আসল ও নকল (২য় পর্ব)

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৩, ২২:১১
বাস্তবতার নিরিখে ‘পরি’ নকল। ‘কল্পনা’ও নকল। তবে ‘পরিকল্পনা’ আসল। প্রণয়নে নয়; বাস্তবায়নে। অবাস্তব পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পায় না। কল্পনা কল্পতরুর ফল। এটা মানস রচনা; জাগ্রত স্বপ্ন। অনুমান। পরিকল্পনা সুগ্রথিত চিন্তন। সকল উদ্ভাবনের সম্ভাবনাময় বীজ। পরিকল্পনার ‘পরি’ ডানাকাটা পরি। তাই উড়ে যায় না। ‘পরি’ উড়ে গেলে যা পড়ে থাকে তার নাম ‘কল্পনা’। কল্পনা স্বপ্নের সহোদর। এ স্বপ্ন জেগে দেখতে হয় বলে একে কিন্তু ‘দিবাস্বপ্ন’ বলা যায় না। নয় স্বপ্নচারিতা, স্বপ্নবিলাস বা অলীক। ঘুমালে একে দেখা যায় না। বরং এ-স্বপ্ন ঘুম কেড়ে নেয়। এর সফল রূপায়ণের আগে ঘুমোবার জো নেই। কল্পনার রঙে আল্পনা এঁকে অপরূপকে রূপ দিতে হয়। স্বপ্নের সঙ্গে কল্পনার সখ্য সুদৃঢ়। তারা উভয়েই একই খেয়ার অলৌকিক অভিযাত্রী। আত্মার আত্মীয়। পরম সুহূদ। কল্পনা সকল আবিষ্কারের, সকল উদ্ভাবনের মূলমন্ত্র। যেখানে কল্পনা রহিত, নব-আবিষ্কার সেখানে স্থবির। উড়বার কল্পনা মানুষকে বিমান উদ্ভাবনে ব্রতী করেছে। কল্পনাবিলাসী নিন্দিত; কিন্তু পরিকল্পক নন্দিত। তেমনি স্বপ্নদ্রষ্টা বরণীয়, স্বপ্ন-বিলাসী বর্জনীয়। বিলাসের সঙ্গে হয় আয়েশের অনুগমন, আর বাস্তবায়নের সঙ্গে নিরলস প্রচেষ্টার। বিলাস অকর্মণ্যের সহচর, সহযাত্রী। স্বপ্নচারিতা অর্থহীন। স্বপ্নকে কর্মের বর্মে সুরক্ষিত রাখতে হয়। শ্রমের ঘামের রঙে একে রূপায়িত করতে হয়। সাহসের চাকায় সচল রাখতে হয়। সাধনার ঐকান্তিকতায় সাধতে হয়। হূদয়ের উষ্ণ আলিঙ্গনে বাঁধতে হয় পরম সখার মতো। কল্পনার উত্স থেকেই ঘটে সৃজনশীলতার অবাধ উত্সারণ। ‘পরি’ এবং ‘কল্পনা’ এ দুয়ে মিলে যখন ‘পরিকল্পনা’ নামে যুগলবন্দি হয় তখনই তারা বাস্তব হয় বাস্তবায়নান্তে। তখন তারা আসল। মাছ আমিষ; ফরমালিন বিষ। ফরমালিনের স্বচ্ছ প্রলেপ মাছকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই ফরমালিন মাছ বিক্রেতার জন্য আশীর্বাদ। লক্ষ্মী-নারায়ণ। অন্য কথায় ‘নগদ নারায়ণ’। যদিও তা অনৈতিক। কিন্তু তা ভোক্তার জন্য মহাযম— মরণ। বিক্রেতার জন্য হিতকর; ভোক্তার জন্য হানিকর। ফরমালিন মাছ-ভোক্তার জন্য বিষ। ভোক্তা পারে তো ফরমালিনের জাত নিপাত করে। কারণ ফরমালিন ঐ আাামিষের পচন রোধ করে বটে; তবে ভোক্তার জঠর-যকৃত পচায়। ফরমালিন তার কাছে প্রাণ সঞ্চারক নয়; প্রাণ সংহারক। কলম আসল। কলমদানিও আসল। তবে সব কলমধারীই আসল নয়। কোন কোন কলমধারী নকল। কলম যদি জুলুম করে, তা কলমের দোষ নয়; কলমধারীর দোষ। কলম যদি বাজে কথা লিখে তা কলমবাজের দোষ, কলমের নয়। কলম যদি সত্যতে মিথ্যার চাতুর্যে ঢেকে সত্য বলে চালিয়ে দিতে চায়— তা কলমবাজের মতলববাজী। তার কাছে ‘মতলব’ আর ‘কলম’ সমার্থক। ‘কলম’ ও ‘মতলব’— কারোরই আ-কার, ই-কার নেই। কলম যেমন আসল, মলম তেমন আসল না-ও হতে পারে। তবে মলম প্রস্তুতকারক নকুলে হলেই এদের ভাগ্যে ‘নকল’ তকমা জোটে। সমাজ দেহে ‘নকল’ যে গনগনে ক্ষত তৈরি করে— তা ‘কলম’ নামের ‘মলম’ দ্বারা উপশম করা যেতো যদি কলমচি আসল হতো। কারণ, আসল ছল জানে না। চাতুরী জানে না। আসল যা জানে, তা মানে। মাধুরী বিলায়, চাতুরী নয়। আসলে আদর থাকে। যত্নের রত্ন থাকে। সস্নেহ সোহাগ থাকে। প্রীতির প্রসন্নতা থাকে। উদার উষ্ণতা থাকে। প্রাণের ছোঁয়া থাকে। ত্যাগের মহিমা থাকে। কিন্তু নকলে এগুলোর প্রকাশ থাকে বটে, তবে মর্মার্থ থাকে না। অন্তর্গত অস্তিত্ব থাকে না। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে মস্তকই দেননি; মগজও দিয়েছে। আর এ মগজময় মস্তককে স্থাপন করেছেন দু’বাহুর উপর। তাই তা তাত্পর্যবহ। বাহুবলের চেয়ে বুদ্ধিবলকে প্রাধান্য দিতে হয়। মুখ একটি, কান দু’টি, হাত দু’টি। যাতে আমরা যতটুকু বলি, তার অন্তত দ্বিগুণ শুনি। দ্বিগুণ কাজ করি। কিন্তু আদতে আমরা করি তার উল্টোটা। এমন উল্টোরথে চলার প্রেক্ষাপটে সবই ওলট-পালট। জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষের সংখ্যা কমছে। দ্রব্যমূল্য বাড়ছে, মূল্যবোধ কমছে। শিক্ষিতের হার বাড়ছে, শিক্ষার মান কমছে। মৃদু কথন কমছে, অতিকথন বাড়ছে। শ্রদ্ধাবোধ কমছে, হুকুম-হুমকি-হুংকার বাড়ছে। গলাগলি কমছে, গালাগালি বাড়ছে। মাথার চুল কমছে, চুলোচুলি বাড়ছে। উপাসনালয় পাকা হচ্ছে, বিশ্বাস কাঁচা হচ্ছে। ভাইয়ের আদর কমছে, শ্যালকের আদর বাড়ছে। খালামনির সোহাগ বাড়ছে, ফুফুর সোহাগ কমছে। স্বজনপ্রীতি বাড়ছে, নীতিবোধ কমছে। কাণ্ডারি কমছে, কাণ্ডজ্ঞানহীন বাড়ছে। গাছ কমছে, আগাছা বাড়ছে। সুখীর সখা আছে। দুঃখীর দোসর নেই। নেতা বাড়ছে, কমছে কর্মী। মমতা কমছে, মতভেদ বাড়ছে। অযোগ্য মূল্য পাচ্ছে, যোগ্য সমাজচ্যুত হচ্ছে। ছাত্রের হাতে বই নেই ; বারুদ আছে। কলম নেই, কিরিচ আছে। গলায় গান নেই, কাঁধে Gun আছে। দুষ্ট পুষ্ট হচ্ছে; শিষ্ট ক্লিষ্ট হচ্ছে। রুষ্টের সংখ্যা বাড়ছে, তুষ্টের সংখ্যা কমছে। কমছে আন্তরিকতা, বাড়ছে লৌকিকতা। কর্মীর হাত কমছে। হাতিয়ে নেবার হাত বাড়ছে। রাজনীতিজীবীর সংখ্যা বাড়ছে, রাজনীতিবিদের সংখ্যা কমছে। ‘কলম চোর’ হয়তো কমেছে, তবে ‘কলম দিয়ে চুরি’র প্রবণতা বেড়েছে। সমাজের এমন হতচ্ছাড়া অবস্থায় একমাত্র সহায় কল্যাণমুখী উদ্যোগ। যার অন্য নাম সুশাসন বা সেবা। আর তা নিশ্চিত করতে পারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সত্য থেকে বিচ্যুত হলেই যতো বিপত্তি। তখন আসল শূলে চড়ে; নকল জয়ধ্বনি পায়। ফার্সী বয়ানটা তাই তাত্পর্যবহ: ‘গোর্বা আমির, ছাগে উজির, মৌশে দর্বা মিকুনাদ/ ইছুনি আর্কানে দৌলত মুলেক রা-বি রাকুনাদ’। সোজা কথায়—সারমেয়, মার্জার, মূষিক অধ্যুষিত সাম্রাজ্যের ধ্বংস অবধারিত। তাইতো রবীন্দ্রনাথের সত্য সাধনার তাগিদ-‘যদি দুঃখে দহিতে হয় তবু মিথ্যা চিন্তা নয়/যদি দৈন্য বহিতে হয় তবু মিথ্যা কর্ম নয়/যদি দণ্ড সহিতে হয় তবু মিথ্যা বাক্য নয়’। আর সেখানেই নান্দনিক শান্তি, পরম স্বস্তি। সেখানেই প্রগতি, কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি। লেখক:গবেষক ও প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন