নতুন চেহারায় পুরোনো তামিম

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৩
হঠাত্ মেজাজ হারিয়ে ফেলার অভিযোগ তার বিপক্ষে আগেও শোনা গেছে। কতো জনেই তো কতো কথা বলে—তামিম এমন, তামিম তেমন; কিন্তু প্রকাশ্যে তামিম ইকবাল কখনো এরকম চটে উঠেছেন, এমনটা কেউ দেখেননি। কাল চটে উঠলেন। একবার নয়, তিনবার। সংবাদ সম্মেলনে মেজাজ হারিয়ে ফেলার এক পর্যায়ে ছলছল করে উঠলো তার চোখ! অবিস্মরণীয় ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দেয়া ইনিংস খেলে আসার পরও তামিম ইকবাল কেন এমন বেসামাল হয়ে গেলেন? কারণ, সেঞ্চুরি না পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল তামিম ইকবালকে! তিন বছর, ২৩ ইনিংস ধরে সেঞ্চুরি না পেলে যে কোনো ব্যাটসম্যান অধৈর্য হয়ে উঠতে পারেন। তামিমের ক্ষেত্রে যন্ত্রণাটা আরো বেশি; কারণ এই সময়ে বারবার তাকে ফিরে আসতে হয়েছে সেঞ্চুরির দুয়ার থেকে। এই টেস্টেই দুই দুইবার সেঞ্চুরি দেখতে পাচ্ছিলেন; কিন্তু হাতে পেলেন না! অবশ্য তামিম বললেন, এই দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি নিয়ে তিনি আদৌ ভাবছিলেন না, ‘দ্বিতীয় ইনিংসে একবারও সেঞ্চুরি, মাইল স্টোন, নিজের রান নিয়ে চিন্তা মাথায় আসতে দেইনি। হ্যাঁ, প্রথম ইনিংসে ৫ রানের জন্য সেঞ্চুরিটা মিস করে খুব আপসেট হয়েছিলাম। আর এই ‘আপসেট’ হওয়া থেকেই হয়ে গেল বিস্ফোরণ। সেঞ্চুরি না পাওয়া নিয়ে হতাশ কি না, এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে তিনটি প্রশ্নের জবাবে উত্তেজিত স্বরে একটা কথাই বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ‘দেখা হলেই সেঞ্চুরির কথা, রোজ সেঞ্চুরির কথা; এটা ঠিক না। ক্রিকেট খুবই মেন্টাল একটা গেম। আপনাদের ভাবা দরকার, এসব কথাবার্তা আমার খেলাটা আরো কঠিন করে দিচ্ছে। আমি অনুরোধ করব, প্লিজ আমাকে আমার খেলাটা খেলতে দিন।’ এই প্রসঙ্গটা বাদ দিলে কাল তামিমের সংবাদ সম্মেলনটা তার হাশিখুশি ও তৃপ্তিতে ভরা একটা পর্ব ছিল। ম্যাচের তৃতীয় দিনের হতাশা কাটিয়ে দারুণভাবে ফিরে এসেছে বাংলাদেশ। একেবারে বিপরীত চরিত্রে ব্যাট করে তামিম ইকবালই সেই ম্যাচে ফেরানো ব্যাটিংয়ে কান্ডারি হিসেবে খেলেছেন প্রায় তিন সেশন ধরে। ফলে তামিমের এটা খুশি হওয়ারই দিন। দলের সেই খুশিটা মোটেও লুকালেন না তামিম। পরিষ্কার ব্যাখ্যা করে বললেন, গতকাল অন্তত যে অবস্থায় খেলা শেষ হয়েছে, তাতে নিজের দলকে সামান্য হলেও এগিয়ে রাখছেন তিনি, ‘যখন আমরা আজকের খেলা শুরু করি, ব্যাকফুটেই ছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, যত কম উইকেট হারিয়ে যত বেশিক্ষণ সম্ভব ব্যাটিং করা। পরিকল্পনা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলবো না। পরিকল্পনাটা কাজে লেগেছে বলতে হবে। ৩ উইকেট হারিয়ে একশ রানের লিড নিয়েছি। কাল যদি ৪০/৪৫ ওভার এই জুটি ব্যাটিং করে তারপর নাসির মুশফিক এদের সবাইর কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি রান করার সামর্থ্য আছে। তখন কিন্তু যে কোনো কিছুই হতে পারে। দশ উইকেট নিতে কিন্তু দশটি বলই লাগে। আজকের দিনে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ এগিয়েই আছে বলবো।’ দলকে এগিয়ে দিতে গিয়ে মাঠের মাঝে কী পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটা তামিম ইকবালই বোঝেন। যে খেলোয়াড়টি শট খেলতে পছন্দ করেন, তাকে প্রতিজ্ঞা করে শট কমিয়ে খেলতে হয়েছে। দিনশেষে নিজে উইকেটে না থাকতে পারার আফসোস আছে; একই সঙ্গে আছে তৃপ্তিও, ‘আমি যদি পুরো দিনটা শেষ করে আসতে পারতাম, তাহলে হয়তো আমার পুরো কতর্ব্য পালন করা হতো; সেটা পারিনি। তবে আমি মনে করি- যতটুকু পেরেছি, দলের জন্য কিছু কাজ হয়েছে। দল এটাই আমার কাছে আশা করেছিল। আমি দলের কথা ভেবেই ব্যাটিং করেছি। নিজের ইনিংস নিয়ে আগেও বলেছি- এই ইনিংসে আমি নিজের জন্য একবারও চিন্তা করি নাই। আপনারাও জানেন, আমি যখন ৪০-৪৫ রানে থাকি স্পিনাররা বোলিংয়ে এলে, আমি সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করি। মাইল স্টোনে পৌঁছার চেষ্টা করি। ৯০-এ থাকলে চান্স নেয়ার চেষ্টা করি। আজ কিন্তু তেমন কিছু করিনি। আমাকে দলের প্রয়োজন ছিল, আর আমি তা করেছি।’ এই যে দলের প্রয়োজনে বদলে যাওয়া; এটা তামিমের মতো মারকুটে একটা ব্যাটসম্যানের জন্য কতোটা কঠিন, তা বাইরে থেকে অনুমান করা যায়। তামিম নিজেও বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘খুবই কঠিন এভাবে বদলানোটা। আমি স্ট্রোক খেলতে পছন্দ করি। একটা সময় ওদের অফস্পিনার বল করছিল; ডিপমিডউইকেট ছিল না। এই সময় চালিয়ে দেয়াটা আমার খুব প্রিয় একটা শট। ওটাও আমি কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছি। তবে আমার মনে হয়, এই যে অন্যরকম খেলা, এটা থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। প্রত্যেকটা ইনিংস থেকে আপনি কিছু না কিছু শেখার শিখতে পারবেন। টেস্ট ক্রিকেটে এমন সব পরিস্থিতি আসে যখন আপনি নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারবেন না। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংটা করতে হবে। সেটাই শেখার চেষ্টা করছি।’ আর একবার সেটা পুরোপুরি পেরে গেলেই তো অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে চলা শুরু হয়ে যাবে একজন ব্যাটসম্যানের। তামিমও নিশ্চয়ই সেই ‘গ্রেটনেসের’ স্বপ্ন দেখেন! স্কো র কা র্ড বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ২৮২ (তামিম ৯৫; নেইল ওয়াগনার ৫/৬৪, সোধি ৩/৫৯)। নিউজিল্যান্ড ১ম ইনিংস : গত দিনের ৪১৯/৮ রান বল চার ছয় ফুলটন এলবিডব্লিউ ব সাকিব ১৪ ৪৩ ২ ০ রাদারফোর্ড ক মমিনুল ব সাকিব ১৩ ৪২ ১ ০ উইলিয়ামসন ক তামিম ব রাজ্জাক ৬২ ৫১ ০৬ ০ টেলর ক নাসির ব সাকিব ৫৩ ৭৯ ০৫ ০ ম্যাককালাম ক রুবেল ব সাকিব ১১ ১৭ ২ ০ অ্যান্ডারসন ক সোহাগ ব আল আমিন ১১৬ ১৭৩ ১৩ ২ ওয়াটলিং অপরাজিত ৭০ ১৭৯ ০৪ ০ ব্রেসওয়েল ক মুশফিক ব সাকিব ১৭ ৪৫ ২ ০ ওয়াগনার ক মার্শাল ব ব নাসির ৮ ২৬ ১ ০ ইশ সোধি রান আউট (মমিনুল) ৫৮ ৬৭ ০৭ ০ ট্রেন্ট বোল্ট এলবিডব্লিউ ব রাজ্জাক ৪ ১১ ০০ ০ অতিরিক্ত (বাই ৪, লেগবাই ৪, ওয়াইড ২, নোবল ১) ১১ মোট (১৪০ ওভারে, অল আউট) ৪৩৭ বোলিং: আল-আমিন ১৬-৩-৫৮-১, সোহাগ গাজী ৩৪-৮-৭৭-০, সাকিব ৪৩-১৩-১০৩-৫, রাজ্জাক ২৩-১-৯৭-২, রুবেল ১৮-১-৮১-০, নাসির ৩-১-৭-১, মমিনুল ৩-০-৭-০। বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: রান বল চার ছয় তামিম ক টেলর ব উইলিয়ামসন ৭০ ২১৮ ০৪ ০ এনামুল ক ফুলটন ব ওয়াগনার ২২ ২৬ ০৪ ০ মার্শাল ক টেলর ব ওয়াগনার ৯ ১৩ ০২ ০ মমিনুল অপরাজিত ১২৬ ২২৫ ১৬ ০ সাকিব অপরাজিত ৩২ ৫৩ ০৫ ০ অতিরিক্ত (বা ৮, লেবা ১, নো ১) ১০ মোট ( ৮৯ ওভারে, তিন উইকেটে) ২৬৯ বোলিং: ট্রেন্ট বোল্ট ১৬-২-৬২-০, ডগ ব্রেসওয়েল ১৪-২-৪৭-০, নেইল ওয়াগনার ১৮-৪-৫২-২, ইশ সোধি ১৪-২-৩৭-০, কোরি অ্যান্ডারসন ৯-২-১৮-০, কেন উইলিয়ামসন ১৮-৪-৪৪-১।