ডেডলাইন ২৫ অক্টোবর

কে জিতবে? আওয়ামী লীগ না বিএনপি?

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৫
রবীন্দ্রনাথ তার একটি লেখায় গীতা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। গীতা উপদেশ দিয়েছে ‘কমর্ণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’। অর্থাত্ কর্মেই তোমার অধিকার রয়েছে ফলে কদাচ নাই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা আগামী ২৫ অক্টোবরকে সামনে রেখে তাদের কর্মযজ্ঞের হুংকার দিচ্ছেন। একই সাথে সেদিন কী ঘটবে অর্থাত্ তাদের এই কর্মযজ্ঞের ফলও আগেই জানিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি দলের রাজনৈতিক কর্তারা বলছেন, ২৫ অক্টোবর কিছুই হবে না। সরকার সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করবে। যারা এক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটাবে তাদেরকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে বিরোধী দল দাবি করছে ঐ দিনের পর দেশ বিরোধী দলীয় নেত্রীর কথায় পরিচালিত হবে। কেউ কেউ সরকারের পতন হবে বলেও ফলাফল নির্ধারণ করেছেন। ২৫ অক্টোবর অবশ্যই একটি ভয়ঙ্কর দিন। এদিন সরকার ও বিরোধী দল রাজনৈতিক মাঠ দখল রাখার পণ করেছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো পারস্পরিক শত্রুর বিনাশ নিশ্চিত করা। গীতার উপদেশ অনুযায়ী সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্তাদের কর্মের তথা ২৫ অক্টোবর রাজপথ দখলের অধিকার রয়েছে; কিন্তু সেদিন কী ঘটবে তথা লড়াইয়ের ফলাফল নির্ধারণ করার কোনো অধিকার তাদের নেই। তবে সরকার ও বিরোধী দলের মাঠ দখলের একটি ফলাফল পূর্ব নির্ধারিত। আর তা হলো জনমনে চরমভীতি। দুর্গা পূজা ও ঈদের আনন্দের শেষ দৃশ্যে রাজপথ দখলের এমন ভয়ঙ্কর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জনগণ প্রত্যাশা করে না। তবুও তাই হবে। অনেকের ঢাকা ফেরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে। মাঠ দখলের এই লড়াই সত্যি হলে ঈদ ও পূজার আনন্দ শেষে কোনো মায়ের আহাজারিতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাশ ভারি হয়ে উঠে কিনা সেই ভয় সকলের মধ্যে। চারদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের এমন ঝনঝনানি যেন ঘূর্ণিঝড় পাইলিন ২৫ অক্টোবর ঢাকার আকাশে ধেয়ে আসবে। ‘বহিরাপানে তাকায় না যে কেউ/ দেখে না যে বান ডেকেছে/জোয়ার জলে উঠেছে প্রবল ঢেউ।’ বিশ্বকবির এই পংক্তিটিই এখন বারবার মনে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটি লিখেছেন, আমরা অনেকেই এই প্রবন্ধটি পড়েছি। এই প্রবন্ধেই তার দাবি সিভিলাইজেশন শব্দটির বাংলা তর্জমায় ‘সভ্যতা’ যথার্থ নয়। তিনি মনুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, এই শব্দটির যথার্থ তর্জমা সদাচার তথা কতকগুলি সামাজিক নিয়মের বন্ধন। একটি জাতি যখন সভ্য হয় তখন তার সামাজিক নিয়মগুলোর বন্ধনও দৃঢ় হয়। দৃঢ় বন্ধন থাকলে সংঘাত কম হয় এবং হানাহানি এড়িয়ে যাওয়া যায়। সভ্য রাজনীতিতে রাজনৈতিক নিয়মগুলো হলো আইনের সমষ্টি, রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সেই আইনের প্রয়োগ হয়। তবে এই আইনের কেন্দ্রে থাকে রাজনৈতিক সমাজে বসবাসকারী সকল নাগরিকের বোঝাপড়া। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সদাচারে এই ধরনের একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আদালতের রায়ের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা সে বোঝাপড়াকে বিঘ্নিত করেছে। আর তার ফল সদাচারকেও বিঘ্নিত করেছে। ফলে রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড় পাইলিন ধেয়ে আসছে। জনমনে আতঙ্ক ও ভয়। ‘আকাশে কার বুকের মাঝে ব্যথা বাজে/ দিগন্তে কার কালো আঁখি আঁখির জলে যায় ভাসি।’ তবে এতে রাজনৈতিক কর্তা ব্যক্তিদের যায় আসে না। আর বিলম্ব নয়। যদি লড়াই হয় ২৫ অক্টোবর, এবার চলুন তার ফলাফল অনুমান করি। মূল লড়াইয়ে দুটি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কে জিতবে? আওয়ামী লীগ না বিএনপি? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর অনেক ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়ায় হয় না। এখানে মাঠ দখলই বড় বিষয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের আগে বা পরে সবসময়ই ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে সামরিক উপায়ে অথবা রাজপথ দখলের মধ্য দিয়ে। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস। তাই প্রশ্ন কে জিতবে? প্রথমে উত্তর- আওয়ামী লীগ জিতবে। দ্বিতীয় উত্তর- বিএনপি। তৃতীয় উত্তর- কেউই না। