অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার নৌ-টার্মিনালের (আইসিটি) সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হইয়াছে। ইতিমধ্যে টার্মিনাল ভবনে স্থাপিত সোনালী ব্যাংক ও কাস্টম হাউসের কাজও শুরু হইয়া গিয়াছে পরীক্ষামূলকভাবে। আগামীকাল ২১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী ইহা উদ্বোধন করিবার কথা। চট্টগ্রাম বন্দরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইহা নিশ্চিত করিয়াছেন যে উদ্বোধনের পরপরই আইসিটি পুরোদমে সচল হইয়া উঠিবে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে টার্মিনালটি চালু হইবার কথা ছিল অনেক আগেই। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের অপেক্ষা করিতে হইয়াছে দীর্ঘ ২২টি বত্সর। পৌনে দুইশত কোটি টাকার এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করিয়াছিল প্রায় একযুগ আগে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হইয়াছে গত বত্সরের মে মাসে। কিন্তু টার্মিনালটি কে পরিচালনা করিবে— তাহা লইয়াই কাটিয়া গিয়াছে অতি মূল্যবান আরও প্রায় একটি বত্সর। ইহা হইতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনভিপ্রেত দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার ধরনটি কিছুটা আঁচ করা যায়। ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে বিআইডব্লিউটিএ’র ৩২ একর জমির উপর গড়িয়া উঠা আধুনিক সুবিধা-সংবলিত এই টার্মিনালে বত্সরে এক লক্ষ ১৬ হাজার কনটেইনার ওঠানামার ব্যবস্থা রহিয়াছে। অতএব, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গতি সঞ্চারে ইহার গুরুত্ব ও তাত্পর্য কী অপরিসীম তাহা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করিয়া টার্মিনালটি যে সচল হইতেছে ইহাই এই মুহূর্তে সব চাইতে স্বস্তির সংবাদ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানাইয়াছেন যে কনটেইনার পরিবহনে বর্তমানে যেইখানে ৭ দিন হইতে একমাস পর্যন্ত সময় লাগিয়া যায়, পানগাঁও টার্মিনাল চালু হইলে তাহা মাত্র ২৪ ঘন্টায় নামিয়া আসিবে। ফলে শুধু যে ব্যয় সাশ্রয় হইবে তাহাই নহে, ব্যবসা-বাণিজ্যেও সঞ্চারিত হইবে নূতন গতি ও উদ্যমের। তাহার মতে, নূতন এই নৌ রুটে দৈনিক চারটি জাহাজ চলাচল করিবে। কনটেইনারবাহী একটি জাহাজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হইতে ৫০টি ট্রাকের চাপ হ্রাস করিতে সক্ষম হইবে বলিয়া তিনি জানান। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিজেএমইএ) নেতৃবৃন্দও প্রায় অভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর হইতে পানগাঁও বন্দরের দূরত্ব ২৮৩ কিলোমিটার বা ১৫৭ নটিক্যাল মাইল। এই পথে কনটেইনারবাহী জাহাজ আসিতে সময় লাগিবে সর্বোচ্চ ১৭ ঘন্টা। আর ব্যয় সড়কপথের তুলনায় অর্ধেকেরও নীচে নামিয়া আসিবে। রেলপথের তুলনায়ও তাহা কনটেইনারপ্রতি প্রায় ৫ হাজার টাকা কম। যে-চিত্রটি তুলিয়া ধরা হইয়াছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারাকে অধিকতর বেগবান করিবার ক্ষেত্রে তাহার গুরুত্ব ও তাত্পর্য অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে যেইসব পণ্য খালাস হয় তাহার প্রায় ৭০ শতাংশই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের। এইসব পণ্যের ৯০ শতাংশই আসে সড়কপথে। মাত্র ১০ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয় রেলপথে। রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের দুঃসহ চাপ লাগিয়াই থাকে। সেই সাথে দুর্ঘটনা, সেতু বা সড়ক মেরামতের কারণেও প্রায়শ সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজটের। অন্যদিকে, ডাকাতির ঝুঁকিও দিনদিন বাড়িয়া চলিয়াছে। সড়কপথের আরেকটি গুরুতর প্রতিবন্ধকতা হইল হরতাল বা ধর্মঘট। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই ধরনের অনভিপ্রেত পরিস্থিতিও এখন নৈমিত্তিক বিষয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এই নৈরাশ্যজনক বাস্তবতার বিপরীতে নবনির্মিত নৌ টার্মিনালটি যে আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড়ো ধরনের আশাব্যঞ্জক সংবাদ তাহাতে সন্দেহ নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বহু আগেই বলিয়াছিল যে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থাকে কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করিবার মাধ্যমে বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করিতে পারে। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ অভ্যন্তরীণ নৌপথের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমরা অদ্যাবধি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে পারি নাই। পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে একটি শুভ সূচনা। পাশাপাশি, শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের উপর অত্যধিক নির্ভরতা কমাইয়া আনিবার বিষয়টিও গুরুত্বের সহিত ভাবিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে।
