কুরবানি হাট, মোটাতাজা বড়ি ও সড়ক দখল

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৬
বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কুরবানির ঈদ অনুষ্ঠানের ১৫ দিন পূর্ব হতেই পশু ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনা চলতে থাকে। কৃষক বা বিক্রেতাকে পাইকাররা অনেক সময় অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করে থাকে। এরূপ ক্ষেত্রে উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। প্রধান প্রধান শহরগুলোতে পশুরহাট বসে সাধারণত ৭-৮ দিন পূর্বে। বিভিন্ন অঞ্চল হতে পশুর আমদানি ঘটলেও বিক্রিতে ধুমধাম পড়ে ৪ দিন আগে হতে। এই হাট বসার কথা দীর্ঘদিনের পুরাতন গরু-মহিষের হাটে এবং বড় বড় ময়দানগুলোতে। যেমন ময়মনসিংহে বসে সার্কিট হাউস মাঠে। এখন বেশির ভাগ কুরবানির হাট বসানো হয় যানবাহন চলাচলের রাস্তার ধারে। রেললাইনের দু’পাশে ৪০ ফুট করে খালি জায়গা থাকার কথা। পাকা মহাসড়কের দু’পাশই ১০০ ফুট করে থাকা দরকার। রেল ও সড়ক বিভাগ সে ব্যবস্থা রাখলেও দখলদারিত্বের কারণে ফাঁকা জায়গাটুকু প্রতিনিয়ত বেহাত হচ্ছে। যে সমস্ত জায়গা খালি আছে সেখানে আবার বসানো হয় বিভিন্ন হাটবাজার। কাঁচাবাজার ও মাছের বাজারের কারণে রেললাইন ও পাকা রাস্তা খানাখন্দে পরিণত হয়। ফুটওভার ও ফ্লাইওভারগুলোয় রীতিমত বাজার বসে সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাত ১০টার পর এগুলো দখলে থাকে একশ্রেণীর হিজড়া ও কিছু হাইজ্যাকারের। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়াতে মানুষের মূল্যও কমে গেছে। মানুষের হাট বসে সড়ক ও রেলপথের ধারে। ব্যক্তির শ্রম ও মেধা বিক্রি হয় এসব হাটে। অনেক শ্রম অবিক্রিত থেকে যায়। শ্রমিকের শ্রম যখন হাটে বিক্রি হয় না তখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় বলে মঙ্গা দেখা দিয়েছে। জরুরি খাদ্য সাহায্য দিতে হয় মঙ্গাকবলিত অঞ্চলে। সেখানে টি-আর ও কাবিখাতেও চুরি। কৃষক সারা বছর গরু মহিষ লালন-পালন করে কিছু টাকার জন্য। গ্রাম্য বাজারে সে উপযুক্ত দামও পায় না। শহরে নিয়ে আসলে পথে পথে বাধা। চাঁদা, ছিনতাই। এমনকি মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে হাসপাতালে অথবা লাশ হয়ে বাড়ি ফেরা। তাইতো সন্তান দীর্ঘ পথ পানে চেয়ে থাকে, কখন ফিরবে গফুর কুরবানির হাটে মহেশকে বিক্রি করে। মেয়ে জানতে চাইবে বাবা তার লাল পিরান আনতে পেরেছে কিনা! কুরবানির পশুকে মোটাতাজাকরণের জন্য খড়, ঘাস, ভূষি, ফেন, কুড়া, কলাপাতা, বাঁশপাতা, তেঁতুল খাওয়াতে দেখেছি। অন্যান্য খাবারের সংগে ইউরিয়া সারও মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। ইদানীং মোটাতাজাকরণে ইঞ্জেকশন, বড়ি, রাসায়নিক ক্যামিক্যাল ইত্যাদির ব্যবহার বেড়ে যাওয়াতে মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। পশু বিক্রেতা আনসার আলী কুষ্টিয়া থেকে ৮টি গরু গাবতলি হাটে নিয়ে আসে। মোটাতাজা ইঞ্জেকশন ও বড়ি খাওয়ানোতে ২টি গরুই মারা যায়। সন্দেহ করা হচ্ছে অপর ছয়টি গরুর গোশত