নির্বাচন ফর্মুলায় নতুন ভাবনা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৫
নির্বাচন সকলের দোরগোড়ায়। কোন ফর্মুলায় নির্বাচন হবে তা নিয়েই কেটে গেল গত এক বছরেরও বেশি সময়। কোনো মীমাংসা হলো না। বর্তমান সরকারের অধীনে অথবা নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে- এই সমস্যা নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ মুখোমুখি। একে অপরকে দোষারোপ করার রাজনৈতিক খেলায় মেতে থেকে তারা ভিতরে ভিতরে যার যার রাজনৈতিক শক্তির অবস্থাটা জানাতে চেষ্টা করছে। বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারি দল বলছে, নির্বাচন হবেই এবং সেই নির্বাচনে বিরোধী দলও অংশগ্রহণ করবে। অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, নির্দলীয় সরকার ব্যতীত অন্য কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন করব না এবং করতে দেব না। মল্লযুদ্ধের মত এই দু’দলের যে দল যখন শক্ত অবস্থানে থাকছে তখন আর সংলাপের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আবার ঐ দলটিই যখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসায় পড়ে যাচ্ছে তখন বার বার সংলাপের কথা বলে বেড়াচ্ছে। সংলাপে বসলেই যে আজকের সমস্যার সমাধান হবে তা কিন্তু কেউ তেমনভাবে বিশ্বাস করে না। তবে সকলের ধারণা ছিল, সংলাপে বসার অর্থ হবে বরফ গলার একটি প্রাথমিক পর্যায় শুরু হওয়া। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দু’টি দলের দু’নেত্রী সম্মত না হওয়া পর্যন্ত কোন সমঝোতা হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি আমরা বহুবার লক্ষ্য করেছি। দলীয় কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলের সকল নেতা যে কথাই বলুক, দলের ঘোষণায় প্রাধান্য পাবে শুধুমাত্র দলীয় প্রধানের মতামত। আর এই মতামত চাপিয়ে দিচ্ছে দু’দলের দু’নেত্রী নিজ নিজ দলের নীতির ক্ষেত্রে। কোন দলেই কখনও গণতান্ত্রিক আলোচনা বা ভোটাভুটির কোন হদিস পাওয়া যায়নি। নির্বাচনের ফর্মুলা নিয়ে বিভিন্ন ধারণা বিভিন্ন মহলে প্রচারিত থাকলেও কোন্ ফর্মুলায় নির্বাচন হবে তা নির্ভর করছে দুু’দলের দু’নেত্রীর উপর। সুতরাং সংলাপ হবে কি হবে না, তাও একচ্ছত্রভাবে নির্ভর করছে এই দুই শীর্ষ নেত্রীর উপর। দলের অন্য নেতারা যা-ই ভাবেন বা যেভাবেই ভাবেন, বাস্তবে সেই ভাবনার কোন মূল্য নেই যদি দুই রাজনৈতিক দলের দলনেত্রী ঠিক সেইভাবে না ভাবেন। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে আসন্ন নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে প্রচুর সংশয় বিদ্যমান আছে। নির্বাচন হোক এবং সেই নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ থাকুক এমন ইচ্ছাটি এদেশের জনগণের। নির্বাচন না হলে একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংঘাত প্রায় অনিবার্য। কেননা বর্তমান সংবিধানে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত বর্তমান সরকার বহাল রাখার বিধান রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বহাল থাকলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার জোটের ১৮ দল তা মেনে নিবে না। হরতাল থেকে শুরু করে নানা ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত তখন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে এবং সেই সংঘাতের বিরুদ্ধে সরকার এবং আওয়ামী লীগের অবস্থানকে কেন্দ্র করে দেশে চরম হতাশাজনক বিশৃঙ্খলা শুরু হবে এটা প্রায় চোখ বুজেই বলা যায়। আরও একটি বড় ধরনের ঝুঁকি থাকবে জামায়াত-শিবিরকে নিয়ে। বিশৃঙ্খলার সুযোগে জামায়াত-শিবির যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে গৃহীত বিচার ব্যবস্থার প্রতিশোধ নিতে বড় ধরনের নাশকতামূলক কার্যক্রম ঘটাতে পারে। আর এতসবের কারণে দেশ এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচন করার চিন্তা-ভাবনা করছে। তাহলে সেটি হবে একদলীয় নির্বাচন। কেননা অন্য যত দলই তাতে যোগ দিক, বিএনপি তাতে না এলে তা কারও কাছে সকলের অংশগ্রহণের নির্বাচন হবে না। