণ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এমন বেপরোয়া ও রক্ষণশীল হয়ে উঠেন, যা তাদের মারাত্মক বহিঃসম্মান সংকট তৈরি করে।
গত ১ অক্টোবর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বাজেট দূরতিক্রম্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। দেশটির বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক ‘ওবামা কেয়ার’ (Obama care) নীতিকে ঘিরে সংকটের গভীরতা সৃষ্টি হয়। বিরোধী রিপাবলিকানদের প্রবল আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত বাজেট পাস করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের ব্যবধানে দেশটিতে এমন একটা জাতীয় ইস্যু তৈরি হলো যা পূর্বেকার ইস্যুগুলোর থেকে প্রকৃতি ও পরিধিগত দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এবারকার সংকট এতই মারাত্মক যে, তার ফলে পরাস্পর্শকাতর (supersensitive) অফিসগুলোয় প্রায় ৭৫ ভাগ গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী চাকরিচ্যুত হন। বিনা মেঘে বজ াঘাতের মতো এ সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ব্যবস্থাকে এমনভাবে অচল করে দেয়, যা বিশ্ব মিডিয়ায় অচলাবস্থা (deadlock), বা বন্ধ (shutdown) হিসেবে অভিহিত হয়েছে। একজন দোকানদার দোকান বন্ধ করে শাটার নামিয়ে যে অর্থনৈতিক দুরবস্থায় পতিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাকে সেই ব্যক্তির সাথে কিছুটা তুলনা করা যায়।
মাত্র কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ওবামা চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে সিরিয়া আক্রমণ, ইরান আক্রমণ, মিসরে মুরসীর পতন, লাদেন বধ, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে হুংকার ছড়িয়ে যে ব্যতিক্রমবাদের (exceptionalism) ঘোষণা দেন, তা হঠাত্ করে কেন স্তিমিত হয়ে যায়।
নব্বই-এর দশকের মধ্য সময়ে স্নায়ু যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে অনেক তাত্মিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়। জাপানীজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান তাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা (Francis Fukuyama) তার “ইতিহাসের ইতিতত্ত্ব” (End of history) আবিষ্কার করে যেন হৈ-চৈ ফেলে দেন। স্নায়ু যুদ্ধকালীন পরাশক্তিদ্বয়ের দ্বন্দ্বের সমাপ্তিতে তিনি ইতিহাসের সমাপ্তি হিসেবে অভিহিত করে যে মারাত্মক ভুল করেছিলেন তার প্রতিবাদ হিসেবে হাভার্ড তাত্ত্বিক সামুয়েল পি.এ, হান্টিংটন (Samuel P.A. Huntington) ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ (clash of civilizations) উপস্থাপন করেন। তার মতে, ধর্মই হলো সংস্কৃতি ও সভ্যতা পুনর্গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান। পরস্পর বিরোধী সভ্যতাসমূহের মধ্যে ধর্ম ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে বিশ্বশক্তিসমূহের বর্তমান ও ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিত্র এঁকেছিলেন তিনি। অনেকটা একই সময়ে কুপচান (Kupchan) সহ অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস (decline of America) তত্ত্ব প্রচার করতে থাকেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমীন (Muhammad Ruhul Amin) বিশ্ব-দ্বন্দ্ব সংঘাত দূর করে দ্বন্দ্ববিহীন, সংঘাতবিহীন, শান্তিময় বিশ্বের সম্ভাবনার দিক-নির্দেশনা দিয়ে বিস (biiss) পত্রিকার মাধ্যমে তার ‘সংঘাতমুক্ত পৃথিবী’ (World beyond clash) তত্ত্ব উপহার দেন।
আজ এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপরোক্ত তাত্ত্বিকগণের মধ্যে রূপচানের তত্ত্বটি কেবল সামনে চলে আসছে। অনেকে ভাবছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট খুব শীঘ্রই দূরীভূত হবে এবং পুনরায় দেশটি পৃথিবীময় বিচরণ করবে। এ মতামতটি নিতান্ত অমূলক নয়। তবে পর্যবেক্ষণের বিষয় হলো- এবারকার সংকট নানাদিক থেকে তাত্পর্যপূর্ণ এবং এমনকি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ নির্মাণে এ সংকটটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
আগেই বলেছি, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বহির্বিশ্বে তার ভূমিকা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে। এ্যাপেক সম্মেলনসহ অন্যান্য সভা-সম্মেলনে ওবামার যোগদান যে শুধু অসম্ভব হয়েছে- তা নয়, ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা যাচ্ছে না, এমন হতাশা ও উত্কণ্ঠাও ছড়িয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র। হঠাত্ করে গত কয়েকদিনে মিসরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সেনাবাহিনীকে দেয় সাহায্য বন্ধের ঘোষণাটি মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন নতুন চিন্তা উপচে পড়ছে। পুতিন ও ওবামা যেভাবে সিরীয় সংকটের সমাধানে ভূমিকা রেখেছেন, তাতে বিশ্লেষকগণ রাশিয়ায় পুতিনকে সবচেয়ে বেশি চতুর হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন পত্রিকা ‘Putin outsmarts Obama’ শীর্ষক প্রবন্ধও ছেপেছে।
এমনি পরিস্থিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ইতিহাসের এক চরম পরীক্ষায় যুগসন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। তার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানজনক ভূমিকা পালনের এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের তাত্ত্বিকগণের পরস্পর বিরোধী তত্ত্বসমূহকে শাসকবর্গ কেবল জাতীয় স্বার্থের স্বার্থান্ধ নীতিতেই অনুসরণ করে এসেছেন। মনরোর বিচ্ছিন্নতাবাদ (isolationism), উইলসনের আদর্শবাদ (idealism), মর্গেনখুর বাস্তববাদ (realism) প্রভৃতি তাত্ত্বিক কাঠামোর আদর্শিকতা কেবল পুঁথি-পুস্তকেই সীমাবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিচালনায় নিয়োজিতরা জাতীয় স্বার্থ ও লক্ষ্যে এমন স্বার্থান্ধ নীতি গ্রহণ করে এসেছেন, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তির সাথে সব সময়ই সাংঘর্ষিক হয়েছে। অর্থাত্ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ পরস্পরবিরোধী রেখায় চালিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সুষম বিন্যাস ও বিকাশের পথে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের এ ভ্রান্ত, স্বার্থপর ও একপেশে নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বহিঃসম্মান (image crisis) টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। The New York Times -এ নোয়ারু চমস্কীর “The Obama doctrine” শীর্ষক প্রবন্ধে বিশ্ব-নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের মধ্যকার সংঘাতকে স্পষ্ট করে দুর্দান্ত আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সংগতিপূর্ণ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা। দ্বন্দ্ব ও সংঘাত পরিহার করে বিশ্বের রাষ্ট্র ও জনগণ যেন একটি সুন্দর পৃথিবীতে আদর্শ গ্রামবাসীর মতো সুখে-শান্তিতে বাস করতে পারে। এ ব্যবস্থা তৈরিতে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার বাস্তবায়ন ঘটানো। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বশান্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়নই কেবল একটি প্রাগ্রসর, গতিময় ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক ব্যবস্থার সুপ্রভাত রচনা করতে পারে।
লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
