এই দুঃখী বাংলাদেশে যারা অনির্বাণ আলোর শিখার মতো জ্বলেছেন, আঁধার দূর করার জন্য সংগ্রাম করে পথ তৈরি করেছেন দেশের বিশিষ্ট সমাজকর্মী, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, প্রথম নারী লাইব্রেরিয়ান নার্গিস জাফর তাদের অন্যতম। তিনি দেশের বিখ্যাত কবি ও ‘সমকাল’ সম্পাদক সিকান্দর আবু জাফরের স্ত্রী। দেখতে ছোটখাটো সৌম্য স্বভাবের এই মানুষটির মধ্যেও যে রয়েছে বিশাল একটি হূদয়, অমিত তেজ তা তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে না মিশলে জানা যেতো না। নিজেকে তিনি কবি সুফিয়া কামালের প্রিয় বউমা হিসেবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতেন। কবির সাহচর্য, তার প্রতি আস্থা, ভালবাসা তার জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। আমরা দেখেছি, তাকে কবির সকল সংকটে, আনন্দ-বেদনায় পথ চলায় পাশে থাকতে। গভীর আস্থা থাকায় কবি সঙ্গী হিসেবে তাকে খুব পছন্দ করতেন। দেশে এবং দেশের বাইরে তিনি অনেকবার তার সফরসঙ্গী হয়েছেন। নার্গিস জাফর বলতেন, কবি আমার পরম বন্ধু এবং আমি তাকে আমার জীবনে শ্রদ্ধায়-সম্মানে মায়ের স্থান দিয়েছি। মহিলা পরিষদ এবং ‘অনন্যা’ পত্রিকার দায়িত্বে থাকার সুবাদে আমি তার সাথে মিশে মুগ্ধ হয়েছি। ওপর থেকে দেখে বোঝাই যেত না তার ভেতরের শক্তি কত তীব্র।
তার কাজের শুরু ইউনাইটেড স্টেট্স ইনফরমেশন সার্ভিস (ইউসিস) লাইব্রেরীতে। এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কিভাবে এ পেশায় এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘লাইব্রেরী সায়েন্সে আমার কোন পড়াশুনা ছিল না। কলকাতায় কলেজে পড়াশোনার সময়ে আমার বিয়ে হয়। স্বামীর সাথে চলে আসি ঢাকায়। তখন কলকাতার তুলনায় ঢাকার সামাজিক অবস্থা অনেক রক্ষণশীল ছিল। আমরা থাকতাম ঢাকার হাটখোলায় আর সেখানেই ছিল ইউসিস অফিস। আমি একদিন সেই অফিসে গিয়েছিলাম। হঠাত্ ওদের কাছ থেকেই চাকরির অফার পেলাম। ওরা আমার দ্বিধা দেখে সব শিখিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আমি সাহস পেলাম। সেই থেকে শুরু।’ অর্থাত্ ১৯৫৩ সাল থেকে। নার্গিস জাফর ২০ বছর দক্ষতার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
সারা দেশে তখন খুব কম সংখ্যক মেয়েই চাকরি করতেন। ইউসিস লাইব্রেরী রাত অবধি খোলা থাকলেও মিসেস জাফর সময় দিতে কখনো দ্বিধা করেননি। তার এই মুক্ত, আধুনিক মানসিকতার জন্য সেই সময়ে তাকে অনেকেই খ্রিস্টান বলে ভুল করতো।
এশিয়া ফাউন্ডেশনে ডিরেক্টর বুকস হিসেবে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বামীর উত্সাহ এবং সহযোগিতা তিনি সব সময় পেয়েছেন।
কবি সুফিয়া কামালের সাথে তার প্রথম পরিচয় ১৯৫১ সালে। তখন কবি রেডিও-র মহিলা মহল পরিচালনা করতেন। নার্গিস জাফরের স্বামী সিকান্দার আবু জাফর তখন রেডিওতে চাকরি করতেন। তিনিই কবির সাথে তার আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। কবিকে সালাম করতেই তিনি নার্গিস জাফরকে বৌমা সম্বোধন করেছিলেন। সেই থেকেই একমাত্র বৌমা হিসেবে তার জীবনের সাথে ওতপ্রোতোভাবে জড়িয়ে গেলেন।
এই পরিচয় আরো ঘনিষ্ঠ হয় ১৯৫৪ সালের বন্যার সময়। সেই সময়ে কবির নেতৃত্বে তিনিও ওয়ারী মহিলা সমিতির পক্ষে অন্যদের সাথে ত্রাণ কাজের জন্য চাঁদা তুলে বিলি করেছিলেন। সেই থেকে তিনি জনকল্যাণের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করলেন। কবিই তাকে শেখালেন কিভাবে অসহায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে নভেম্বর মাসে নার্গিস জাফর ও বাসন্তী গুহঠাকুরতা ঐ হোস্টেলে থাকতেন। এদিক থেকে বিবেচনা করলে তারাই এই হোস্টেলের প্রথম বসবাসকারী সদস্য।
নার্গিস জাফর মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত প্রথমে কোষাধ্যক্ষ ও পরে সহ-সভানেত্রী হিসেবে মহিলা পরিষদের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার এসব ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তাকে অনন্যা পত্রিকার পক্ষ থেকে অনন্যা সম্মাননা পদকও প্রদান করা হয়েছিল। দেশ ও জাতির যে কোন সংকটে, প্রতিবাদে, লড়াইয়ে তিনি অগ্রণী ছিলেন। বয়সের ভার কিংবা অসুস্থতার যন্ত্রণা তাকে কাবু করতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে বহু মিছিলে সামিল হয়েছেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা ও প্রণতি জানাই।
লেখক :সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী
