ভাঙ গাড়ি- গাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে। অবাধে এ কাজটি হচ্ছে হরতালের আগের দিনে। সহিংসতা ঘটছে। হরতালে গাড়ি বের করলে ভাঙার কবলে পড়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আগের দিনে ভাঙচুরের ঘটনা কেবল অন্যের অধিকার হরণের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
হরতাল হচ্ছে। যারা জীবিকার তাগিদে গাড়ি বের করছে তারাও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এমনকি হরতালের আওতামুক্ত গাড়িও পিকেটারদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি- এমন খবরও পত্রিকায় বেরিয়েছে।
হরতাল রাজনৈতিক কর্মসূচির অংশ। এটিও এখন আর জনপ্রিয় কর্মসূচি নয়। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে হরতাল-অসহযোগের প্রতি মানুষের সমর্থন ছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা। কিন্তু এখন গনতান্ত্রিক যুগ। মানুষ আগের চেয়ে বেশি সচেতন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। হরতাল মানেই অর্থনীতির ক্ষতি। তদুপরি হরতাল দিলেই যে জ্বালাও-পোড়াও করতে হবে সেটিও সঠিক পন্থা নয়। তাহলে তো আমরা পেছনেই সরে গেলাম।
নব্বই পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনীতি অনেক দূর এগিয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা সামাল দিয়ে গড় জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশে স্থির রাখা একেবারেই সোজা কাজ নয়। সেই অর্জনকে আরো এগিয়ে নেয়াই হবে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য। এজন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ তারাই সরকার পরিচালনা করছেন কিংবা করবেন। যে অর্জনের কথা বললাম, সেটিও বর্তমান বড় রাজনৈতিক দল দুটির সময়ে সম্ভব হয়েছে। কাজেই অর্থনীতির স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিলে তা হবে সরকারেরই সহায়ক। তা যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন।
২
হরতালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, স্বকর্মসংস্থানের লোকদের। যারা নিজে কিছু করে জীবিকার্জন করে থাকেন। একদিনের হরতাল মানেই তাদের রোজগার বন্ধ। এভাবে একদুই তিন দিন ধরে কিংবা লাগাতার হরতাল যদি চলে, তাহলে মাস শেষের ব্যয় ভার বহন করাই দুঃসহ হয়ে পড়ে। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন দু’পয়সা আয়ের জন্য। হরতালেও তাই ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ গাড়ি বের করেন। কারণ চাকা ঘুরলেই তার টাকা। এই শহর নিয়ে তো এমন প্রবাদই আছে- চাকার শহর, টাকার শহর। সেখানে চাকাই যদি না ঘুরে, তবে টাকা আসবে কোত্থেকে? আর হরতালের চিত্র দেখে সেই স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময়কার লেখা আল মাহমুদের কবিতার ক’টি লাইন মনে পড়ে যায়-
‘ঢাকা শহর চাকার শহর টাকার শহর ভাই/ বাস পুড়িয়ে লাশ পুড়িয়ে খুশির সীমা নাই।/ হপ্তা দুদিন হরতালেতে হাল্কা চালে হাঁটা/ কেউ রেঁধে খায় ঝাল-খিচুড়ি কারো কপাল ফাটা।’/(সুরসুরির ছড়া/ আল মাহমুদ, এক চক্ষু হরিণ ১৯৮৯)
৩.
ভারতের পিঁয়াজ রাজনীতির কথাই ধরুন না, না লাভ, না ক্ষতির কাজটিই তারা করছে জনতুষ্টির জন্য। পিঁয়াজের দাম যেভাবে বেড়েছে, দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিতও কয়দিন পিঁয়াজ খেতে পারেননি। তারই যখন এই অবস্থা, তখন সাধারণ মানুষের কি হবে- তা ভেবে রাজ্য সরকার বিনা লাভে পিঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে। আসছে ৪ ডিসেম্বর দিল্লী রাজ্যসভা নির্বাচন। নির্বাচনের আগে এভাবে পিঁয়াজ বিক্রি নির্বাচনী আচরণ বিধিতে পড়ে কি না, তার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। বিনা মুনাফায় পিঁয়াজ বিক্রির অনুমতি চেয়ে আবেদন করার পর সঙ্কট বিবেচনায় রেখে কমিশন তাদের পিঁয়াজ বিক্রির অনুমতি দেয়। অর্থাত্ নো লস, নো প্রফিট। হোক না নির্বাচন সামনে, সাধারণ জনগণ তো কম দামে পিঁয়াজ পেল। ভারতের খাদ্য ও সরবরাহ বিভাগ গত শনিবার থেকে দিল্লীর ৪০০ পয়েন্টে ৮০টি ভ্যানে করে পিঁয়াজ বিক্রি শুরু করে। প্রতি কেজি পিঁয়াজ ৫৫ রুপি। যেখানে খুচরা বাজারগুলোতে বিক্রি হতো ৭৫ থেকে ৯০ রুপি দরে। এখানে শিক্ষণীয় যে, ১৯৯৮ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের পতন হয়েছিল পিঁয়াজের দাম বাড়ার কারণেই। কিন্তু বাংলাদেশে? ক্রমেই বাড়ছে পিঁয়াজের দাম। হরতালের কর্মসূচি দেয়ার পর একশ’ পাঁচ টাকায় লাফ দিয়েছে পিঁয়াজ। বিক্রেতারা বরাবরই সরবরাহ কম, পাইকারী বাজারে দাম বেশি ইত্যাদি বলে থাকেন। বাংলাদেশের বাজারে দামের উল্লম্ফন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। সবাই জানে, এই বাজার নিয়ন্ত্রণে নিতে হলে স্বার্থান্ধদের দিয়ে চলবে না। আর এসময়ে তো কারো গরজ নেই। রাজনীতিতে সরকারি দল আর বিরোধী দলের যে অনড় অবস্থান, তাতে প্রান্তিক ভোটার কত দামে পিঁয়াজ কিনেছে তা নিয়ে ভাববার সময় কার আছে।
৪.
অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হয়। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে ছাড়ের মানসিকতাও থাকতে হবে। দুই নেত্রীর ফোনালাপের পর রাজনীতিতে সাধারণের যে ঔত্সুক্য তৈরি হয়েছে তা চলমান থাকুক। রাজনীতিতে সংকট হতেই পারে। রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি দিয়েই সেই সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কারো লাভ ক্ষতি নয়, বরং উভয়ের জন্যই সম্মানের এবং মঙ্গলের- এমন পদক্ষেপ নেয়াটাই হবে বাঞ্ছনীয়। ভারতের পিঁয়াজ রাজনীতির মত ‘নো লস- নো প্রফিট’ কিংবা উভয়ের জন্যই ‘উইন-উইন’ সিচুয়েশন হওয়ার মত অবস্থা এখনো বিদ্যমান। ফোনালাপের সূত্র ধরেই সেদিকে এগিয়ে যাওয়া যাবে। নইলে ‘কৃষ্ণগহ্বরে’ পড়ে গেলে সবার আগে রাজনীতিবিদদেরই দিশেহারা হতে হবে। তাই আর কোন ‘গোলক ধাঁধা’ নয়, ইতিবাচক রাজনীতির চর্চা শুরু হোক। এটাই এদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
