বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩২
লাগামহীন বাকচর্চায় আমাদের রাজনীতিবিদরা বরাবরই কীর্তিমান! স্ববিরোধী আচরণেও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ও নীতি-নির্ধারকদের লাগাতার মানসিক দোলাচলে হালে তা যেন মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী গত বছর সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, প্রয়োজনে ২৪ অক্টোবর সংসদ ভেঙে দেওয়া হবে। বছর না পেরোতেই সেই ভাষ্য দাঁড়ালো—সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচন হবে। তবে আশ্বস্ত করা হলো, ওই সময় সংসদ অকার্যকর থাকবে। এমনকি সরকার এ সময় কোনো নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্তও নেবে না। তার পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গত ১২ সেপ্টেম্বর ঘোষণা দিলেন, ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মাস না পেরোতেই প্রধানমন্ত্রী বললেন— তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ চলবে। কারণ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস হতে নাকি এখনো বাকি। শুধু তাই নয়, বলা হচ্ছে— তফসিল ঘোষণার পরও সংসদ চলতে পারে। এক্ষেত্রে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে বিরোধীদলের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শের প্রয়োজনও মনে করা হলো না। অবশ্য এ বোধ যে অতীতে ছিল, তা কিন্তু নয়। ওই বোধোদয় আচমকা নাজেল হলো এই ঈদুল আজহার দিন, দেশীয় রাজনীতির একেবারে মুমূর্ষু অবস্থায় এসে। গণভবনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে শেখ হাসিনা জানালেন, ‘বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার দরজা এখনো খোলা। আমরা সব সময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত। বিএনপির কোনো প্রস্তাব থাকলে বলতে পারে। আমার কোনো আপত্তি নেই।’ বিএনপির কোন প্রস্তাবে কতটুকুু আপত্তি নেই তা কিন্তু তিনি ধাঁধায় রেখে দিলেন। তবে নির্বাচনের সময়টা পরিষ্কার করেছেন সুস্পষ্টভাবে:‘২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনের ৯০ দিন। এই ৯০ দিনের মধ্যে যে কোনো সময় নির্বাচন হবে। এটা নিয়ে কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।’ আর নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে কথা বলার যে সুযোগ নেই, তা পরিষ্কার করেছেন বহু আগে। তাহলো, সংবিধান অনুযায়ী সব হবে। আর বিএনপির মূল বিষফোঁড়া তো ওই নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা। তাদের এক দফা এক দাবি—তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন নয়। আর প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সংবিধান থেকে এক চুল নড়বেন না, সেক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা তো অর্থহীন। মজার বিষয় হলো, ঈদের দিন খালেদা জিয়ার কণ্ঠেও একইভাবে আলোচনার সুর। ওই দিন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন জানালেন, ‘আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে, যাতে সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে।’ বললেন বটে— ‘আমরা সংঘাত-সংঘর্ষ চাই না, শান্তি চাই’। কিন্তু ওই শান্তিকামিতার(?) শর্ত জানাতে ভুললেন না— ‘আমাদের দাবি সহজ এবং খুবই ছোট। আমরা বলেছি নির্দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে হবে। আওয়ামী লীগ এবং হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। সেই নির্বাচনে কেউ অংশগ্রহণ করবে না।’ কথা তো তাহলে যেই লাউ, সেই কদুই হলো। পাশাপাশি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সরকারকে হুঁশিয়ার করলেন, ‘২৫ অক্টোবর রাজধানীতে বিরোধীদলের সমাবেশ হবেই। তারা সরকার হতে পারে। কিন্তু দেশ তো তাদের একার না। তারা সমাবেশ করবে আর আমরা সমাবেশ করতে পারবো না—এটা তো হবে না। আমাদের সমাবেশ করতে দিতেই হবে’। এর আগে ১৪ অক্টোবর ঢাকা মহানগর বিএনপির যৌথ সমাবেশে মীর্জা ফখরুল ২৫ অক্টাবরের সমাবেশকে ‘ফাইনাল খেলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,‘এ খেলার সময় সাত দিন। এর মধ্যে সমস্ত প্রস্তুতি নিতে হবে। এ খেলায় জয়ের কোনো বিকল্প নেই। না হলে টিকে থাকা যাবে না। সামনে রাস্তা একটাই—দুর্বার গণআন্দোলন। দুর্বার গণআন্দোলন। এই সরকারের পতন।’ ওই খেলার প্রস্তুতি হিসেবে ওই সমাবেশে ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা নেতা-কর্মীদের ‘দা-কুড়াল’ নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘দুটি বিষয়ে প্রস্তুতি থাকতে হবে। এক. সমাবেশ সফল করা এবং দুই. আক্রমণের শিকার হলে দা-কুড়াল যা যা আছে সব নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে।...যে কোনো ভাবে তাদের মোকাবেলা করতে হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’ বিএনপি নেতৃবৃন্দের এই সহিংস প্রস্তুতির আহ্বান ও উসকানিমূলক বক্তব্যের বিপরীতে খালেদা জিয়ার ‘শান্তি চাই’ কিংবা আলাপ-আলোচনার পরিবেশের আকাঙ্ক্ষা খুবই সাংঘর্ষিক ও স্ববিরোধী। ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময়কালে খালেদা জিয়া সুস্পষ্টভাবে জানিয়েই দিলেন, হাসিনার অধীনে নির্বাচনে কোনো অবস্থাতেই অংশগ্রহণ নয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ গত পাঁচ বছরে শতবার জানিয়েছে, অনির্বাচিত সরকারের অধীনে আর নির্বাচন নয়। তাহলে আলোচনা হবেটা কী নিয়ে? বিএনপির ১৪ অক্টোবরের হুমকির পর আইন প্রতিমন্ত্রী যথারীতি আইন দেখিয়েছেন। সরকার ২৫ অক্টোবরের সমাবেশ ও তার পরবর্তী বিরোধী দলের সম্ভাব্য আন্দোলন দলগত ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলায় পালটা প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই দলের এইরূপ পারস্পরিক সাংঘর্ষিক ও মারমুখী অবস্থানে আলোচনার প্রস্তাব কি প্রহসন নয়? ক্ষমতায় থাকার জন্য ও ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যে সম্মুখ সমরে নেমেছে, এ যেন ‘কেহ নাহি কারে ছাড়ে সূচ্যগ্র মেদিনী’। এক্ষেত্রে দুদলের বাচনিক ও লোক দেখানো অবস্থান যা-ই হোক না কেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তো সেই পুরানো প্রবাদ : বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার। ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন