পিসির সুরক্ষা নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। কেবল একটি অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করেই নিস্তার মেলে না অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু বাড়তি কী ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, তা জানা নেই অনেকেরই। অথচ ইন্টারনেট থাকলে বিনামূল্যেই গড়ে তোলা যায় পিসির পূর্ণাঙ্গ সিকিউরিটি সল্যুশন। জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব
প্রযুক্তি যেমন সময়ের সাথে সাথে এগিয়েছে, তেমনি ডিজিটাল জীবনে নিরাপত্তা আর প্রতিরক্ষাও হয়ে উঠেছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে যারা পিসি ব্যবহার করে থাকেন, তাদের সকলেরই অন্যতম প্রধান মাথাব্যাথার কারণ হলো ভাইরাস। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন, তাদের নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একটু বেশিই। এ ছাড়া ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার, স্প্যাম, ফিশিং, স্ক্যাম প্রভৃতির আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে চলাটা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো একটি অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করছেন পিসির সুরক্ষায়। ভাইরাস ঠেকাতে সেটি সমর্থ হলেও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদানগুলো থেকে হয়তো সেটি পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। ফলে আপনার ডিজিটাল তথ্যগুলো যেমন হুমকির মুখে পড়তে পারে, তেমনি আপনার হার্ডওয়্যারের নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে না।
তাই সব ধরনের সাইবার আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ একটি সিকিউরিটি স্যুট। প্রিমিয়াম অনেক সল্যুশন এ ক্ষেত্রে আপনাকে সহায়তা করতে পারে; তবে তার জন্য খরচ করতে হবে বিস্তর অর্থ। বিনামূল্যের বিভিন্ন সফটওয়্যার স্যুট ব্যবহার করে এ ক্ষেত্রে আপনি নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন এমন একটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ সিকিউরিটি স্যুট। কীভাবে সেটি করবেন, সে সম্পর্কে জানানো হলো এই লেখায়।
১. ইন্সটল করুন অ্যান্টিভাইরাস
পিসির সুরক্ষায় সর্বপ্রথম আপনাকে যে কাজটি করতে হবে, তা হলো একটি ভালো অ্যান্টিভাইরাস ইন্সটল করা। বেশিরভাগ অ্যান্টিভাইরাসই টাকা দিয়ে কিনতে হলেও এর বিনামূল্যের সংস্করণও পাওয়া যায়। বিনামূল্যের সংস্করণগুলোয় প্রিমিয়াম সংস্করণের সব ফিচার না থাকলেও আপনি অন্যান্য যে সফটওয়্যার বা অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহার করবেন, তাতে সেই ঘাটতি পুষিয়ে যাবে। বিনামূল্যের অ্যান্টিভাইরাসের মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে তার মধ্যে রয়েছে নরটন, এভিজি, অ্যাভিরা, ম্যাকঅ্যাফি, ক্যাসরপারস্কি, ইসেট, পান্ডা প্রভৃতি। উইন্ডোজের নিজস্ব বিল্ট-ইন অ্যান্টিভাইরাস উইন্ডোজ ডিফেন্ডারও ব্যবহার করতে পারেন। তবে ভাইরাস থেকে সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। তাই ভালো একটি অ্যান্টিভাইরাসের বিনামূল্যের সংস্করণটি ইন্সটল করে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
২. সাথে রাখুন অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুল
ভালো একটি অ্যান্টিভাইরাসের সাথে সাথে আপনার পিসিতে নির্ভরযোগ্য একটি অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলও ইন্সটল করে নিন। এটি আপনার পিসিকে ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার, স্প্যাম, ফিশিং ঠৈকাতে বাড়তি সুবিধা প্রদান করবে। অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলস নির্বাচনে আপনার পছন্দের তালিকায় থাকতে পারে স্পাইট সার্চ অ্যান্ড ডেসট্রয়, ম্যালওয়্যার বাইটস অ্যান্টিম্যালওয়্যার, সুপার অ্যান্টিস্পাইওয়্যার, কম্পোফিক্স, হাইজ্যাক দিস প্রভৃতি। পিসিতে যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর উপাদানের আনাগোনা দেখলেই এগুলো তড়িত্ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম। অ্যান্টিভাইরাসের ব্যাকআপ হিসেবে এই অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলগুলো অত্যন্ত কার্যকরী।
৩. ফায়ারওয়াল ব্যবহার করুন
পিসির সুরক্ষায় তৃতীয় ধাপে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে শক্তিশালী একটি ফায়ারওয়াল। এর জন্য উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়ালের বাইরে বিনামূল্যের কয়েকটি শক্তিশালী ফায়ারওয়াল সার্ভিসের উপর নির্ভর করতে পারেন। একটি শক্তিশালী ফায়ারওয়াল হ্যাকারদের অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ থেকে আপনার পিসিকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখবে। উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়ালটি মূলতই ‘ইনবাউন্ড’ কার্যক্রমে বেশি কার্যকর। তাই অন্য একটি ফায়ারওয়াল ব্যবহার করাই সমীচীন। সে ক্ষেত্রে পিসিটুলস আউটপোস্ট ফায়ারওয়াল, জোন অ্যালার্ম ফায়ারওয়াল, কমোডো ফায়ারওয়াল, অনলাইন আর্মর ফ্রি ফায়ারওয়াল, অ্যাসাম্পু ফায়ারওয়াল কিংবা পিসি টুলস ফায়ারওয়াল প্লাসের মধ্য থেকে একটি ফায়ারওয়াল বেছে নিতে পারেন।