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনে যোগ দিলে এবং অন্য কোনো দল সেই নির্বাচনে যোগ না দিলেও সেই নির্বাচনই দেশে-বিদেশে গৃহীত হবে সকলের অংশগ্রহণের নির্বাচন হিসাবে। বর্তমান সংকটে তাই দেশে-বিদেশে সকলেরই একমাত্র লক্ষ্য, সামনের নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ। সরকার সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন করতে চায়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের কথা বাদই দিলাম; তারা বরং এখন সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার পক্ষেও নেই। তাদের এই একগুঁয়েমিপনা রাজনৈতিক অবস্থানের ফলে দেশ ও দেশের মানুষ ক্রমশই অধিকহারে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। সংসদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে অনায়াসেই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিতে পেরেছে। দেশটি কার- এই প্রশ্নে সকল মানুষই একবাক্যে উত্তর দেবে ‘দেশটি জনগণের’। কিন্তু সেই জনগণ কি চায় তা যেমন পাত্তা দিচ্ছে না সরকার, তেমনি পাত্তা দিচ্ছে না বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রীর সভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে সরকার খুঁজে নিচ্ছে দেশের মানুষের সমর্থন; অপরদিকে, বিরোধী নেত্রীর সভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বিরোধী দলও খুঁজে নিচ্ছে দেশের মানুষের সমর্থন। কিন্তু এই লাখো মানুষের বাইরেও যে কোটি কোটি মানুষ অবস্থান করছে এবং তারা কি চায় তা দেখা ও জানার চেষ্টা করছে না সরকার ও বিরোধী দল কেউই। ফলে সরকার এবং বিরোধী দল উভয়েই জনগণের তথা দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করতে চাচ্ছে তাদের দু’দলের দু’নেত্রীর ইচ্ছানুসারে। কোন নেত্রী কিংবা কোন দলই দেশের জনগণের ইচ্ছায় দেশ পরিচালনা করার মানসিকতায় নেই। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, বেশিরভাগ জনগণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায়। জনগণের প্রকৃত ইচ্ছাটি কি তা জানার জন্য যে গণভোট, তাও বর্তমান সরকার সংবিধানে রোধ করে বসে আছে। এ কথা জোর দিয়েই বলা যায় যে, আগামী নির্বাচনটি যদি সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করতে সম্মত হতে পারত তবে তা হতো সকল মহলের জন্যই শুভ সংবাদ। অন্যদিকে এ কথাও বলা যায় যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং তা রোধ করার সরকারি পরিকল্পনায় বিরোধী দল সায় দিয়ে যদি বর্তমান সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচনে যোগদান করত তবে তাও হতো সকল মহলের জন্য শুভ সংবাদ। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি যুদ্ধের ময়দানে আগুয়ান। বিনা যুদ্ধে এক বিন্দু ছাড় নাহি দিব- এমন একটি বাস্তবতায় আজকের বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল। আমার মনে হয়, বর্তমান সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে শুধুমাত্র নির্বাচন পরিচালনার জন্য। মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত একজন সরকার প্রধানের অধীনে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচজন সংসদ সদস্য এবং বিএনপি থেকে পাঁচজন সংসদ সদস্য এই ১১ জনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হতে পারে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সরকার প্রধান হিসাবে যে কোন সংসদ সদস্যকেই আহ্বান জানাতে পারে। তবে এই সরকার প্রধান দু’দলের দু’নেত্রীর বাইরে থেকে হতে পারে। আর এমন একটি ব্যবস্থায় সংলাপ জরুরি ভূমিকা পালন করতে পারে। কাজেই উভয় পক্ষই রাষ্ট্রপতির আহ্বানে সংলাপে যোগ দিতে পারে। এর ফলে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয়েরই জেদ রক্ষা হবে এবং বর্তমান সংবিধানেরও কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হবে না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই সমঝোতা মেনে নিলে দেশের জনগণও তা গ্রহণ করে নিবে। বলাই বাহুল্য, এতে আন্তর্জাতিক সমাজের বন্ধুরাও সন্তুষ্টি লাভ করবে। লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন