প্রিটোরিয়া থেকে ঢাকা; ভায়া নিউজিল্যান্ড!

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪০
একটা রহস্য দিয়ে শুরু করা যাক। নিউজিল্যান্ডের হয়ে নেইল ওয়াগনারের এই প্রথম বাংলাদেশে আসা। অথচ ক্রিকেট খেলতে এর আগেও ঢাকায় এসেছেন তিনি! কিভাবে সম্ভব? বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, কাল ইনিংসে ৫ উইকেট নেয়া ওয়াগনার এর আগে এই বাংলাদেশে ক্রিকেট খেলে গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকান পরিচয়ে! একটা সময় ভাগ্যান্বেষনে, কাজের খোঁজে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটতো দক্ষিণ আফ্রিকায়। দিন বদলেছে। সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়েক দশক ধরেই ক্রিকেটাররা পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ডে। তেমনই ভাগ্যের খোঁজে প্রিটোরিয়া থেকে নিউজিল্যান্ডে এসেছিলেন নেইল ওয়াগনার। এই ‘মাইগ্রেশন’ যে দারুণ সফল হয়েছে, তা অন্তত এবার দাবি করতে পারেন ওয়াগনার। গতকাল ক্যারিয়ারের নবম টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। আর এখানে পেয়ে গেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট। পাঁচ উইকেট কাদের হয়ে পেয়েছেন, সেটা বড় ব্যাপার নয়; অন্তত ওয়াগনারের কাছে। দিনশেষে টেস্টে এই যে প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট পেলেন, এটাই তার কাছে অনেক বড় একটা পাওনা, ‘এটা অসাধারণ ব্যাপার। এরকম পাওয়া খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করে। সব বোলারই উইকেট পাওয়ার জন্য কষ্ট করে। আমিও কষ্ট করেছি। ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেয়ে সেই কষ্টটা সার্থক বলে মনে হচ্ছে।’ বাংলাদেশের মাটিতে, বর্তমান বাস্তবতায় কোনো পেসারের পক্ষে জ্বলে ওঠা খুব কঠিন একটা কাজ। তারওপর নিউজিল্যান্ড এসেছে নিতান্ত অনভিজ্ঞ কয়েকজন পেসার নিয়ে। তারপরও বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসটা ধসিয়ে দিলেন চট্টগ্রাম টেস্টে দলেই সুযোগ না পাওয়া এই বাঁহাতি তরুণ। ১৯ ওভার বল করে ৬৪ রান দিয়ে একে একে তুলে নিলেন তামিম, মার্শাল, মুশফিক, সোহাগ ও রুবেলের উইকেট। এর মধ্যে তার নেয়া প্রথম ৪ উইকেটই আসলে ঠিক করে দিল বাংলাদেশের ইনিংসের ভাগ্য। এর মধ্যে সোহাগ গাজীর সঙ্গে ‘বচসা’ করে, দূরন্ত বাউন্স দিয়ে ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজের চরিত্রটাও বোঝানোর চেষ্টা করলেন ওয়াগনার। ম্যাচ শেষে সে প্রসঙ্গ উঠতে একটু হেসে বললেন, ‘সবারই তো প্লান থাকে। সেটা কাজে লাগানোই ব্যাপার। আমি এমন আগ্রাসী চরিত্র দেখাতেই পছন্দ করি। এটাই তো ফাস্ট বোলারের চরিত্র! আর গাজী আমাকে ছক্কা মারার পর শুধু বলেছিলাম, আরেকবার চেষ্টা করে দেখো। ও ঠিক সেই ফাঁদে পা দিয়েছে।’ কথাটা বলে যে হাসিটা হাসলেন তাতে বোঝা গেল, টেস্ট জীবনটা দারুণ উপভোগ করছেন ওয়াগনার। নেইল ওয়াগনারের টেস্ট অভিষেক হয়েছে গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অ্যান্টিগা টেস্টে। সেই থেকে এই ঢাকা টেস্টের আগ পর্যন্ত ৮ টেস্টে ২৪ উইকেট নিয়ে বেশ আলোচনায়ই ছিলেন তিনি। প্রিটোরিয়ায় জন্মানো এই বাঁহাতি পেসারের ক্রিকেটে হাতেখড়ি আফ্রিকান হাই স্কুল ফর বয়েসে। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকান অ্যাকাডেমির হয়ে এই বাংলাদেশ সফরেও এসেছেন; গেছেন জিম্বাবুয়ে সফরেও। এরপর সেঞ্চুরিয়ন টেস্টে দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে মাঠেও নেমেছিলেন! তখন ওয়াগনারের দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে টেস্ট খেলাটা সময়ের ব্যাপার ছিল। কিন্তু বেচারা ওয়াগনার; কপাল পুড়ল তার দক্ষিণ আফ্রিকার কোটা ব্যবস্থার ফলে! ওয়াগনার তখন পাড়ি জমালেন ইংল্যান্ডে। চেষ্টা করছিলেন ইংলিশ নাগরিকত্ব নেয়ার। সাসেক্সের সঙ্গে লম্বা চুক্তিও হয়ে যাচ্ছিল। তখনই কেউ একজন পরামর্শ দিলেন—নিউজিল্যান্ড যাও, ওখানে পেসারদের আকাল চলছে। ব্যাস! এই বাজিটা জিতে গেলেন ওয়াগনার। ওটাগোর হয়ে যে পারফরম্যান্স করলেন, তাতে নিউজিল্যান্ড অন্তত তাকে ফেরাতে পারল না। নিউজিল্যান্ড ফেরায়নি বলেই আজ ভিন্ন পরিচয়ে সেই নাসির, মুশফিকদের বিপক্ষে টেস্ট মাঠে নামতে পেরেছেন ওয়াগনার। সংবাদ সম্মেলনের বাইরে আলাপ করতে গিয়ে ওয়াগনার সে কথা মনে করে বুঝিয়ে দিলেন, অতীতটা ভোলেননি তিনি, ‘খুব ভালো করে মনে আছে। সেবার আমাদের এই নাসির-মুশফিকদের বিপক্ষেই খেলতে হয়েছিল। তবে সেবার ঢাকায় কোনো খেলা ছিল না।’ এটুকু বললেও দক্ষিণ আফ্রিকা জাতীয় দলের হয়ে খেলতে না পারা নিয়ে একটা শব্দও করলেন না। প্রশ্নটা যেন শুনতেই পেলেন না এমন করে এড়িয়ে গেলেন। এই এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেও কী অভিমান লুকানো রইল?