গার্মেন্ট শিল্পে অস্থিরতা রোধে শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করা উচিত

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৯
বর্তমান পরিস্থিতিতে এদেশের প্রধান রফতানি খাত গার্মেন্টশিল্প এক ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় সময়কাল অতিবাহিত করছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধারাবাহিক হামলা, অগ্নিসংযোগ, জিএসপি বাতিলের হুমকি, ঘনঘন হরতাল, শিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ক্রেতাদের চাপ, দেশি ও আন্তর্জাতিকমহল হতে কারখানা পরিদর্শন আতঙ্ক, গ্যাস-বিদ্যুতের স্বল্পতা, ব্যাংকের উচ্চসুদ, অভ্যন্তরীণ ও যোগাযোগ খাতে দুর্বলতা, প্রয়োজনীয় জায়গার স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না থাকা এবং প্রলম্বিক বিশ্বমন্দাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতেই উক্ত শিল্পটি দারুণ ভাবে হিমশিম খাচ্ছে। শিল্পে চলমান বৈরী বাস্তবতায় হঠাত্ করে ব্যাপক হারে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি আবারও বহির্বিশ্বে এই শিল্পটিকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা শিল্পের স্বার্থে কাম্য নয়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতারা উক্ত শিল্পের প্রতি দিন দিন আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আর উদ্যোক্তারা অর্থের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে যা উক্ত শিল্পের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ বলে মনে করি। যদি এখনও এই বিষয়গুলো শ্রমিক তথা গার্মেন্ট সংশ্লিষ্টরা এবং সরকার উপলব্ধি করতে না পারে তবে সত্যিই এই শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বিরাট হুমকির সম্মুখীন হবে। গত কয়েকদিনের ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ আবারও এই শিল্পের নানা অসংগতির কথা সারাবিশ্বকে জানান দিয়েছে যা বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা মনে করি। তবে আশার কথা এই যে, বর্তমানে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে শিল্পে কিছুটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এখন মজুরি বোর্ডের ঘোষিত শ্রমিকদের বেতন কাঠামোর উপরেই নির্ভর করছে এই শিল্পের সামনের পথচলা। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো সহনশীল রাখতে শিল্পসংশ্লিষ্ট সকলের ছাড় দেয়ার মন-মানসিকতা তৈরি করতে হবে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের মূল্য কিছুটা বাড়িয়ে নিতে অধিক সচেষ্ট হতে হবে। আর সরকারকে এইসব শ্রমজীবীর স্বার্থে যা যা করণীয় তাই করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সার্বিক মূল্যস্ফীতির দায়ভার মালিকদের ঘাড়ে চাপানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি শিল্পে লাখ শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে এই অবস্থা থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে হবে। বর্তমানে এহেন পরিস্থিতিতে দেশের গৌরব গার্মেন্টশিল্প রক্ষায় মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বের অবসান হওয়া একান্ত জরুরি বলে মনে করি। আমরা আশা করি, মালিক-শ্রমিক স্বার্থরক্ষা এবং মালিকদের সক্ষমতাকে বিবেচনায় রেখে মজুরি বোর্ডকে এমন একটি যৌক্তিক বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে হবে যা মালিক-শ্রমিক উভয়ই মানতে বাধ্য হয়। মজুরি বোর্ডের কাছে এমনটিই সকলের প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে মালিকদেরকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি আগ্রহ দেখাতে হবে অনুরূপ ভাবে শ্রমিকদেরকেও দাবি আদায়ে শিল্পের অবস্থান ও মালিকদের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় রাখতে হবে। সরকারের তরফ থেকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে আরো অধিক সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ভাড়ার বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, কালোবাজারিদের অপতত্পরতা ও বাড়িওয়ালাদের