৪. ব্রাউজারেও রাখুন সুরক্ষা
ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়েই নানা ধরনের ওয়েব সাইটের মাধ্যমে আক্রমণ করা হয়ে থাকে পিসিতে। বিশ্বস্ত সব ওয়েবসাইটের বাইরে তাই অপরিচিত বা নতুন ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করার সময় প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। আপনার ওয়েব ব্রাউজারটিকে তাই এই কাজে সাজিয়ে নিতে হবে সুরক্ষার দেয়ালে। এমনিতে ওয়েব ব্রাউজার হিসেবে এ ক্ষেত্রে সবার চাইতে এগিয়ে রয়েছে গুগল ক্রোম। স্যান্ডবক্সিং ফিচারের মাধ্যমে এই ব্রাউজারটি অবিশ্বস্ত অনেক সাইটকেই আটকে দিতে সক্ষম। তবে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ওয়েব অব ট্রাস্ট বা ম্যাকঅ্যাফি সাইট অ্যঅডভাইজারের মতো ব্রাউজার প্লাগ-ইন্স বা এক্সটেনশন ব্যবহার করা আপনাকে নিশ্চিন্ত রাখতে পারে। এগুলো সন্দেহজনক ওয়েবসাইট কিংবা ওয়েবপেজকে প্রতিহত করতে সক্ষম।
৫. সফটওয়্যার আপডেট রাখুন
প্রতিটি সফটওয়্যারের হালনাগাদ সংস্করণগুলোতে সাধারণত আগের সংস্করণের চাইতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়ে থাকে। তাই আপনার পিসিতে ব্যবহূত প্রতিটি সফটওয়্যারেরই আপডেট সংস্করণটি থাকা ভালো। নতুন নতুন আপডেট আসলে সেগুলোও গ্রহণ করে নিতে হবে। তাই নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেটের দিকে নজর রাখুন। তবে প্রতিটি সফটওয়্যারের আপডেট চেক করাটা ঝামেলার লাগতে পারে। এই কাজটি তাই করতে দিতে পারেন সেকুনিয়া পার্সোনাল সফটওয়্যার ইন্সপেক্টর বা অন্য কোনো সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনকে। সেকুনিয়া নিজে থেকেই আপনার পিসিতে ইন্সটল করা প্রতিটি সফটওয়্যারের সর্বশেষ সংস্করণ খুঁজে নিয়ে আপডেট করে দিতে সক্ষম। তাই দেরি না করে সেকুনিয়াকেও স্থান দিন আপনার পছন্দে।
৬. পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের শরনাপন্ন হোন
অনলাইনে এখন শত শত অ্যাকাউন্ট মেইনটেইন করতে হয় আমাদের। ই-মেইল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের সুরক্ষায় ব্যবহার করতে হয় শক্তিশালী সব পাসওয়ার্ড। এত পাসওয়ার্ড মনে রাখাটা নেহায়েত কম ঝামেলার নয়। তাই শক্তিশালী একটি পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের শরনাপন্ন হয়ে সেই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে উইন্ডোজ প্ল্যাটফর্মে কিপাস, মাইপ্যাডলক, কিওয়ালেট, ওয়ানপাস, লাস্টপাস, ড্যাশলেন থেকে বেছে নিতে পারেন যেকোনো একটি। আবার পাসপ্যাক, মেলডিয়াম, মাইনওয়ান লগইন, ক্লিপারজ, মিট্রো’র মতো অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনেও রাখতে পারেন ভরসা। আপনার দেওয়া পাসওয়ার্ডগুলো যেমন এরা মনে রাখতে পারে, তেমনি আপনার প্রয়োজনে শক্তিশালী সব পাসওয়ার্ড তৈরিতেও এদের জুড়ি নেই।
৭. সুরক্ষিত থাক সোশ্যাল নেটওয়ার্ক
ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস ছাড়া এখন একটি দিনও চলে না। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের এসব সাইট থেকেও হতে পারে আক্রমণ। সে কারণে এসব সাইট থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিটডিফেন্ডার সেফগো অ্যাপ্লিকেশনটি হতে পারে আপনার সহায়। আবার স্টপ দ্য হ্যাকারের তৈরি মাইপেজ কিপার, অ্যাভিরার সোশ্যালশিল্ড কিংবা মনিটর মনিটর অ্যাপ্লিকেশনগুলোও আপনার সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সমর্থ হবে।
আরও যা লাগবে
পিসির নিরাপত্তায় ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, সেজন্য একটি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যারও ব্যবহার করতে পারেন। উইন্ডোজ অ্যাসেনশিয়াল সফটওয়্যার প্যাকেজে আপনি পাবেন মাইক্রোসফট ফ্যামিলি সেফটি ওয়েবসাইট। এর বাইরেও বেশকিছু প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার পাওয়া যায়।
ল্যাপটপের সুরক্ষার ক্ষেত্রে অবশ্য চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে ‘প্রে’ নামের সফটওয়্যারটি দিয়ে দূর থেকেও মনিটর করতে পারবেন ল্যাপটপ। আবার এনক্রিপশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে আপনার ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক এনক্রিপ্ট করেও তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। এভাবেই বিনামূল্যের সব সফটওয়্যার দিয়েই পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা দিতে পারবেন পিসিকে।
