গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ লইয়া নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা এখনও অব্যাহত আছে। প্রত্যাশিতভাবেই সেই আলোচনা আবর্তিত হইতেছে তাঁহার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করিয়া। প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তাব দিয়াছেন। প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্ভাব্য সদস্যদের নাম পাঠানোর অনুরোধও জানাইয়াছেন তিনি। একই সাথে এই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করিয়াছেন যে বিরোধী দলের নেতা তাহার এই আহ্বানে সাড়া দিবেন। এই প্রস্তাবের ব্যাপারে বিরোধী দল এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানাইলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তাহাদের অনড় মনোভাব অস্পষ্ট নহে। সুশীল সমাজের পক্ষে যাহারা নানা বিষয়ে প্রায়শ উচ্চকণ্ঠ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিয়া থাকেন তাহারা স্পষ্টতই দ্বিধাবিভক্ত। কেহ কেহ যেমন প্রস্তাবটিকে আশাব্যঞ্জক বলিয়া মন্তব্য করিয়াছেন, তেমনি অনেকে ইহার কঠোর সমালোচনাও করিয়াছেন সরাসরি। সব মিলাইয়া, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া অনিশ্চয়তার যেই দোলাচলে সারাদেশ আবর্তিত হইতেছে তাহা প্রায় অপরিবর্তিতই রহিয়া গিয়াছে।
প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে অনেকের কথাবার্তা শুনিয়া ও হাবভাব দেখিয়া বিষয়টিকে যতোটা সহজ মনে হইতেছে, আদতে তাহা ততোটা সহজ নহে। তাহারা প্রায়শ বিস্মৃত হন যে এই ক্ষেত্রে জানা-অজানা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহু ফ্যাক্টরও প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল আছে। এই বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করিয়া যতো হিসাব-নিকাশই করা হউক না কেন— তাহা কোনো কাজে আসিবে বলিয়া মনে হয় না। পাশাপাশি, ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে সুপ্রীমকোর্টের রায়ের আলোকেই সংবিধান সংশোধিত হইয়াছে। বাতিল করা হইয়াছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই যে প্রধানমন্ত্রী তাহার প্রস্তাবটি উত্থাপন করিয়াছেন তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই বলিলেই চলে। এই প্রস্তাব অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চারও করিয়াছে। অন্যদিকে, বিরোধী দল যাহা চায় তাহা পূরণ করিতে হইলে সংবিধান সংশোধন ছাড়া গত্যন্তর নাই। কিন্তু সেই পথ যে ইতিমধ্যে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেই তাহার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রহিয়াছে। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে জনগণের বুকের ওপর চাপিয়া বসা জগদ্দল পাথরের সহিত তুলনা করিয়া তিনি খোলাখুলিই বলিয়াছেন যে এই ধরনের অসাংবিধানিক শাসনের পুনরাবৃত্তি আর কখনোই হইবে না— ইহাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
অতএব, সমাধান যাহাই হউক না কেন—তাহা যে সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই হইতে হইবে— প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই বার্তাটি মোটেও অস্পষ্ট নহে। বল এখন মধ্যমাঠে। বাকিটা নির্ভর করিতেছে রাজনীতির মাঠের বৃহত্ দুই খেলোয়াড়ের ওপর।