দৌরাত্ম্য ও ভাড়াবৃদ্ধি দ্রুত বন্ধ করতে হবে। দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির দায়ভার মালিকদের ঘাড়ে চাপানো থেকে বিরত থাকতে হবে। অনুরূপ ভাবে শ্রমিকদেরকে দাবি আদায়ের নামে জাতীয় সম্পদ, কারখানার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, রাস্তাঘাট অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে জনজীবন বিঘ্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আমরা চাই না শিল্পে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করুক যাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে শিল্পের প্রাণ শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করতে না হয়। মালিকদের ভয়ে কারখানা বন্ধ রাখতে না হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কবলে কোন নিরীহ মানুষকে যেন করুণ মৃত্যুর পরিণতি হতে না হয়। দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে আমরা চাই শিল্পে সর্বদা স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করুক এবং সকলপ্রকার নৈরাজ্য থেকে মুক্ত থাকুক । যদিও নানামুখী চাপ সহ্য করে এখন মালিকরা উক্ত শিল্পের হাল ধরে আছে ফলশ্রুতিতে শিল্পে লাখ শ্রমিক কাজ করতে পারছে। কিন্তু ঘন ঘন শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানা ভাঙচুর তাদেরকে এই শিল্পের প্রতি নিরুত্সায়িত করছে ও নতুন বিনিয়োগকারীদেরকে বিনিয়োগে বাধাগ্রস্ত করছে। যদিও বর্তমানে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে এখনও নানা দ্বিমত চলছে। তারপরও আমরা চাই মজুরি বোর্ড উভয়পক্ষের যৌক্তিক দাবিগুলো যথাযথ বিশ্লেষণ করে নিরপেক্ষ ভাবে এমন একটি মজুরি চূড়ান্ত করবে যাতে উভয়েরই স্বার্থ রক্ষা হয় এবং শ্রমিক অসন্তোষ লাঘব হয়ে শিল্পে সুবাতাস বহিতে থাকে এবং শ্রমিকরা নিজ নিজ কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। বর্তমান শিল্পে এমন বৈরী পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধৈর্য ও শান্তিপূর্ণ ভাবে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রদানের বিষয়টি সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। এক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণে যেন বড় ধরনের কোন বৈষম্য পরিলক্ষিত না হয় সেদিকে শ্রমিক মজুরি বোর্ডকে অধিক দৃষ্টি দিতে হবে। বর্তমান এই শিল্পে সেসব সমস্যা বিরাজ করছে তা উত্তরণের জন্য সম্মিলিত ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদেরকে আকৃষ্ট করতে হবে। যদি এখনও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয় তবে অদূর ভবিষ্যতে এই শিল্পের অগ্রগতিকে মরাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। যদিও কোন কারণে উক্ত শিল্প ধ্বংস হয় তবে এতে মালিকদের চাইতে শিল্পের শ্রমিকরাই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে সামাজিক অস্থিরতা এবং অসামাজিক কার্যকলাপ আরো বাড়বে। কেননা মালিকরা যদি মুনাফার কানাকড়ি না ছেড়ে বরং বিরাজমান জঞ্জাল থেকে মুক্তির জন্য এই শিল্প থেকে অর্থ গুটিয়ে অন্য যেকোন খাতে অর্থ বিনিয়োগ করে তা হবে সম্ভাবনাময়ী গার্মেন্ট শিল্প তথা এর সঙ্গে জড়িত লাখো শ্রমিকের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বেকারত্ব দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্ভাবনাময়ী এই শিল্পের মানোন্নয়নে যা যা করণীয় তা দ্রুত গ্রহণ করতে হবে। কেননা আমরা এদেশের গার্মেন্ট শিল্পকে বিশ্বে এক নম্বর অবস্থানে দেখতে চাই। এটি বাস্তবায়নে বিশেষ করে মালিক, শ্রমিক ও শিল্প সংশ্লিষ্ট সকলের সদিচ্ছা কামনা করি। দেশে এ ধরনের শিল্পের যথাযথ গুরুত্ব ও অবদানের কথা মাথায় রেখে সকলে মিলে শিল্পকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমনটিই প্রত্যাশা করি। এখন শুধু শিল্প সংশ্লিষ্ট সকলের অধিক সদিচ্ছাই পারে উক্ত শিল্পে বিরাজমান নৈরাজ্যের হাত থেকে রক্ষা করে শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে। লেখক :বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি [email protected]