খেয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা মারা যেতে পারে। কুরবানি পশুর গোশত খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে নিশ্চয়ই। ফলে বড়ি খাওয়ানো গরুর বাজার যাবে খারাপ। নিত্যপণ্যের বাজার চড়া থাকার কারণে মূল আয়-ব্যয় হয়ে যায় সংসার চালাতে। ভাড়া বাসায় থেকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় চিন্তা করতে পারে না মধ্যম আয়ের ব্যক্তি। তাকে তখন ভাবতে হয় ৭ ভাগের এক ভাগ কুরবানির শরীক হতে। সরবরাহ বেশি থাকায় দামস্তরও নিম্নমুখী পশুর হাটে। পাঁচদিনের সরকারি ছুটি নিয়ে মা-মেয়ে সন্তান, বাবা-ভাই-বোনের সাথে ঈদ করবেন। কুরবানি কাটায় শরীক হবেন, গোশত বিতরণ করবেন। প্রচণ্ড ইচ্ছা ও আগ্রহ নিয়েছেন কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় গরু-ছাগলের বিরাট হাট। দড়ি ও গাড়ি টানাটানি। গরুর ছোটাছুটি। ঘন্টার পর ঘন্টায় জ্যাম। বাস-ট্রাক ঠায় দাঁড়িয়ে। তিন ঘন্টার রাস্তা যেতে তের ঘন্টা। গত ঈদুল ফিতরের পূর্বের দিন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ শহরে যেতে সময় লেগেছে চৌদ্দ ঘন্টা। এবারের ঈদে কত ঘন্টা লাগবে তা শুধু সড়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ট্রাফিক পুলিশ বলতে পারবে। যান ও জনজট ছোটাতে রাস্তায় র্যাব ও পুলিশ দ্বিগুণ করা একান্ত প্রয়োজন। এতক্ষণ কুরবানির হাট, গরুমোটাতাজাকরণ, রেল ও সড়কপথের কথা বললাম। আসা যাক ট্যানারী শিল্প বিষয়ে। অনেকদিন হতে চলেছে, লালবাগ-হাজারীবাগ থেকে ট্যানারী শিল্পগুলো সাভার ট্যানারী পল্লীতে সরানোর কথা। দ্রুত সরাতে হাইকোর্টের নির্দেশনা আছে। বিভিন্ন সমস্যার কারণ দেখিয়ে সময় বাড়ানো হচ্ছে। মালিকরা বলছে ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য না থাকায় শিল্প-কারখানা স্থানান্তরে ঋণ দিতে পারছে না রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো। বেসরকারি ব্যাংকে সুদের হার বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও তারা পাচ্ছে না। শুধু ট্যানারী মালিকরা নন, কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে পাঁচতারকা বা তিনতারকা হোটেল নির্মাণেও কোন ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে না। যা শিল্প বিকাশে বড় ধরনের অন্তরায়। ঢাকা থেকে সাভার পর্যন্ত রাস্তা সম্প্রসারণ প্রয়োজন। প্রয়োজন রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি ও ক্যামেরা বসানো। ফলে বন্ধ হবে গণছিনতাই। বাড়বে উত্পাদন ও প্রবৃদ্ধি। গড়বো দেশ। থাকবো বেশ। তাইতো আমাদের চাওয়া। শান্তির জন্য পৃথিবী। মঙ্গলের জন্য মানুষ। আমরা জাতিতে জাতিতে সংঘাত চাই না। চাই শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশে এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। যেখানে থাকবে সকল দলের অংশগ্রহণ। আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে কবুল করুন। বুঝবার ও বুঝাবার এবং আমল করার তওফিক দান করুন। আমিন। লেখক :সাবেক ট্রেজারার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন