স্বাস্থ্যবিমা তথা ওবামাকেয়ার লইয়া যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা যেইভাবে কাজিয়ায় লিপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল এবং যেইভাবে উভয়পক্ষ স্থিরসংকল্প ছিলেন নিজ নিজ অবস্থানে, তাহাতে আমেরিকার ‘শাট ডাউন’-অবস্থার উন্নতির চিন্তায় অস্বস্তির বাতাবরণ ছিল বিশ্বজুড়িয়াই। লাগাতার আলোচনা আর চূড়ান্ত ‘দর কষাকষি’র পর কাজ চালানোর মতো ঐকমত্যের সন্ধানে পৌঁছিয়াছেন তাহারা। ইহার সুবাদেই শেষ পর্যন্ত কর্মে ফিরিয়াছে আমেরিকা। সময়সীমা অতিক্রমের পূর্বেই মিলিতেছে নূতন করিয়া ‘ঋণ’ লইবার ‘ছাড়পত্র’, যাহা না-পাইলে গত বৃহস্পতিবার হইতেই অনেক খরচই চালাইতে পারিত না আমেরিকা। শোধ করিতে পারিত না পুরনো ধারও। সেইক্ষেত্রে ইতিহাসে প্রথম বার সময়মতো বকেয়া না-মেটাইবার ‘লজ্জা’য় পড়িতে পারিতেন তাহারা। সুতরাং অবশেষে যে রফাসূত্র মিলিয়াছে, তাহা স্বস্তি দিয়াছে পুরো বিশ্বকেই। কেননা, সমস্যাখানি আমেরিকার নিজস্ব হইলেও তাহার অভিঘাত ছড়াইয়া পড়িত পুরো বিশ্বেই।
সমাধান যে মিলিল, তাহাই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আবার এই গণতন্ত্রের ভিতরেই সৃষ্টি হইয়াছিল এইরূপ গহীন খাদ—যাহা পুরো ব্যবস্থাকেই অচলায়তনে পরিণত করিয়াছিল। তাহার কারণ নিহিত রহিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মূল তিনটি স্তম্ভের ভারসাম্যের ভিতরে। হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ, সিনেট ও প্রেসিডেন্ট—মূলত এই তিনটি স্তম্ভ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। এইবার তাহার বিচ্যুতি ঘটিয়াছিল বলিয়াই এই বিপর্যয়। কিন্তু ইহা নূতন নহে যুক্তরাষ্ট্রে। বিগত ৩০ বত্সরে আমেরিকায় এইরকম ‘শাট-ডাউন’ হইয়াছে আঠারো বার। ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের জামানায় ২১ দিন বন্ধ ছিল আমেরিকার সরকার, যাহার ফলস্বরূপ সে সময় অর্থনীতির ক্ষতি হইয়াছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার। এইবার সেই ক্ষতির পরিমাণ ক্লিনটনের সময়ের তুলনায় ২০ গুণ অধিক। বলা যায়, সবে মন্দা হইতে অল্পস্বল্প মাথা তুলিতে শুরু করা মার্কিন অর্থনীতিকে লইয়া এমন ‘ছিনিমিনি খেলা’য় বিরক্ত আমেরিকানরা। আগামীতে ডেমোক্র্যাটরা সম্ভবত ওবামাকেয়ার পাইতেছেন। তাহার বদলে দীর্ঘ-মেয়াদে বিপুল খরচ ছাঁটাইয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে হইতেছে ডেমোক্র্যাটদের। কেননা, রিপাবলিকানদের যুক্তিও শক্তিশালী—ওবামাকেয়ারের সবটুকুই যে ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং (এইক্ষেত্রে—স্বাস্থ্যবিমা) পীবেত্’!
সরকারি কার্যপরিচালনার জন্য আমেরিকার সরকারকে অর্থ জোগাড় করিতে হয় দুটি রাস্তায়—কর আদায় করে এবং সরকারি ঋণপত্র (ট্রেজারি বন্ড ) বাজারে বিক্রি করে। এই বন্ড যাহারা ক্রয় করেন, তাহারা সরকারকে মূলত অর্থ ধার দেন। আমেরিকার সরকারকে ওই অর্থের জন্য সুদ প্রদান করিতে হয় প্রতি মাসে। চলতি অর্থবর্ষেই সুদবাবদ মার্কিন সরকারকে প্রদান করিতে হইবে প্রায় ৪২ হাজার কোটি ডলার! শুধু আগামী মাসেই সুদপ্রদান করিতে হইবে আড়াই হাজার কোটি ডলার। ফেডারেল সরকার যাহাতে প্রয়োজনের অধিক বেহিসাবি খরচ করিতে না পারে, তাহার জন্য কী পরিমাণ ধার লইতে পারা যায় তাহারও একটি সর্বোচ্চ সীমা স্থির করিয়া দিয়াছে কংগ্রেস। অত্যাবশ্যক প্রয়োজনে ওই সীমা (ডেট সিলিং) বৃদ্ধি করা যাইতে পারে বটে। কিন্তু, এইবার রিপাবলিকানরা তাহা করিতে চাহে নাই আমজনতার স্বাস্থ্যবিমার কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থ ‘ঋণ’দ্বারা শোধ করিতে।
সুতরাং এই অচলাবস্থা না কাটিলে ফেডারেল সরকার বিভিন্ন দফতর চালাইবার অর্থ আটকাইয়া যাইত। আর মার্কিন সরকার যদি একবার ‘ডিফল্ট ’ (সুদ বা ঋণের টাকা সময়ে পরিশোধ করিতে ব্যর্থ) হইত, তাহার অভিঘাত শুধু আমেরিকায় নহে গোটা বিশ্বের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়িত। কেননা, মার্কিন সরকারি ঋণপত্রে চীনের বিনিয়োগ লক্ষ কোটি ডলার। জাপান, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উত্পাদনকারী দেশসমূহেরও রহিয়াছে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ। যাহারা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কিনিয়াছে, তাহাদের কাছে কথার খেলাপ হইত যদি আমেরিকা সুদের অর্থ সময়ে দিতে না পারিত। আমেরিকার অর্থনীতিকে মনে করা হয় শক্ত, সবল, মজবুত একটা কাঠামো হিসাবে। এমন ধারণা রহিয়াছে যে জগত ওলটপালট হইয়া গেলেও আমেরিকা সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবার ক্ষমতা রাখে। আধুনিককালে কোনোদিন আমেরিকা ‘ডিফল্ট’ করে নাই টাকা-পয়সার ব্যাপারে। সুতরাং সকল অর্থে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন থাকিয়াই যায়, এত্ত এত্ত ঋণ কি আমেরিকার মেরুদণ্ডের কশেরুকায় ভাঁজ ফেলিতেছে না? চিরকাল সেই মেরুদণ্ড কি সোজা রাখা সম্ভব হইবে এইরূপ নীতিতে?
