রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে দেশবাসী বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন যে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যখন ফোন করে আলোচনায় বসতে চেয়েছেন, এমনকি সৌজন্য প্রকাশ করে সোমবারের নৈশভোজে আমন্ত্রণও জানিয়েছেন তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী নিশ্চয়ই সাড়া দেবেন দেশের ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া এক ফুত্কারে সব আলো নিভিয়ে দিলেন।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৮ দলের সমাবেশের দৃশ্য দেখার পর আমি নিশ্চিত ছিলাম যে প্রধানমন্ত্রী ফোন করলেও বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে সে ডাকে সাড়া দেয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কারণ হিসেবে বলি—
প্রথমত. সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশটি আসলে ১৮ দলের ছিল না, ছিল জামায়াতে ইসলামী তথা শিবিরের। মঞ্চ ও এর আশপাশ ছেয়েছিল জামায়াতের পোস্টার-ফেস্টুনে। মঞ্চের সামনে গোটা এলাকা ছিল জামায়াতের দখলে। ছাত্রদলের কর্মীরা নিজেদের দখল রক্ষার চেষ্টায় ধস্তাধস্তি করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে। বিএনপি নেতৃত্বের আপোসকামী অংশ তাদের থামিয়ে দিয়ে জামায়াত-শিবিরকে জায়গা করে দিয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় জামায়াত-শিবির এ সমাবেশটাকে তাদের চূড়ান্ত আঘাত হানার ঘোষণা দেয়ার কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছে। পুরো সমাবেশের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছে তারা। এটা তো করা হয়েছে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থেকেই।
দ্বিতীয়ত. সমাবেশে বক্তৃতা শুরু হয়েছে ছাত্রশিবিরের নেতাকে দিয়ে। ওই নেতা শুরুতেই বলে দিয়েছে যে তারা সংলাপ-টংলাপে বিশ্বাস করে না, তারা হাসিনা-সরকারকে নভেম্বরের ৭ তারিখের মধ্যেই কবর দিয়ে জেলখানায় আটক তাদের বন্দি ও দণ্ডপ্রাপ্ত নেতাদের মুক্ত করে আনবে। যে সমাবেশ শুরু হয় যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে সেই সমাবেশ থেকে কোনো শান্তির বাণী উচ্চারিত হতে পারে না—এ তো বোঝাই যায়। আরও বোঝা যায় যখন সাদেক হোসেন খোকার মতো এক বিএনপি নেতা সংবিধানকে তেজপাতার সঙ্গে তুলনা করেন। অর্থাত্ শিবির নেতার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেন সেই বিএনপি নেতা যিনি মুক্তিযোদ্ধার তকমাধারী এবং সমাবেশের সভাপতি। খালেদা জিয়ার যে সংলাপে যাওয়ার সুযোগ নেই, এ থেকেই তা বোঝা যায়।
তৃতীয়ত, খালেদা জিয়া তাঁর বক্তৃতায় যা বলেছেন, তা হলো—আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি কারাগারে বন্দি নেতাদের মুক্ত করে আনবেন। এই নেতারা কারা? বোঝাই যায়, তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, কামারুজ্জমানের কথাই নাম উচ্চারণ না করেও বুঝিয়েছেন। কাজেই তিনি সংলাপের রাস্তায় যে হাঁটবেন না—এটা বোঝাই যায়।
চতুর্থত. বেগম জিয়া বক্তৃতায় বলেছেন সরকারকে তিনি দু’দিনের সময় দিয়েছেন সংলাপের ব্যবস্থা করার জন্য। প্রকৃতপক্ষে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন শুক্রবার সন্ধ্যায়, আর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে শনিবার সন্ধ্যায়। তিনি যদি রবিবার সকাল ছ’টা থেকে ৬০ ঘণ্টার হরতালের কথা বলেন, তা হলে তাঁর উচিত ছিল শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা। কিন্তু তিনি অজুহাত হিসেবে জানালেন যে নেতাকর্মীদের যোগাযোগ করার অসুবিধের কারণে তিনি তিনদিনের হরতাল প্রত্যাহার করতে পারছেন না। অর্থাত্ সংলাপ শুরু করার ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষণাটি নেহাত্ ধাপ্পা ছাড়া আর কিছু নয়। বিদেশি কূটনীতিকদের দেখাতে চাইলেন যে তিনি সংলাপ চান। এজন্যই তাঁকে ওই কথা বলতে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি জামায়াত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত বিধায় সংলাপের রাস্তা থেকে সরে যাওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় নেই।
পঞ্চমত. তিনি সরকারকে ২৭ অক্টোবরের পর থেকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন এই সরকারকে সহযোগিতা না করার জন্য। এ ধরনের আহ্বানের মাধ্যমে তিনি যে সংলাপে বসবেন না, তা বুঝিয়েই দিয়েছেন। এ দেশে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়ার পরেও তিনি কি এটা বোঝেন না যে সরকার বদলায় সংবিধানের নির্দেশিত পথে? এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রীতি। আর স্বৈরতান্ত্রিক-সামরিকতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় সরকার বদলায় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে—সংবিধানকে উপেক্ষা করে কিংবা সংবিধানকে বাতিল করে দিয়ে। এর অর্থ হচ্ছে, এ ধরনের বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সংলাপের পথ রুদ্ধ করা।
ষষ্ঠত. তাঁর বক্তৃতা থেকেই বোঝা যায় তিনি সাজানো ছকের ভেতর দিয়েই চলেছেন। ছকটি হচ্ছে—সংবিধানের ধারে-কাছে না গিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির পথ। এজন্য তিনি বিভিন্ন সময় বার বার শুধু আল্টিমেটামের পর আল্টিমেটাম দিয়ে চলেছেন। তিনি পারতপক্ষে সংসদে যান না, নেহাত্ দায় না পড়লে। একটি ব্যাপারে আমি নিশ্চিত যে, স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারায় চলার মতো মানুষ বেগম জিয়া নন, এবং জামায়াতও কখনো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সেই জামায়াত যখন তাঁর রাজনৈতিক পথচলার প্রধান চালিকাশক্তি তখন তাঁর পক্ষে সংলাপের পথে পা রাখার কোনো কারণ নেই। আমার নিশ্চিত হওয়ার পক্ষে এইগুলোই ছিল যুক্তি। আমরা জানি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তিগুলো এমন কথা বারবার বলছে এবং চেষ্টা করছে যে সংলাপ হলেই বুঝি সবকিছুর ফয়সালা হয়ে যাবে। দুই দলের দুই নেত্রী বসলেই বুঝি দু’দল গলাগলি করে নির্বাচনের আসরে নেমে পড়বে। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দর্শনগত অবস্থান কি তাঁরা জানেন না? অবশ্যই জানেন। তারপরও তাঁরা সংলাপ নিয়ে বার বার চাপ দিচ্ছেন কেন? কেন বলছেন না গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কেন্দ্র হচ্ছে সংসদ? আর সংবিধান হচ্ছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যথাযথভাবে চালানোর পবিত্র দলিল।
প্রকৃতপক্ষে গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসির দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁরা বাংলাদেশকে বিবেচনা করেন। এ বিবেচনায় কোন দলটি তাঁদের স্বার্থের পক্ষে থাকবে—সেটাই দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে তাঁদের বিবেচনায় জঙ্গিবাদ হচ্ছে মূল প্রতিপক্ষ। তাঁরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে, জঙ্গিবাদের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে। আর জঙ্গিবাদ প্রতিহত করার ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ তো দূরের কথা, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠনের কাছে বিএনপি সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিবেদন করে বসে আছে। পাশ্চাত্য শক্তি বার বার তাদের ফেরাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাঁদের সর্বশেষ চেষ্টা হচ্ছে এই সংলাপ। এক্ষেত্রে বলা যায় খালেদা জিয়া রাজনৈতিক পুনর্বাসনের এই সর্বশেষ সুযোগটিও নষ্ট করলেন। আর অনেক ভুল এবং অগ্রহণযোগ্য কার্যক্রম সত্ত্বেও বিদেশি শক্তিগুলোর কাছে বেশ অনেকখানি এগিয়ে রইল আওয়ামী লীগ।
এখন প্রশ্ন হলো—বেগম জিয়া বারংবার কেন ও কোন চিন্তা থেকে এবং কাদের পরামর্শে জামায়াত-হেফাজত ও জঙ্গিবাদের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে রয়েছেন? তথাকথিত আন্দোলনের নামে সহিংস কার্যক্রমের পদক্ষেপ, জামায়াতকে আঁঁকড়ে ধরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থাকে নিঃশেষ করার আত্মবিনাশী পদক্ষেপ কেন নিলেন তিনি? তাঁর কার্যক্রম এবং জামায়াতের সন্ত্রাসী নাশকতামূলক ভূমিকা—সবমিলিয়ে মনে হয় এক প্রচণ্ড হতাশা এবং ব্যর্থতাবোধই তাঁকে এতখানি বেপরোয়া করে তুলেছে। তাঁকে সম্ভবত এই ধারণা দেয়া হয়েছে যে, জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করা গেলে একটা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা করে তিনি ক্ষমতায় বসতে পারবেন। তাঁকে এই ধারণা যেই দিয়ে থাকুক, এ কথাটি তাঁকে বোধহয় কেউই বলে দেয়নি যে, ২০০৭ ও ২০১৩ সালের চিত্রপট এক নয়। জামায়াত সঙ্গ মানে অসত্ ও সন্ত্রাসী সঙ্গ। এই সঙ্গ পরিত্যাগ অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এমনকি এখনও যদি বিএনপি এই কাজটি করে তাহলে বেঁচে যাবে। এবং তারা একটা গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারবে। আর তা না হলে তাদের বরণ করতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম লীগের পরিণতি। কাজেই সমঝোতা ছাড়া বাঁচার পথ নেই।
লেখক : সাংবাদিক, প্রকাশিতব্য দৈনিক জাগরণ-এর সম্পাদক
