বাংলার সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কৃষি, যোগাযোগ, ইতিহাস ঐতিহ্য নদীকেন্দ্রিক। একই সাথে শিল্প, সাহিত্য, ধর্ম, গ্রাম, নগর, বন্দর, মানববসতি, ভূ-ভাগ ধারাসৃষ্টি, আবর্তন, উন্নয়ন নদীতীরবর্তী। ব-দ্বীপ আকৃতির এ ভূখণ্ডে ছোট বড় ২৩০ নদ-নদী প্রবাহমান। কোন এক সময়ে যাত্রীবাহী নৌকা ভ্রমণ, পরিবহন তত্পরতায় জলমহলের রূপ ছিল এই বাংলায়। নৌপথ ছিল ২৫ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। খাল, বিল, নদীনালা পরিবহন যোগ্য জলাভূমি ছিল চার হাজার। প্রবাহমান নদীপথের দাপট বাংলাকে গৌরবান্বিত করেছিল। সওদাগরি নৌকা আর ভাসমান ভেলার খেলা চলে এমন নদীপথ বর্তমানে ভরা বর্ষা মৌসুমে ৫ হাজার ৯৬৮ কিলোমিটার। গ্রীষ্ম মৌসুমে অনিবার্যভাবে তা ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি নয়। অর্থসাশ্রয়ী বিকল্প পথ যতই সৃষ্টি প্রক্রিয়া সমুন্নত করা হয়েছে নদীপথের গ্রহণযোগ্যতা তত বৃদ্ধি পেয়েছে। নিরাপদ বাহন হিসাবে নদীপথের সুবিধা ব্যবস্থা আজ প্রশ্নাতীত হয়ে উঠেছে।
চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ বলে খ্যাত লুসাই কন্যা কর্ণফুলী নদী অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এ নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রাখায় এর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতুর পশ্চিম ও পূর্ব পাশে জেগে ওঠা চর এবং তীর দখল করে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে প্রায় কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। এতে নদীর নাব্যতা কমে গিয়ে হুমকির মুখে পড়তে পারে চট্টগ্রাম বন্দর এমনটি সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। সরকারি জায়গা দখল করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা একের পর এক অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে আসছে। আদালতের নির্দেশ ও প্রশাসনের একাধিকবার উদ্যোগের পরও প্রভাবশালীমহলের চাপের কারণে এ অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
পরিবেশবিদরা জানান, দখলের কারণে কর্ণফুলী নদী ভয়াবহ দূষণের কবলে পড়েছে। প্রতিদিন ৭৩০ টি কারখানা, ১৫০ টি বড় আকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান, ১৯ টি ট্যানারি, ২৬ টি টেক্সটাইল মিল, ২টি রাসায়নিক কারখানা, ৫টি মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ৫টি সাবান কারখানা, ২টি তেল শোধানাগার, সিইউএফএল, কাফকো ও চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের ৭৬০ মেট্রিকটন বিষাক্ত বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ছে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে চলাচলরত ১ হাজার ২০০ ছোট জাহাজ, ৬০-৭০ টি তেলের ট্যাংকার, সাড়ে ৩ হাজার ইঞ্জিন চালিত নৌকার বর্জ্যতো প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীতে নিঃসরণ হচ্ছে। ফলে কর্ণফুলীর ২০ প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে জানালেন পরিবেশবিদরা।
নদীর দুই পাড়ে বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই স্থাপিত শিল্প কারখানা থেকে প্রতিনিয়ত বর্জ্য নিঃসরণ ও নগরবাসীর নিঃসরিত ময়লা-আবর্জনায় দূষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দূষণের ভয়াবহতায় নদীর হ্রাস এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় চট্টগ্রামের প্রাণপ্রবাহ বলে খ্যাত কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষ করে ভূমি দস্যুদের কালো থাবায় ছোট হয়ে আসছে লুসাই কন্যা কর্ণফুলীর আয়তন। অব্যাহত দখল আর দূষণের কারণে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে । রাঙ্গুনিয়ার কাপ্তাই থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত দীর্ঘ নদী পথের দু’তীরের ভূমি ও চর দখল হচ্ছে প্রকাশ্য ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে। রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা, কদমতলী, শিলক, কোদলা, সরফভাটা মরিয়ম নগর, পারুয়া, বোয়ালখালীর কালুরঘাট, চরণদ্বীপ, খরনদ্বীপ, কদুরখিল, পশ্চিম গোমদন্ডী আমুচিয়া, পশ্চিম পটিয়ার শিকলবাহা, কালারপুল, ডাঙ্গার চর, খোয়াজ নগর চরপাথরঘাটা, ইছানগর, নগরীর মোহরা, কালুরঘাট পশ্চিম, বাংলাবাজার, জলিল গঞ্জ, ফিরিঙ্গী বাজার ও ব্রীজঘাট এলাকায় কর্ণফুলী দখল হয়েছে সবচেয়ে বেশী। নদীর দু’তীর ভরাট করে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও ভূমি দস্যু এ দখল প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের কর্মকর্তারা বলেছেন, তীর ঘেঁষে স্থাপনা তৈরি করা হলে নদীর স্বকীয়তা নষ্ট হয়। নদী নাব্যতা হারায় এবং স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হয়। নদীর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দরের এবং নদীর দখল রোধ করা ও উচ্ছেদ করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের এবং অবৈধ স্থাপনার বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সিডিএ’র। তাদের মতে, কর্ণফুলী নদীর তীর দখল মুক্ত হলে নদী রক্ষা পাবে। এসব সেক্টরের কর্মকর্তারা বলেছেন, নদীর উপর অত্যাচার ও দখলের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর মত মরে যেতে পারে কর্ণফুলীও। আর তা থেকে মুক্তি পেতে কর্ণফুলীকে দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে এখনই এবং সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রতিবছর ২ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব জলাভূমি দিবস’ ও ১৪ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস’ পালন করা হয়। সরকারের সাথে বেসরকারিভাবেও কিছু পরিবেশবাদী সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে বিচ্ছিন্নভাবে সচেতন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিল্পমন্ত্রণালয় থেকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় আলাদা করে নদীপথকে পরিবেশ সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। নৌ-মন্ত্রণালয়তো তার নির্ধারিত ক্ষেপণাস্ত্রের ক্রমান্বয় কল্পনা গ্রহণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। যার ফলে দখল দূষণ সংকট ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। মানুষ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে এ নদীকে দূষণমুক্ত করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর মিল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পরিশোধন পূর্বক নদীতে ফেলা এখন সময়ের দাবি। মূল কথা নদী দখলের অপচেষ্টার হীনস্বার্থ চরিতার্থ রোধ সামাজিকভাবে না করা পর্যন্ত এ নদীর অপমৃত্যু বন্ধ করা যাবে না।
লেখক :গবেষক