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির প্রধান অনুঘটক প্রশাসনিক ক্ষমতা। এই ক্ষমতার মাধ্যমেই সরকারি দল তার অধীনস্থ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী আন্দোলনকে নিবৃত করে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। একইভাবে বহির্বিশ্বের নিকট তার ইমেজ তুলে ধরার জন্য তার পররাষ্ট্র বিভাগও রয়েছে। এই সরকারগুলো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে এমন কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে, যে কর্মসূচিগুলো তার অভ্যন্তরীণ নিপীড়ন কার্যক্রমকে ঢেকে দিতে সাহায্য করতে পারে। এই সুযোগগুলো বিরোধী দলের থাকে না। তবে কেউ কেউ বলবেন যে, মিডিয়া সরকারের এই প্রশাসনিক নিপীড়নকে প্রচার করবে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটিও প্রযোজ্য নয়। কারণ বাংলাদেশের বর্তমান মিডিয়ার অধিকাংশই সরকারি দলের লোকদের মালিকানায় আছে। তাছাড়া নিরপেক্ষ মিডিয়াগুলো আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের উপর বিশ্বস্ত। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোরও এক ধরনের প্রভাব থাকে। প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ ভারতের রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নয়, আঞ্চলিক মহাশক্তি। আর এই শক্তির দীর্ঘ রাজনৈতিক বন্ধুত্ব রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে। রাজনৈতিক বিজয়ে বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে এক ধরনের বিরোধ থাকলেও তাদের অধিকাংশই কট্টর ইসলামপন্থার বিরোধী ও ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অনুসারী। তাই এই অংশটুকুও শেষপর্যন্ত আওয়ামী লীগের পাশে থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো আওয়ামী লীগ বাংলাদশের স্বাধীনতা আনয়নকারী দল। এখনও ৩৫% থেকে ৪০% জনগণ এই দলটিকে সমর্থন করে বলে বিভিন্ন জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে। এমতাবস্থায় গ্রামসির সূত্র অনুযায়ী উপরিকাঠামো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের ভিত্তি কাঠামো পর্যন্ত আওয়ামী লীগের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংশোধিত সংবিধান, সরকারি ক্ষমতা ও মিডিয়ার উপর প্রভাব থাকায় ২৫ অক্টোবর বা তার পরবর্তী রাজনৈতিক লড়াইয়ে আওয়ামী লীগই জিতবে বলা যায়। দ্বিতীয় উত্তর হলো বিএনপি জিতবে। বিএনপি আদর্শিকভাবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল। বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ রক্ষা করতে যারা চায় এবং যারা ভারতকে আগ্রাসী শক্তি মনে করে তারা বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাস ও বিএনপির জন্য একটি ইতিবাচক উপাদান। যে সকল কট্টরপন্থিরা বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র বানাতে চায় তারা ইসলামী মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দলের কাছাকাছি থাকতে চাইবে। এই জন্যই জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলামের সমর্থন বিএনপির পাশে থাকতে পারে। পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বদানকারী অংশগ্রহণের কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব থেকেও তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণেও জনসমষ্টির মধ্যে তার বিভিন্ন পকেট তৈরি হয়েছে। এভাবে বাস্তবতা হলো বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের একটি বিরাট অংশকে বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে এটাকেই ৫০% বলা হয়েছে; তাছাড়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দেশের একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর সমর্থন থাকায় (কোনো কোনো জরিপে যাকে ৯০% বলা হয়েছে) ২৫ অক্টোবর বিএনপির জনসমর্থন বেড়ে যেতে পারে। তাছাড়া, সুশীল সমাজকে নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠীর একটি অংশ তথা বি.চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকীর (যাদের অনেকের সাথে বিএনপির বিরোধ ছিল অথবা আদর্শিক সংঘাত ছিল) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে সমর্থন থাকায় ২৫ অক্টোবর বা তার পরবর্তী রাজনীতি বিএনপির অনুকূলে হতে পারে। গত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের গভীর বন্ধুত্ব থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখানে বেশি সুবিধা করতে পারেনি। চীন এই অঞ্চলে ভারতের আধিপত্য পছন্দই করে না। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ততটুকু সুযোগ দিতে চায়- যতটুকু তার স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখে। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নড়াচড়া সে বিষয়টি প্রমাণ করে না। উপরন্তু পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার যে কাঠামোগুলো রয়েছে-নোবেল প্রাইজ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি কাঠামোগুলো নিয়ে সরকারের বিতর্ক আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এখানেই অধ্যাপক ইউনূসেরও অবস্থান। তাই চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বিএনপিকে সমর্থন করে (গোপনে) তাহলে বিএনপিও রাজনীতির হিসেব উল্টে দিতে পারে। তবে দেখার বিষয় হলো জনগণের সমর্থন বিএনপি রাজপথে কতটা সংঘবদ্ধ করতে পারে এবং আওয়ামী লীগ জনমতকে কতটা তার পক্ষে রাখতে পারে। মনে রাখতে হবে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের চাহিদা পূরণ করা এতই কঠিন যে, সরকারে থাকাও রাজনৈতিক লড়াইয়ে এক ধরনের প্রতিকূলতা। বিশ্বকবির উদ্ধৃতি দিয়ে আগেই বলেছিলাম সভ্যতা হলো সদাচার, তথা সামাজিক নিয়মের বন্ধন। রাজনৈতিক সমাজেরও নিয়ম রয়েছে, সভ্য হতে হলে সেই নিয়মগুলো মেনে চলতে হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরও একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে সেই নিয়মটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি। আমরা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সে ব্যবস্থাটি উঠিয়ে দিলাম। ২৫ অক্টোবর বা অন্য কোনো ডেডলাইনের প্রয়োজন হতো না যদি এই ব্যবস্থাটি বিদ্যমান থাকতো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে তার কোনো একক বা ধ্রুব পদ্ধতি নাই। প্রত্যেকটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই গণতন্ত্রকে তার মতো করেই খাপ খাওয়ানো হয়েছে। যেমন দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অবিকল গ্রহণ করেনি। প্রধানমন্ত্রী শাসনের পরিবর্তে তারা রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা তৈরি করেছে। অথচ তখনো পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করেনি। তারপরও তারা ভিন্ন ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। উপরন্তু ব্রিটিশ ব্যবস্থার বিপরীতে সরকারের বিভিন্ন বিভাগগুলোর মধ্যে ক্ষমতার পূর্ণ স্বতন্ত্রীকরণ এবং পাশাপাশি আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এই নতুন চিন্তাগুলোকে কেউ অগণতান্ত্রিক বলেনি বরং গণতন্ত্রের অনুকূলে বলেছে অথবা এটাকে নতুন মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। অনুরূপভাবে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা এবং মেয়াদ শেষে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার মসৃণ হস্তান্তরকে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক চিন্তার নতুন সংযোজন। এটাকে অগণতান্ত্রিক বলার কোনো সুযোগই নেই। তৃতীয় বিশ্বে যেখানে মেয়াদ শেষে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় সেখানে এই ব্যবস্থা টেকসই গণতন্ত্রের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। থার্ড ওয়ার্ল্ড কোয়ার্টার্লিতে জুলিয়াস ও আইহনভিয়ার তার একটি নিবন্ধে ১৯৯৯ সালের নাইজেরিয়ান সংবিধানের উদাহরণ দিতে গিয়ে সংবিধানও অগণতান্ত্রিক হতে পারে সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জনগণের সাথে ব্যাপক আলোচনা ছাড়া যখন লিগ্যাল রিকগনিশনের জন্য পপুলার লেজিটিমেসি তৈরি করা ব্যতীত যে সংবিধান তৈরি করা হয় সেই সংবিধানকে তিনি অগণতান্ত্রিক বলেছেন। তার মতে রাষ্ট্র যখন সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক এলিটদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তখন তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে অগণতান্ত্রিক সংবিধানের আশ্রয় নেয়া হয়। তার মতে এটা নাইজেরিয়ায় ঘটেছে। বাংলাদেশের সংবিধান অত্যন্ত গণতান্ত্রিক সংবিধান। তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় জনগণের ব্যাপক অংশের সাথে আলোচনা করা হয়েছে কি? অন্যদিকে যাদের সাথে আলোচনা করা হয়েছে তারাও এই ব্যবস্থার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে গণভোটের আয়োজনও হয়নি। সরকারের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতেও এটা ছিল না। এই অবস্থায় এটা উঠিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গণবৈধতার পরিবর্তে আইনগত বৈধতাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল-এই বিতর্ক কি তোলা যায়? তাই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থাকে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে সরকারের এই বক্তব্য মেনে নেয়া কঠিন নয় কি? তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন বহাল রাখার ইচ্ছা এবং সরকারের কর্তাব্যক্তিদেরকে রাজনৈতিক সুবিধাদীসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার মধ্যে রাজত্ব টিকিয়ে রাখার কোন কৌশলেরই কি ইঙ্গিত নেই? রবীন্দ্রনাথের সদাচারে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই আবদ্ধ হোক। মনে রাখবেন ২৫ অক্টোবরের কর্ম আপনাদের নিয়ন্ত্রণে; ফলাফল নয়। আপনাদের লড়াইয়ের ফসল তৃতীয় কেউ ঘরে তুলবে না তো? সজাগ থাকবেন? লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় email:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন