স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতির দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নতি সাধিত হইয়াছে। কিন্তু দেশের পূর্বাঞ্চলের পাহাড়, উত্তরাঞ্চলের চর ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা এখনও সুনিশ্চিত নহে। এই তিন অঞ্চলের মধ্যে আবার পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি মানুষদের সঙ্কট তুলনামূলকভাবে বেশি। হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব পাবলিক হেলথ পরিচালিত সামপ্রতিক এক গবেষণায় এমন ফলাফলই প্রকাশিত হইয়াছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহায়তায় পরিচালিত ঐ গবেষণায় দেখা গিয়াছে ঐ তিনটি অঞ্চলের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ প্রয়োজনানুসারে খাদ্য পায় না। উপকূলীয় অঞ্চল, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চর, পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড় ও হাওর এলাকায় ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০১৩ সময়কালে, ৯,০২৪টি বাড়িতে এই জরিপ পরিচালিত হয়। যৌথ জরিপের এই গবেষণাটির নাম দেওয়া হইয়াছে ‘ফুড সিকিউরিটি ন্যাশনাল সার্ভিলেন্স প্রজেক্ট’। বিশেষ কয়েকটি অঞ্চলে খাদ্যের এই সমস্যা নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যের উপর বিশেষ বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতেছে।
একসময় দেশব্যাপীই খাদ্যসঙ্কট ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যপরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়াছে। কয়েক বত্সর আগেও উত্তরাঞ্চলে মৌসুমী অনাহার মঙ্গার উপস্থিতি ছিল, আজ দেশ হইতে মঙ্গা দূর হইয়াছে। বাংলাদেশ খাদ্য উত্পাদনে বিশেষত প্রধান খাদ্য ধান উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করিয়াছে। দেশের মানুষ এখন আর অনাহারে মরিতেছে না কিংবা কেবল একবেলা খাইয়া বুভুক্ষু জীবন যাপন করিতেছে না। নানান অর্থনৈতিক সমস্যা থাকিবার পরও কৃষি, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের বরাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত শক্ত অবস্থানে উপনীত হইয়াছে। উপরন্তু, বিগত পাঁচ বত্সরে পুরা বিশ্ব ব্যাপক খাদ্যসঙ্কটে উপনীত হইলেও, বাংলাদেশ সেই বৈশ্বিক ধাক্কা ভালোমতোই মোকাবেলা করিয়াছে। খাদ্যে বৈশ্বিক সঙ্কটের গতি-প্রকৃতি বলিতেছে অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃষির গুরুত্ব বাড়িবে। একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল। পরে শিল্পায়নের ফলে শিল্প-নির্ভর বিশ্ব-অর্থনীতি পাওয়া গিয়াছে। এইসময় শিল্পনির্ভর দেশগুলিই দ্রুত ধনী দেশে রূপান্তরিত হইয়াছিল। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরিয়া বলা হইতেছে শিল্পের স্থান দখল করিয়াছে তথ্য। প্রথমে শিল্প ও পরে তথ্যনির্ভর যেই বিশ্ব-অর্থনীতি, তাহাতে কৃষি অবহেলার শিকার হইয়াছে। বৈশ্বিক খাদ্যসঙ্কট সৃষ্টি হইলে কৃষির গুরুত্ব পুনরায় ফিরিয়া আসিয়াছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ কৃষিপেশায় নিয়োজিত। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৮.৬ শতাংশ। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কৃষিজ উত্পাদন বাড়াইতে পারিলে, ইহা আশীর্বাদরূপে আবির্ভূত হইতে পারে। বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হইলেও খাদ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে রহিয়াছে। সামপ্রতিক জরিপটিই তাহার প্রমাণ দিতেছে। কৃষিতে নিয়োজিত জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাহা ছাড়াও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে না এই জনগোষ্ঠী। ব্যাপক নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি দ্রুত কমাইয়া দিতেছে কৃষিজ জমির পরিমাণ। সার লইয়া রহিয়াছে সঙ্কট ও অব্যবস্থাপনা। ভারতের বিভিন্ন নদীতে বাঁধ দেওয়ার কারণে আমাদের উত্তরাঞ্চল ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া মরুকরণের সম্মুখীন। অনাবৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত জলাধারের জন্য কৃষি হুমকির সম্মুখীন। অবকাঠামোগত কারণ ছাড়াও উপকূলীয় জমি হ্রাস, তাপমাত্রার তারতম্য, আঞ্চলিক আবহাওয়ার সহিত খাপ রাখিয়া বীজ ও জাত উদ্ভাবন করিতে না পারা কৃষিকে হুমকির মধ্যে ঠিলিয়া দিতেছে। সার্বিক এই চ্যালেঞ্জগুলির পাশাপাশি জরিপে উঠিয়া আসা বিশেষ অঞ্চলগুলির খাদ্যসঙ্কটের পিছনে ভূ-প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও থাকিতে পারে। খাদ্যপ্রাপ্তির এই মৌলিক অধিকারের দিকটিতে তাই বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। ঐ অঞ্চলগুলিতে খাদ্যউত্পাদন কীভাবে বাড়ানো যায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাহার বিশেষ ব্যবস্থা লইতে হইবে। উত্পাদনের পাশাপাশি খাদ্যবন্টন ও বিপণনের ঘাটতির কারণে বিশেষ অঞ্চলের মানুষ যেন খাদ্যপ্রাপ্তির সুবিধা হইতে বঞ্চিত না হয় সেইদিকেও খেয়াল রাখিতে হইবে।
