আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনীতিতে সংঘাত চায় না বলেই সমঝোতা চাইছে বলে মন্তব্য করেছেন দুই দলের দুই জ্যেষ্ঠ নেত্রী কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপে নিজ দলের পক্ষে পৃথকভাবে তারা এ মন্তব্য করেন। সমঝোতা না হলে সংঘাত এড়ানো যাবে না বলেও তারা মনে করেন।
‘দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী সংকট নিরসনে একে অপরের প্রস্তাব মেনে না নেয়ার ফলে দেশে কি সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে?’- একজন দর্শকের এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিমা রহমান বলেন, সমঝোতা না হলে সংঘাত হতে পারে। তবে সমঝোতা যে হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বরং আমরা এ ব্যাপারে আশাবাদী। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাতে অনেক বেশি নির্যাতিত হয়েছে। গুম-হত্যা-জেল-মামলা সহ্য করেছি আমরা। এরপরও বিএনপি জনগণের কষ্ট হবে, এমন বিবেচনা করে তেমন কোনো কঠিন আন্দোলন করেনি। সংঘাত চাই না বলেই সমঝোতার কথা বলছি।
বিএনপির এ ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, সরকার ইতিবাচকভাবে এগিয়ে আসলে সংঘাত হবে না। বিরোধী দলের ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে সংঘাত এড়ানো যাবে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত দায়-দায়িত্ব সরকারেরই।
প্রতিউত্তরে মতিয়া চৌধুরী বলেন, বিরোধী দলে থাকতে আওয়ামী লীগ কম নির্যাতন সহ্য করেনি। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ অনেকের মৃত্যু, শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ নানাজনের উপর হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তখনও আমরা বলিনি, নির্বাচনে যাবো না। এখন পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। সংঘাত আমরাও চাই না। তাই সমঝোতা চাই।
তিনি বলেন, নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানসম্মত একটি পদ্ধতি রয়েছে। এটি অনুসরণ করলেতো কোনো বাধা থাকে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ঈদের পর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সরকারের সর্বদলীয় একটি রূপরেখা দিয়েছে। বিরোধী দলকে এটি বিবেচনা করতে হবে। সংঘাতের পরিস্থিতি কিছুটা তৈরিও রয়েছে। আর সংঘাত হলে অনেকের লাভও রয়েছে।
নির্বাচনকালীন সরকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে সেলিমা রহমান বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগই তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়ে আন্দোলন করেছে। এবার তারা এটি বাতিল করতে আদালতকে দায়িত্ব দিয়েছে। আদালতের রায় আওয়ামী লীগ নিজেদের মতো ব্যবহার করেছে। সংবিধান পবিত্র দলিল। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ নিজেদের স্বার্থে এটি পরিবর্তন করেছে। তারপরও যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান নির্দলীয় হতেই হবে। আমাদের নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী নয়। তাই সরকার উপ-নির্বাচন ও সিটি নির্বাচনের যে দোহাই দেয়, তা যথার্থ নয়। সিটি নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন এক বিষয় নয়। সব দলের সমান সুযোগের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার। এজন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারই উপযুক্ত।
প্রতিউত্তরে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে নির্বাচনের পর তখনকার সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছিল। সেকথা দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে বিএনপি হরতাল দিয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীরা এ জন্য হয়রানির শিকার হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলেও পাসের হার কমে গিয়েছে। বিএনপি সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেনি, এ কথা ভুল।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা অনেক দেরি হয়ে গেছে। রাষ্ট্রপতি সব দলের মত নিয়েই এখনকার নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব মানলে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করবে।
এ প্রসঙ্গে প্যানেল সদস্য সংস্কৃতিকর্মী রোকেয়া প্রাচী বলেন, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা পাঁচ বছর পরপরই আসছে। সংঘাতের মুখে আমরা বারবার গিনিপিগ হয়ে যাই। সরকারের জন্যই নির্বাচন। নির্বাচনের জন্য সরকার নয়। এ প্রশ্নে স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি এক্ষেত্রে আলাদা করা যাবে না।
অপর প্যানেল সদস্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাতেমা আনোয়ার বলেন, দুই দলই সংঘাত এড়াতে চাইছে বলে এখন মনে হচ্ছে। বিশ্বাসের ও আস্থার অভাবের কারণেই এত বিতর্ক। সংবিধানতো নাজিলকৃত ওহি নয়। জনগণের জন্যই সংবিধান। সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
জামায়াত-হেফাজতকে নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে নারীর অগ্রগতি ব্যাহত হবে কিনা, দর্শকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো দল বা কয়েকজন ব্যক্তির মন্তব্যে নারীদের ঘাবড়াবার কারণ নেই।
কর্মজীবী একজন পুরুষের মত একজন কর্মজীবী নারীরও কি ক্যারিয়ারের দিকেই বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত, এমন প্রশ্নে উপস্থিত দর্শকদের প্রায় ভাগই ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেন।
উল্লেখ্য, বিবিসির ‘একশো নারী’ শীর্ষক বিশেষ অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসাবে শুধু নারীদের অংশগ্রহণে গতকালের সংলাপের আয়োজন করা হয়। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থাকে নারীদের দৃষ্টিতে দেখতেই এ আয়োজন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
