যে যাই বলুক, দেশ এখন এক চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। এর কারণ নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি কেমন হবে, কে হবে সরকার প্রধান এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল এখন মুখোমুখি অবস্থানে। অতীতের মতো এবারও দেশে হানাহানির আশংকা করছেন অনেকেই। কিন্তু আমার বিশ্বাস এ সংকটের সমাধান যত জটিল মনে হয় ততটাই সরল। সংবিধান অক্ষুণ্ন রেখে বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার গঠন কোন জটিল বিষয় নয়। এর জন্যে প্রয়োজন ত্যাগ আর দেশপ্রেম যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর মধ্যে রয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরে রুদ্ধশ্বাসে জাতি লক্ষ্য করছে সরকার ও বিরোধী দলের লোক দেখানো সংলাপের প্রস্তুতির মহড়া। এসব মহড়ার কারণে সংকটের ফোকাস এখন একটি বিন্দুতে এসে ঠেকেছে এবং তা হলো সরকার প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর থাকা না থাকার উপর। জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি এখনই বলেন তিনি তার প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারের প্রধান থাকবেন না, তা হলে সম্ভবত বিএনপি বা বিরোধী দল তার প্রস্তাবে সাড়া দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হবে এর নিশ্চয়তা নেই। তা হলে বিকল্প কী ? আমার মতে, বিকল্প পথ আছে যা এখনই সম্ভব। উভয় পক্ষের যুক্তি ও দাবি মেনে নিয়ে এবং সংবিধান সংশোধন না করেও এই সংকট সমাধান করা সম্ভব। সমাধানটি ছোট, সংসদের এক কোণে এখনও বিদ্যমান। কিন্তু কোন কারণ ছাড়াই কেউ তা ধর্তব্যে আনছেন না। গত বছরের আগস্ট মাসে আমি এ প্রস্তাব তুলে ধরেছিলাম পত্রিকায়। কিন্তু কে শুনে কার কথা ? তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই। সংকট সমাধান নয়, ক্ষমতায় বসাটাই আমাদের নেত্রীদের উদ্দেশ্য বলে মনে হয়।
সুতরাং সংগত কারণেই জনমনে একটা বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, যে দেশের রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চর্চা হয় না, নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই এবং প্রশাসন ও কালো টাকায় লালিত গুন্ডা বাহিনীর কাছে সাধারণ জনগণ অসহায়। এই “নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার” পদ্ধতির জন্যেই প্রাণ হারিয়েছে অনেকে, রক্ত ঝরেছে প্রচুর। অবশেষে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমানের বিরোধী দলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি মেনে নিয়ে সংসদে আইন পাস করেন। জাতির দুর্ভাগ্য সেই আইনটি আবার বাতিল করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যার কঠোর অবস্থানের কারণেই এই পদ্ধতিটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং কয়েকটি নির্বাচন এর অধীনে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। ইতিহাসের ঘড়ির কাটা ঘুরে এই “নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার” পদ্ধতিটি এখন জাতির কাছে বড় ইস্যু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তিনি কোনক্রমেই সংবিধান লঙ্ঘন করবেন না। অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন সঠিক নয়। সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্যে তিনি যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। বিরোধী দলীয় নেত্রী ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবিতে অনঢ়।
আমার মনে হয়, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে যে দূরত্ব তা খুব সামান্য এবং সহজেই দূর করা সম্ভব। এ জন্যে প্রয়োজন সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং কমিটমেন্ট। এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এবং তিনি তা করতে পারেন সংবিধান সংশোধন না করেই। এজন্যে তাকে জাতির স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হবে। একটি নির্দলীয় সরকার গঠনের জন্য তিনি ও তার দলের মাননীয় সংসদ সদস্যগণ বর্তমান সংসদে নির্দলীয়ভাবে “স্বতন্ত্র” হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সর্বাধিক ভোটে নির্বাচিত সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করতে পারেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী যেহেতু কোন দল থেকে নির্বাচিত নন, সেহেতু তিনি নির্দলীয় এবং নির্বাচিত ব্যক্তি যা সরকার বা বিরোধী দল উভয়ের দাবি পূরণে সক্ষম। নতুন প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধান বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে অথবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী একটি নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করবেন নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার জন্যে। যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় কেউ নির্বাচন করতে পারেন না, সেহেতু স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ অকার্যকর হবে এবং পুরো সরকারটি একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে রূপ নেবে যা বিরোধী দলের দাবি। সংবিধানের আলোকে সরকার গঠিত হওয়ায় এতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান দাবিও পূরণ হবে। এক্ষেত্রে আমি আশাবাদী যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকার সুযোগ হারাবেন না। কারণ তিনি ইতিমধ্যে বলেছেন, দেশের স্বার্থে তার পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মতো তিনিও যে কোন আত্মত্যাগে প্রস্তুত। তাই জনগণ আশা করছে, দেশের এই সংকট শীঘ্রই মিটে যাবে এবং সেটা হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমেই।
আমার প্রস্তাব মতে, চলমান বর্তমান সংসদে এ পদক্ষেপ নেয়া হোক। নির্দলীয় বা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান নির্বাচনের রেওয়াজ চালু হলে, ভবিষ্যতে দেশে ভালো নেতৃত্বের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং দলীয় সংকীর্ণতা সৃষ্ট বিরোধ হ্রাস পাবে।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাক্তন ছাত্রনেতা
E-mail: [email protected]
