সংকট সমাধান কোন পথে

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৮
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ‘আস্থার সংকট’ দূর করার দৃশ্যমান সদিচ্ছার আড়ালে কার্যত প্রধান দু’টি দল কৌশলে নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে পরিস্থিতি আরো ‘জটিলতর’ করে তুলছে। যদি ধরে নেই একটি দীর্ঘস্থায়ী সদিচ্ছা নিয়েই ক্ষমতাসীন দল পঞ্চদশ সংশোধনী করেছিল তথাপি সংকট সৃষ্টির প্রধান দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে। সুবিধাজনক ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প চূড়ান্ত না করেই অনেকটা স্বেচ্ছাচারী আদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। যদিও এটি প্রতিবারই নতুন রূপে নতুন নতুন উপসর্গ জন্ম দিয়ে আসছিল। তাই আমাদেরকে বর্তমান অবস্থায় থেকেই উত্তরণের পথ বের করতে হবে। সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী বিরোধীদল- নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বাইরে কিছু মানতে নারাজ। অন্যদিকে বর্তমান সংবিধানের আওতায় সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠনে ছাড় দিতে প্রস্তুত ক্ষমতাসীন দল। এই প্রেক্ষাপটে দুই দলের নেতা-কর্মীদের যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ঝড় বইতে শুরু করেছে তার লাগাম যথাসময়ে ধরতে না পারলে কোন সুফল তোলা যাবে না আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায়। দুই নেত্রীর আইনজীবীখ্যাত ব্যারিস্টার রফিক-উল-হকের বক্তব্য খুব তাত্পর্যপূর্ণ। তার মতে- প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবেই ৯০ ভাগ সমাধান হয়ে গেছে। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ‘প্রধান’ থাকবেন কি থাকবেন না, সুস্পষ্ট কিছু বলেননি তাই উভয়ের সমঝোতার পথ রয়েছে এখানে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেস্টা এইচ টি ইমাম বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে থাকবেন সেটি সংবিধানই নির্ধারণ করে দিয়েছে। সংবিধানের দোহাই প্রসঙ্গে একটু মনে করিয়ে দিতে চাই ৭ম সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জানতো ১৩ জুলাই ২০০১ তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। রাষ্ট্রপতি নিয়ম অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে উদ্যোগ নিবেন। সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনী শুধু কথিত বিতর্কিত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থাই বাতিল করেনি একই সাথে সরকারের ‘শেষদিন’ বলে কিছু বহাল রাখেনি বর্তমান সংবিধানে। অনেকগুলো বিকল্প দিয়ে চাতুর্যের সাথে তাদের পছন্দসই পথে যাত্রা অব্যাহত রাখার বৈধতা দিয়ে রাখা হয়েছে। এটি পালাবদলের সংকটে নবতর সংযোজন। ’৯০-এর পর নতুন প্রেক্ষাপটে ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শুরু হলেও নির্বাচনের সংস্কৃতিতে আমাদের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ৬ষ্ঠ ও ৮ম সংসদের প্রাক্কালে বিএনপির সংবিধানপ্রীতি ও অনড় অবস্থান, ২০০১ সালে শেখ হাসিনার ‘গণভবনে থেকে’ নির্বাচন করার আকাঙ্ক্ষা আর বর্তমান সময়ে ‘ক্ষমতাসীন থেকে’ এমনকি সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার ইচ্ছা একই পরম্পরা। এই সংকটে এগিয়ে আসার মতো তৃতীয় কোন শক্তির অস্তিত্ব নেই; উত্তরপাড়ার দিকে না তাকানোই শ্রেয়। দয়া করে বাইরের শক্তির দিকে তাকিয়ে নিজেদের হেয়-করবেন না। যদিও সবসময় এ কাজটি বিরোধীদলের জন্য সহজতর, অন্যদিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর। সরকার ক্রমশ পুলিশী রাষ্ট্রের পথে অগ্রসর হচ্ছে; বিরোধীদল যুত্সই নৈরাজ্যের পথ খুঁজছে। কারো কাছেই যুক্তির ভান্ডারের ঘাটতি নেই। শুধু সমাধানের আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখছি না কোন শিবিরে। বিশেষত সিদ্ধান্ত যখন দুই ব্যক্তির হাতে। ‘সাপ মরবে কিন্তু লাঠি ভাঙবে না’- এমন স্মার্ট সমাধানের পথ খুঁজছি আমরা সবাই। বিশেষ করে ‘ছাড়’-এর মধ্যে যখন ‘হার’ আতংক কাজ করে সমাধান তখন দূরে সরে যায়। উভয়পক্ষের অবস্থানের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আলোচনাকে ‘সার-সংক্ষেপ’ আকারে দু’টি বিকল্প হিসাবে বিবেচনার জন্য পেশ করা যায়। প্রথমত. ‘নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মৌলিক দাবি ক্ষমতাসীনদের মেনে নিতে হবে, তবে প্রধান উপদেষ্টা ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে নীতিগতভাবে তাদের মতামত প্রাধান্য পাবে।’ দ্বিতীয়ত. ‘বর্তমান সংবিধানের আওতায় সব দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব মেনে নিতে হবে, তবে উপদেষ্টার অনুপাত শেষ দু’টি সংসদ নির্বাচনে গড় ভোট প্রাপ্তির নিকটতম হার অনুযায়ী হতে হবে এবং প্রধান উপদেষ্টা যথারীতি উভয়ের সম্মতিতে।’ এর চেয়ে শর্টকাট ভালো কোন সমাধান আপাতত আমি দেখছি না। যদিও বিরোধীদল বিকল্প প্রস্তাব মানবে এটি ভাবা যেমন দুষ্কর; তেমনি সমাধানের পথে ক্ষমতাসীন দল এগিয়ে আসবে এটিও আমাদের সংস্কৃতিতে ‘অবাক’ হবার মতোই। তবে সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর ক্ষমতা আছে যারা আছেন ‘ক্ষমতায়’। দয়া করে সংবিধানের দোহাই না দিয়ে সহজ ও দ্রুততম সমাধানের পদক্ষেপ নিন। একটি ‘প্রকৃত জাতীয় ঘোষণা’ শুনতে উদ্গ্রীব উত্কণ্ঠিত মানুষ। একতরফা নির্বাচন এদেশের মানুষ কোনদিন মেনে নেয়নি- এবারও মেনে নিবে না। লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন