আগামী নির্বাচন লইয়া যথার্থ সমঝোতা সকলের কাম্য, কিন্তু তাহার ব্যত্যয় ঘটিলে আসিতে পারে লাগাতার হরতাল কর্মসূচি। ইহাতে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইবে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং আমাদের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। কেননা, শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী দশম শ্রেণী পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর বার্ষিক পরীক্ষার সময়কাল এই নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস। আগামী ২০ নভেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে দেশের প্রায় ৩০ লাখ কোমলমতি শিক্ষার্থী তাহাদের জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো পাবলিক পরীক্ষায় অংশ লইবে। ইহার পূর্বে ৪ নভেম্বর শুরু হইবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা। তাহা ছাড়া ১ নভেম্বর হইতে সারা দেশে শুরু হইবে স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষা। অর্থাত্ সকল কিছু মিলিয়া রাজনৈতিক সমঝোতা যদি অধরা থাকিয়া যায়, তবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ললাট লিখন হইবে ভোগান্তির নাকানি চুবানি।
ইহা যে অভিপ্রেত নহে, তাহা আমরা বারংবার বলিয়াছি, বলিতেছি। রাজনীতির নিরন্তর চলমান চড়াই উত্রাই পথে আন্দোলন ও হরতাল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেন আসিবে না, তাহার উত্তরে আমরা অতি সরলীকৃত একপেশে দোষারোপ উচ্চারণ করিতে পারি না। বিবিধ কারণে বিভিন্ন সময় আমরা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীলতার চূড়ান্তে পৌঁছাইতে দেখিয়াছি। আন্দোলনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে আসিয়াছে হরতাল। কিন্তু প্রশ্ন হইল তাহার ‘সহিংস-রূপ’ লইয়া। খেটে খাওয়া মানুষের কর্ম থাকিবে কর্মের জায়গায়, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থাকিবে পরীক্ষার জায়গায় এবং আন্দোলন থাকিবে যথারীতি আন্দোলনের জায়গায়। ইতিহাসে অহিংস আন্দোলনের উদাহরণও নগণ্য নহে। বরং বলা যায় অহিংস আন্দোলনকেই বেশির ভাগ সময় সহিংসতার বিপরীতে তড়িত্ কার্যকর ও ফলপ্রসূ হিসাবে দেখা গিয়াছে। মূলত বাম ও উগ্রধারার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে সহিংসতার প্ররোচনা, প্রয়োগ ও অভ্যাস সূচিত হইয়াছে। সূচিত ও প্রোথিত সেই বিষবৃক্ষ আজ সারাদেশে ছড়াইয়া দিয়াছে তাহার বিষাক্ত বীজ।
গণতন্ত্রের অন্যতম সৌন্দর্য হইল ভিন্ন মতাদর্শের প্রয়োগ, প্রসার ও অবদমন-রোধ। ভিন্ন মত-ভাবনার আন্দোলন এবং হরতাল সেই সৌন্দর্যেরই অংশ। অর্থাত্—‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’। কিন্তু তাহাকে নেতিবাচক করিয়া তুলিতে, আন্দোলনকে দমন করিতে কিংবা তাহাকে সহিংস করিয়া তুলিতে দায়ী ওই উগ্রধারার মানসিকতাই। এই বত্সর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়ও হরতালের কারণে বারংবার বিড়ম্বনায় পড়িয়াছেন পরীক্ষার্থীরা। যতগুলি বিষয়ের পরীক্ষা অংশ লইতে হইবে তাহার প্রায় অর্ধসংখ্যক পরীক্ষা পিছাইয়াছে ওই সময়ের হরতালের কারণে। অথচ হরতালের জ্বালাও-পোড়াও জাতীয় বিধ্বংসী রূপ না থাকিলে এই সকল অতি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পিছাইয়া দেওয়ার প্রয়োজন হইত না।
দুর্ভোগ মানুষকে অস্থির-অসহিষ্ণু ও হতাশ করিয়া তোলে। যাহারা ভবিষ্যতে দেশের হাল ধরিবেন, তাহাদের এই দুর্ভোগ জাতির ভবিষ্যতের জন্য ভালো কথা নহে। সকল রাজনৈতিক দলই শিক্ষার প্রসার ও গুণমান বৃদ্ধিতে উত্সাহী থাকেন। সুতরাং শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, এইরূপ পদক্ষেপ সকলের জন্যই অনভিপ্রেত। আমরা এইরূপও দেখিয়াছি, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে একসময় আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রাত তিনটায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হইয়াছিল। যাহাদের কার্যকারণে আন্দোলন হয়, এবং যাহারা আন্দোলন করেন—তাহারা যদি ইহাকে শান্তিপূর্ণ রাখিতে পারিতেন তবে তাহা এই জাতির জন্যই সবচেয়ে মঙ্গলজনক হইত। আন্দোলনে বাধ্য করা কিংবা তাহাকে সহিংস করিয়া তোলা স্বপদে কুঠার নিক্ষেপতুল্য। জাতি হিসাবে আমাদের আরও প্রাজ্ঞ হওয়া দরকার।
