আলফ্রেড নোবেল যখন ডিনামাইট আবিষ্কার করিয়াছিলেন তখন তিনি কল্পনাও করেন নাই যে, তাহার আবিষ্কৃত বস্তুটির প্রধান কাজ হইবে ধ্বংস ও যুদ্ধ। ধ্বংস করা ডিনামাইটের প্রধান কাজ, ঠিক কথা, কিন্তু তাহা কি একপাক্ষিকভাবে মানুষ হত্যা করিবে, কুঠারাঘাত করিবে মানবতার পায়ে? মানব সভ্যতা নির্মাণার্থেও তো অনেক প্রতিকূলতা ধ্বংস করিতে হয়। হামেশাই তো উন্নয়নমূলক কাজে প্রতিকূলতার পাহাড় বা অন্যবস্তু উড়াইয়া দেওয়া হয় ডিনামাইট দিয়া, যাহা এমনিতেই সহজ ও সাশ্রয়ী নহে। ডিনামাইট কি সেই নির্মাণ সৌন্দর্যেই সীমাবদ্ধ থাকিতে পারিত না? চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) লইয়াও আমরা আলফ্রেড নোবেলের মতো কষ্ট পাইতে পারি।
প্রযুক্তির উভয় পিঠ অত্যন্ত ধারালো। তাহা দ্বারা যুগপত্ সৃজন ও ধ্বংস করা যায়। তাই প্রযুক্তির উত্কর্ষ যত বাড়িতেছে ততই তাহার অপব্যবহারও আমাদের কপালে ভাঁজ ফেলাইতেছে বটে। চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) দূরনিয়ন্ত্রিত হয় কম্পিউটার দ্বারা। আগামীতে কি কম্পিউটারই মানুষের বাঁচা-মরার ওপর সিদ্ধান্ত লইবে? বিশ্বশান্তি লইয়া যাহারা চিন্তাভাবনা করেন, তাহারা মনে করেন, ড্রোন নামক অস্ত্রটি ব্যবহার করিবার অর্থ যুদ্ধকে রোবটের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া। অথচ ড্রোন আপনার জন্য লইয়া আসিতে পারে গরম গরম বিকালের নাস্তা (ব্রিটেনের একটি জনপ্রিয় ফাস্টফুড প্রস্তুতকারী কোম্পানি ডমিনোস পিত্সা হোম ডেলিভারি দিতে পরীক্ষামূলকভাবে ড্রোন ব্যবহার শুরু করিয়াছে), তুলিতে পারে নয়নাভিরাম স্থির ও চলমানচিত্র। বিপরীতে তাহা কোনো লক্ষ্যবস্তুতে ফেলিয়া আসিতে পারে শক্তিশালী ‘বোমা’। এই দিক হইতে ‘শত্রু’র বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হইল নিজের গণ্ডি না ছাড়িয়াও নিজেদের সৈন্যকে কোনোপ্রকার বিপদের মুখোমুখি না করিয়াও ‘শত্রু’কে শায়েস্তা করা যায়। তাহাতে মাঝেমধ্যে কিছু নির্দোষ মানুষ মারা পড়ে বটে, কিন্তু তাহা তো যাহারা বোমা ফেলে তাহাদের ‘মানুষ’ নহে। সুতরাং সেই মানুষ আবার ‘মানুষ’ কীসের? এইভাবে ড্রোনের মাধ্যমে এমন সব দেশে ঢুকিয়া যুদ্ধ করা যায় যেইখানে বস্তুত কোনো যুদ্ধাবস্থা নাই, অথবা সরকারিভাবে কোনো যুদ্ধঘোষণা করা হয় নাই। ইহা আন্তর্জাতিক আইনবিরুদ্ধ ব্যাপারও বটে। সন্দেহ বা অনুমাননির্ভর হইয়া কথিত সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হত্যার অজুহাতে ভিনদেশের নিরীহ নাগরিকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করাটা ড্রোন যুদ্ধের অঙ্গ, অথচ যাহাদের হত্যা করা হইতেছে তাহারা বিচার পায় নাই কখনও। ইহাতে ‘মানবাধিকার’ বলিয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যেই রক্ষাকবচ আছে, তাহাতেই যে কুঠারাঘাত করা হয় বারংবার, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না।
এমতাবস্থায় লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এইবার স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছে, ড্রোন হামলায় বেআইনী হত্যাকাণ্ড ঘটিতেছে। ইহার মধ্যে কিছু ঘটনা স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধের শামিল। আরেক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) একই সুরে কথা বলিয়াছে, মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেনে ড্রোন হামলা হয় ছয়টি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এই সূত্র ধরিয়া আরও কিছু হত্যার দিকেও অঙ্গুলি নির্দেশ করা যায়। যেই সকল দেশে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের মারণাস্ত্র প্রয়োগ করা হয় নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর, হত্যা করা হয় বেসামরিক মানুষকে, তাহাতেও কি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না? এই সকল ঘটনা হয়তো এখনও ‘যুদ্ধাপরাধের’ পর্যায়ে আলোচিত হয় নাই, কিন্তু মানবতার কেতন ঊর্ধ্বাকাশে ওড়াইতে তাহা আগামীতে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলিয়া গণ্য হইতেও পারে। সুতরাং শান্তিতে বসবাসের জন্য রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যত উদ্যোগ, তাহা অহিংস পথেই সাধন করা বিধেয়।
