উপকূলীয় অঞ্চলে শিশুদের অপুষ্টির উদ্বেগজনক হার

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫০
দারিদ্র্য ও অপুষ্টি আমাদের দীর্ঘদিনের সঙ্গী। আর শিশুরাই যে ইহার করুণতম শিকার তাহাও অবিদিত নহে। বিগত দুই দশকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য সত্ত্বেও পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগের সীমা অতিক্রম করে নাই। এখনও প্রায় ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রহিয়া গিয়াছে। পাশাপাশি, পাঁচ বত্সরের কম বয়সী শিশুদের অপুষ্টির হার ৪১ শতাংশ— বিশ্ব পরিসরে যাহা অন্যতম সর্বোচ্চ হার হিসাবে বিবেচিত। ইহাতে নূতন মাত্রা যোগ করিয়াছে অঞ্চলভেদে অপুষ্টির তারতম্য। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গিয়াছে যে উপকূলীয় ১৪টি জেলায় শিশুদের অপুষ্টির হার সব চাইতে বেশি। জেলাগুলি হইল— বাগেরহাট, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ঝালকাঠি, নোয়াখালী, খুলনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা। এই সকল জেলায় পাঁচ বত্সরের কমবয়সী ৩৪ শতাংশ শিশুর ওজন বয়সের তুলনায় কম। আর ৭ শতাংশের ওজন উদ্বেগজনকভাবে কম। উপকূলীয় জেলাসমূহ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, পদ্মানদীর চর, উত্তরাঞ্চলের চর এবং উত্তর-পশ্চিমের ৬টি অঞ্চল হইতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল সম্প্রতি এই তথ্য প্রকাশ করিয়াছে। দারিদ্র্যের সাথে অপুষ্টির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য হইলেও দারিদ্র্যই যে অপুষ্টির একমাত্র কারণ নহে, তাহা লইয়া দ্বিমত নাই। বরং এই ক্ষেত্রে অজ্ঞতা, অসচেতনতা এবং সরকারি সেবা ও সম্পদের অসম বন্টনের অবদানই যে মুখ্য তাহা অনস্বীকার্যই বলা চলে। পাঁচ বত্সরের কম বয়সী শিশুদের ওপর অপুষ্টির প্রভাব ভয়াবহ শুধু নহে, বহুমাত্রিকও বটে। পুষ্টির অভাবে শিশুদের ওজন ও উচ্চতা দুইটিই হ্রাস পায় উদ্বেগজনকভাবে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক চিকিত্সা ও বিজ্ঞানবিষয়ক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ‘কারগার’-এর সামপ্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে বাংলাদেশে ২০১০ সালে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা ছিল ৪৩.২ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে গর্ভকালীন সময় হইতে জন্মের প্রথম দুই বত্সর অপুষ্টির শিকার হইলে শিশুরা খর্বাকার হয়। তাহাদের ওজন কমিয়া যায়। ব্যাহত হয় শারীরিক, বুদ্ধিভিত্তিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনা। এই ধরনের শিশুরা লেখাপড়া ও বুদ্ধিভিত্তিক কাজে যেমন পিছাইয়া পড়ে, তেমনি তাহাদের রোগাক্রান্ত হওয়ার এবং মৃত্যুর হারও অধিক। লক্ষণীয় যে অপুষ্টির কারণে প্রথম দুই বত্সরে শিশুর যেই ক্ষতি হইয়া যায়, সারাজীবনেও তাহা শোধরানো সম্ভব হয় না। অথচ একটু সচেতন হইলেই ইহা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়। এই ক্ষেত্রে প্রথম কর্তব্য হইল, গর্ভবতী এবং শিশুদের দুধ খাওয়ায় এমন মায়েদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা। একই সাথে দুই বত্সর বয়স পর্যন্ত শিশুদের মায়ের দুধের পাশাপাশি সম্পূরক খাবারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ব্যক্তির স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ৪০ ধরনের নিউট্রিয়েন্ট বা অণুপুষ্টির প্রয়োজন। শুধু বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমেই এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তন্মধ্যে রহিয়াছে মাতৃদুগ্ধ, উদ্ভিদজাত খাদ্য ও প্রাণীজাত খাদ্য। আশার কথা হইল, পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য ব্যয়বহুল খাদ্য অপরিহার্য নহে। মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি কমদামি সুলভ শাকসবজি, ফলমূল এবং ছোটমাছও ইহার ভালো উত্স হইতে পারে। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা। পাশাপাশি, সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য হ্রাসের দিকেও বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার। অপুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অপরিহার্য। কারণ সমস্যাটি পুরনো শুধু নয়ে, অত্যন্ত জটিলও বটে। আইসিডিডিআরবি মনে করে, অপুষ্টি সমস্যার একক কোনো সমাধান নাই। তবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিকে তাহারা অপুষ্টি দূরীকরণের পূর্বশর্ত বলিয়া বিবেচনা করে। শিশুর অপুষ্টিজনিত সমস্যার মোকাবিলায় কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। ইহার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও আছে—যাহা বিশ্বব্যাপী অনুসৃত হইতেছে। আমাদের নিজস্ব গাইডলাইনও আছে। আছে জাতীয়ভিত্তিক নানা উদ্যোগ-আয়োজনও। তাহা সত্ত্বেও আমাদের দেশে পুষ্টি বিষয়ক সেবা ও কার্যক্রমের অধিকতর উন্নয়নে অব্যাহত গবেষণার কোনো বিকল্প নাই। আমাদের সম্পদ সীমিত। অতএব, তাহার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের বিষয়টিও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে।