বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হইয়াছেন আরও এক কিশোরী শিক্ষার্থী। গোপীবাগ সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মারজানা জাহান মুনমুন সকালে কলেজে যাইবার পথে দুর্ঘটনায় নিপতিত হন। সহসা একটি বাস আসিয়া তাহাকে ধাক্কা দিলে গুরুতর আহত হন। অতঃপর মুনমুনের আর কলেজে যাওয়া হয় নাই। হাসপাতালে নেওয়া হইলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাহাকে মৃত ঘোষণা করেন। হূদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত রবিবার কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশের রাস্তায়। ঈদের ছুটির পরে বোধগম্যকারণেই রাস্তা ছিল জনবিরল, যানবাহনেরও ভিড় ছিল না। তারমধ্যেও পিতামাতার বুক খালি করিয়া যন্ত্রদানব কাড়িয়া লইয়াছে এক সম্ভাবনাময়ী কিশোরীর তাজা প্রাণ। অন্যদিকে গণপিটুনির শিকার হইয়াছেন ঘাতক বাসের চালক। তিনিও হাসপাতালে। ইহাতে বিক্ষুব্ধ মানুষের মনের ঝাল হয়তো সামান্য মিটিয়াছে। কিন্তু ইহাতে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো ইতরবিশেষ ঘটিবে, এমনটি আশা করা দুরাশারই নামান্তর।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কেবলই দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইয়া চলিয়াছে। ঘরের বাহিরে পথে পথে যেন ওঁত পাতিয়া রহিয়াছে মৃত্যুর দূত। আঞ্চলিক কী মহাসড়ক, শহর কী পল্লীর রাস্তা কোথাও যেন জীবনের নিরাপত্তা নাই। কোথায়, কোন রাজপথে কখন ধা করিয়া যন্ত্রদানব আসিয়া প্রাণ সংহার করিয়া লইবে তাহার কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন খবর আসে এইসব দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর। সড়ক দুর্ঘটনার বহু সংবাদ আবার থাকিয়া যায় আমাদের জানার বাহিরে। পত্রিকায় কিংবা অন্যকোনো গণমাধ্যমে আসিয়া পৌছায় না সেইসব সংবাদ। প্রত্যহ কত মায়ের বুক খালি হইতেছে, অকালে ঝরিয়া পড়িতেছে প্রতিভাবান কত জীবন, কত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হইয়া চিরতরে কর্মক্ষমতা হারাইয়া দুর্বিষহ জীবন যাপন করিয়া চলিয়াছেন তাহার কোনো ইয়ত্তা নাই। মেধাবি চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, আরেক প্রতিভা মিশুক মনিরের জীবন হরণ করিয়াছে সড়কপথের ধাবমান দানব। ইহার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সিতারা পারভিনের মত অনেক মনীষাদীপ্ত মানুষের জীবনহানি ঘটিয়াছে সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ এবং সুপরিচিত অনেক গুণী মানষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতেছে প্রতিকারহীনভাবে। এই তো গেলো ঈদের ছুটির চার (সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারসহ) দিনে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা পড়িয়াছেন ৩১ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা রিপোর্টে তথ্য প্রকাশ করা হয় যে, এই দেশে গড়ে প্রতিবত্সর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটিয়া থাকে ১২ হাজার মানুষের। এতদ্ব্যতীত কর্মক্ষমতা হারান কম করিয়া হইলেও ৩৫ হাজার মানুষ। বিশ্ব ব্যাংকের অন্য এক হিসাবে বলা হয় বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার যন্ত্রযানের মধ্যে ৮৫. ৬০ ভাগ কখনও না কখনও দুর্ঘটনা কবলিত হইয়া থাকে।
কিন্তু কেন এত দুর্ঘটনা, কেন এত প্রাণক্ষয়? চট জলদি এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া সহজ নয়। বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে আঞ্চলিক ও মহাসড়ক মিলাইয়া আমাদের যে রাস্তা রহিয়াছে তাহার মাত্র ৪০ শতাংশ আছে ভাল অবস্থায়। বাকি ৬০ শতাংশই ভাঙ্গাচুরা না হয় অন্য কোনো প্রকারে ত্রুটিপূর্ণ। গোদের ওপর বিষফোঁড়া অদক্ষ চালকগণ। ফিটনেস বিহীন যানবাহনের দৌরাত্ম্য-সে তো আছেই। ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, একশ্রেণীর পথচারীর পথ চলিতে অসতর্কতা— এইসব সমস্যাও এইখানে নূতন নহে। এই বাস্তবতায় সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাইয়া আনিতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিল রোধ করিতে সকলেরই সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি ট্রাফিক আইন মানিয়া চলিতেও আমাদের অভ্যস্ত হইতে হইবে। সড়ক দুর্ঘনায় মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানির সংবাদ আমাদের প্রতিনিয়ত মর্মাহত করে। এইভাবে আর কত কাল!
