[ নি র্বা চ ন ]

আশা-নিরাশার দোলাচলে আমরা

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৩, ২২:০৩
টিএসসির সড়কদ্বীপ হতে প্রশস্ত পথ ধরে আস্তে আস্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দের ঝাঝালো কণ্ঠ ভেসে আসছে। উদ্যানের তীর ঘেঁষে রাস্তার দু’ধারে ঢিলাঢালাভাবে আইন-শৃংখলা বাহিনী বিমর্ষ বদনে প্রহরারত। ঢাবির মেইন লাইব্রেরীর সামনে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নতুন বিল্ডিং-এর সামনে এবং মধুর কেন্টিনে ছাত্রলীগসহ সরকার দলীয় ছাত্র নেতৃবৃন্দের অতন্দ্র প্রহরা। নিসীম নিস্তব্ধতার বুক চিরে কলা ভবনের অশান্ত কাকগুলো কেবল কা-কা করছে। এ বর্ণনার মাঝ দিয়ে বাংলাদেশের আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া যায়। আবেগ-উত্কণ্ঠায় ভরা ২৫ অক্টোবর। দুই নেত্রীর সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা রাজনৈতিক অস্থিরতার সফল সমাপ্তি হতে পারতো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। যা জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাঠামোর প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ তাদের শরীক দলগুলোর মধ্যে অনৈক্যের কারণে সেই নির্বাচনী শুভক্ষণ এখনো এসে পৌঁছায়নি। এর মাঝে গত কয়েকদিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার কাঠামো গঠনের প্রস্তাব এক ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে আসে। কারণ, ইতিপূর্বে কেবলমাত্র দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশংকা বিরাজ করছিল চতুর্দিকে। এর পর পরই মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার কাঠামোর প্রস্তাব দেয়। ফলে কূটনৈতিক মহলসহ দেশ-বিদেশের সর্বত্র আলোচনার ঝড় তুলে। এর অব্যবহিত পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মহাসচিব যথাক্রমে সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুলের মধ্যে পত্র বিনিময়সহ টেলি সংলাপের সূচনা হয়। এমনকি ২৫ অক্টোবর বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে কথা বলবেন । এর একদিন আগে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে বিএনপি উপস্থিত হয়ে নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামোর বিন্যাস তুলে ধরেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বড় দুদলের উপরোক্ত প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাব এবং বিভিন্ন কার্যকলাপ রাজনৈতিক মহলে নানা বিশ্লেষণের জন্ম দিয়ে চলেছে। বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরো দেশ, জাতি ও নাগরিক সমাজকে আশা-নিরাশায় দোলাচলে নিক্ষিপ্ত করেছে। গত কয়েক দিনের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনাসমূহের মধ্যে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক উভয় উপাদানই বিরাজ করছে। একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকের ২৪ অক্টোবরের সম্পাদকীয়তে দাবি করা হয়েছে যে, রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের উদ্যোগ ও বিএনপির সংসদে যোগদান সত্ত্বেও দেশবাসী তেমন আশ্বস্ত হতে পারেনি। সরকার ও বিরোধী দলের প্রস্তাবিত নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কোন সমাধানের পরিস্থিতি তৈরি না করে বরং উল্টো অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্মেষ ঘটিয়েছে। দ্বিতীয়ত: প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থা ঘোষণার অব্যবহিত পর ঢাকাসহ পরবর্তী সময়ে অন্যত্র সভা-সমাবেশের উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা সরকারের অবস্থান সম্পর্কে মানুষকে সন্দিহান করে তুলেছে। তৃতীয়ত: সরকারের ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দসহ মন্ত্রী-আমলাদের বক্তব্য-বিবৃতি ও সরকারের বিভিন্ন বিভাগসমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতার প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে। চতুর্থত: দিনাজপুরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর উগ্র মন্তব্য এবং জাতীয় সংসদে জমিরউদ্দীন সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব উত্থাপনের পর সরকার দলীয় সাংসদদের কুরুচিপূর্ণ জিয়া বিরোধী বক্তব্য শাসকদলের সদিচ্ছার অভাগের কথাই জানান দিয়ে যাচ্ছে। এতসব নেতিবাচক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সত্ত্বেও অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ নিয়ে এখনো আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। আমাদের জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশন ৭ নভেম্বর পর্যন্ত চালানোর সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ফলে যে কোন বাদ-বিবাদ চলতি সংসদেই সমাধান করা যাবে বলে পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। আশাবাদীদের যুক্তি হলো, আমাদের শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গত এক সপ্তাহের যুগান্তকারী ঘটনাপ্রবাহ এ আভাস দিচ্ছে যে, আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা খুবই জটিল হলেও তা সমাধান অবশ্যই হবে । উদাহরণ স্বরূপ, প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব, বিরোধী