যে সৌরভ ছড়িয়ে গেল

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৩, ২০:৪৬
মায়াভরা চোখদুটোর নিচে কালো দাগ, মুখের নিষ্পাপ হাসিটা যেন একটু ম্লান। চিত্রগ্রাহকদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে নানা ভঙ্গিতে হেসে ছবি তোলার সুযোগ করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেও শরীর ঠিকই সত্যিটা বলে দিচ্ছিল। চোখ মুখ পরিষ্কার প্রকাশ করে দিচ্ছিল দুই টেস্ট মিলিয়ে ঘণ্টা পঞ্চাশেকের যে খেলা হল তার ৪০ ঘণ্টার মতোই মাঠে কাটিয়ে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মোমিনুল হক। ম্যানেজমেন্টের তাড়ায় অল্প কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েই ছুটতে হল। কিন্তু ফোনে ঠিকই স্বীকার করে নিলেন, ‘আসলেই খুব ক্লান্ত লাগছিল। আজ বরং শরীরটা একটু ভালো। একদিকে জ্বর, আরেকদিকে এতো সময় ধরে খেলার ক্লান্তি; কাল খেলতে খুব কষ্টই হয়েছে ভাই’। কষ্ট হয়তো ভেতরে ভেতরে তার হয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে, সমর্থকদের সে কষ্ট টের পেতে দেননি। শরীরে জ্বর নিয়ে, অস্বাভাবিক ক্লান্তি নিয়েই ইতিহাস গড়া পারফরম্যান্সের দিকে এগিয়ে গেছেন মোমিনুল হক; আমাদের নতুন লিটল মাস্টার কক্সবাজারের সৌরভ! মোমিনুল অবশ্য এসব খেতাব-টেতাবের কথা শুনলে খুব লজ্জাই পান। এই যে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে মাতামাতি, প্রাপ্তিতে উত্সব করা, প্রশংসায় ভেসে যাওয়া; এসব ব্যাপার যেন মোমিনুলের ধাতেই নেই। তাই আর দশ জনের মতো নিজের কীর্তিতে অভিভূত হয়ে যেতে পারেন না তিনি। ড্র হওয়া সিরিজের ম্যাচ সেরা, সিরিজ সেরা হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে তাই পরিষ্কার বলে দেন, ‘আমি শুধু আমার ওপর যে দায়িত্বটা ছিল, সেটা পালন করার চেষ্টা করেছি।’ মোমিনুল নিজেও মানছেন যে, তার পারফরম্যান্স অন্য কাউকে চমকে দিতে পারে। তবে নিজে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করছেন, এমন কথার সঙ্গে মোটেও একমত নয় টানা দুটো বড় বড় সেঞ্চুরিসহ দুই টেস্ট সিরিজে ৩৭৬ রান করা মোমিনুল। বললেন, তিনি শুধু নিজের উন্নতির চেষ্টাটাই করে যাচ্ছেন, ‘নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার বলতে কি আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না। নতুন কিছু আবিষ্কার করি নাই। দিন দিন উন্নতির চেষ্টা করেছি।’ এই উন্নতির পথে প্রথম টেস্টে অল্পের জন্য হাত ছাড়া হয়েছে তার সেঞ্চুরি। দ্বিতীয় টেস্টে হয়তো সেই হতাশা ঘোচানোর সুযোগ পেতেন। কিন্তু কাল তো ১২৬ রান নিয়ে আর মাঠেই নামতে পারলেন না। ডাবল সেঞ্চুরি না হোক, মাঠে নেমে আর ৩টি রান করে হাবিবুল বাশারের সিরিজ সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভাঙতে পারতেন। তবে প্রথম ইনিংস নিয়ে হতাশা থাকলেও কালকের ব্যাপারটা নিয়ে ঠিক হতাশা নেই এই ছোটখাটো তরুণের। নিয়তির ব্যাপার নিয়ে আফসোস করতে চান না, ‘আমি হতাশ নই। বৃষ্টি হয়েছে আমি এতে হতাশ নই। আল্লাহ যা করেন, নিশ্চয়ই ভালোর জন্যই করেন। রেকর্ডের ব্যাপারটা শুনেছিলাম। কিন্তু আফসোস নেই। আজকে নেমে হয়তো প্রথম বলে আউট হতে পারতাম।’ এই সর্বশক্তিমানের ওপর ভরসা রাখা, এই নির্লিপ্ত থাকা, এই নিজের কাজ করে যাওয়াই হল মোমিনুল হকের বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্যটা ধরে রাখতে চান এবার ওয়ানডে সিরিজেও। সে পরিকল্পনাও বলে দিলেন, ‘আমি যে পরিকল্পনা নিয়ে খেলছিলাম, ওয়ানডেতেও সেই পরিকল্পনা নিয়ে খেলবো। আলাদা কোনো কিছু ভাবছি না। খেলাটা উপভোগ করেছি। উন্নতির চেষ্টা করেছি। দিন দিন আরো উন্নতির চেষ্টা থাকবে।’ সে জন্য অবশ্য মোমিনুলকে আপাতত শরীরের কষ্টটাকে জয় করতে হবে, ক্লান্তি জয় করেও আবার লড়তে হবে। মোমিনুল খুবই আত্মবিশ্বাসী। ক্লান্তিটাকে যেন তখনই ঝেড়ে ফেলে ফোনের ওপাশ থেকে বললেন, ‘আমাদের ট্রেনিংই হয়েছে ছোটবেলা থেকে শরীরকে যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। আমার শরীরে কষ্ট থাকতে পারে, সেটা কাউকে টের পেতে দেব না। আমি সামর্থের সর্বোচ্চটা খেলে যাবো।’ এই কথাগুলোতেও কী নতুন দিনের গান শুনতে পাচ্ছেন না!