দলীয় নেতার নির্দলীয় সরকারের পাল্টা প্রস্তাব, বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের চিঠি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ফোন প্রভৃতি ঘটনা অচিরেই স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করবে। তাঁদের আরেকটি যুক্তি হলো, কূটনৈতিক মিশনসহ বিদেশি দাতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার আশু সমাধানে নিরলস ভূমিকা পালন করে চলেছেন। জাতিসংঘসহ বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইইউ,আরব দেশের কূটনৈতিকবৃন্দ— সকলেই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ফোরামে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতা দূর করতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের প্রতি অব্যাহত চাপ দিয়ে চলেছে। এসব কূটনৈতিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগের একটি স্পিল অভার ইফেক্ট আমাদের রাজনীতিতে প্রতিফলিত হবে বলে সর্ব মহলের বিশ্বাস। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব তারানকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয় নেতার সাথে ফোনে কথা বলেছেন। এর পাশাপাশি খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাজ্যের বিবৃতি, ভারতীয় হাইকমিশনের ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মধ্যকার বৈঠক এবং সর্বশেষে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার নয়াদিল্লি গমন আশাবাদীদের আশার আলো প্রজ্বলিত করে তুলেছে। এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর সরকার ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করা যাক। প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের অধীনে থেকে সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাত্ তাঁর কাছে সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যে সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে রচিত হয়েছে। প্রস্তাবিত সরকার কাঠামোয় বিরোধী দলের সদস্যদের অংশগ্রহণ নিয়ে তাঁর কোন মাথাব্যথা নেই। অপরদিকে, বিরোধী দলীয় নেত্রীর সরকার কাঠামোয় প্রস্তাব অসম্পূর্ণ হলেও অসমাধানযোগ্য নয়। এ পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা গেছে, তাঁর প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের কেয়ারটেকার সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে অসুস্থ, অনিচ্ছুক ও মৃত ব্যক্তিদেরকে বাদ দিলে প্রস্তাবিত সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুরূহ। মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীও সরকার দলীয় ব্যক্তিদেরকে বা সরকারের সমর্থক ব্যক্তিদেরকে প্রস্তাবিত সরকার ব্যবস্থায় রাখার ব্যাপারে কোনভাবে দ্বিধান্বিত নন। এমন অদৃশ্য একটি ইংগিত তাঁর প্রস্তাবে রয়েছে। অর্থাত্ দুনেত্রীর উভয়েই প্রস্তাবিত সরকার ব্যবস্থায় উভয়ের প্রতিনিধিত্ব বা নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব হতে চাচ্ছেন। এই একটি জায়গায় দৃষ্টি দিলে সহজে সমস্যার সমাধান করা যায়। যেমন, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেও সংশোধিত সংবিধানের আলোকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করা যায়। আবার বিরোধী নেত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী উভয় দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যদি সেই সরকারের প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোন নির্দলীয় ব্যক্তি, অনির্বাচিত ব্যক্তি বা কোন সুশীল ব্যক্তিকে গ্রহণ করতে পারেন। অর্থাত্ প্রস্তাবিত সরকার ব্যবস্থার “প্রধান” কে ঘিরে হয়ত উভয়ের মধ্যে সন্দেহ সংশয় ও আশংকা বিরাজ করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদারতার পরিচয় দিয়ে তাঁর নিজকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার প্রধান হওয়া থেকে বিরত রাখার ঘোষণা দিয়ে অন্য এমন একজন ব্যক্তি যথা: প্রেসিডেন্ট, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রস্তাব করে বর্তমান সংকটের সমাধান করতে পারেন। আমরা পুরোজাতির নাড়ির স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি, সকলে নির্বাচন চায়। সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে চায়। একটি পত্রিকার জরিপ হতে জানা গিয়েছিল দেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার চায়। সুশীল সমাজের সিংহভাগও এমন বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন। মিডিয়াগুলোও নির্দলীয় সরকারের পক্ষে। এমতাবস্থায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিই সকলে এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। ২৫ অক্টোবরের সমাবেশের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বিএনপির সমাবেশের শর্তযুক্ত অনুমতি দিয়ে সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। আমরা সরকারকে আরো উদার হতে অনুরোধ করবো, যাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সরকার সর্বোচ্চ ছাড় দেয়। লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন