সমপ্রতি জাতীয় সংসদে ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) বিল-২০১৩’ নামে একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হইয়াছে। বিলটি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দিয়েছেন। এখন যথারীতি তাহা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কার্যকর করা হইবে। ধারণা করা হইতেছে, সরকার তাহার মেয়াদ শেষের আগে এই বিলটি আইনে পরিণত করিয়া যাইবে। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যাইতে পারে, সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ ক্ষমতা হইতে বিদায় নেওয়ার আগে বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করিয়াছিলেন। কিন্তু আইনগত অন্যান্য প্রক্রিয়া শেষ করিবার আগেই ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন এরশাদ। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর শেষ মুহূর্তে দেওয়া এরশাদের অনেকগুলি আদেশ-নির্দেশ বাতিল করিয়া দিয়াছিলেন। পরবর্তীতে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের আমলে বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বপ্রথম এইচএম এরশাদকে আটকাদেশ দেওয়া হইয়ছিল। বিদায়ের আগ মুহূর্ত ছাড়া তাহার শাসনামলের নয় বত্সরেও বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের উপলব্ধি কখনও করেন নাই এরশাদ। তেমনি বর্তমান সরকারও তাহার পুরো মেয়াদে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তাহাদের হেফাজতে নাগরিকের নির্যাতনের বিরুদ্ধে এই ধরনের আইন প্রণয়নের চিন্তা করিতেও আমরা দেখি নাই। যেই বিলটি পাস হইয়াছিল তাহা ছিলো একটি বেসরকারি বিল। বেসরকারি বা মন্ত্রীর বাহিরে সাধারণ সংসদ সদস্যের উত্থাপিত বিল পাসের বিষয়টি বিরল একটি ঘটনা বলিয়া বিবেচিত হইবে। সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি বিলটি প্রণয়নকারী। তিনি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার শুরুতেই ২০০৯ সালে বিলটি উত্থাপন করিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার তাহার পুরো মেয়াদেই বিলটি পাসে কোন উদ্যোগ নেয় নাই। তবে একথা সত্য সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা না চাহিলে এই বিল পাস হইত না। শেষ মুহূর্তে এই ধরনের বিল পাস অনেকে বাঁকা চোখে দেখিলেও তাহা প্রশংসাযোগ্য। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার এবং ১৬৭ ধারায় রিমান্ডের বিষয়ে কতিপয় নির্দেশনা দিয়া এই আলোকে আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিয়াছিলো। আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত রিমান্ড এবং ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করিবার নির্দেশনা ছিলো। কিন্তু পুলিশ ও নিম্ন আদালতকে অহরহ উচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনা অমান্য করিতে দেখা যাইতেছে।
পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে প্রায়শই নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়া থাকে যাহার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ হইতে রাজনীতিবিদগণ রহিয়াছেন। এই নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়া গিয়া হঠাত্ হঠাত্ মৃত্যুর খবরের জন্ম দেয়।
বিলে বলা হইয়াছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে কাহারও মৃত্যু হইলে দোষী ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হইবে। ইহা ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক কোনো ব্যক্তির নির্যাতনের ফলে যদি মৃত্যু হয়, তাহা হইলে দোষী ব্যক্তি অন্যূন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। উপরন্তু, ক্ষতিগ্রস্ত/সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। ইহা ছাড়া হেফাজতে নির্যাতনের জন্য সর্বনিম্ন পাঁচ বত্সরের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হইয়াছে। নির্যাতনে প্ররোচিত বা সহায়তা করিলেও জেল-জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। বিলে মামলা দায়েরের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করিতে বলা হইয়াছে। ইহা ছাড়া অভিযোগ প্রথম লিপিবদ্ধ করিবার তারিখ হইতে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করিবার বিধান রাখা হইয়াছে।
বিলে আরও বলা হইয়াছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা অথবা তাহার পক্ষে কোনো ব্যক্তির গাফিলতির কারণে অভিযোগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করিতে হইবে তাহার কারণে অভিযোগকারী ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন নাই। সামরিক শাসন এবং জরুরি অবস্থার সময়েও এই বিল নির্যাতনকারীদের হাত হইতে নাগরিককে আইনগত সুরক্ষা দিবে। বিলে বলা হইয়াছে, যুদ্ধাবস্থা, যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা জরুরি অবস্থায় অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সরকারি আদেশে নির্যাতনের অজুহাত এই ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য এবং তাহা বিচারযোগ্য হইবে। বিলে বলা হইয়াছে, আদালতের সামনে কোনো ব্যক্তি যদি অভিযোগ করেন তাহাকে নির্যাতন করা হইয়াছে, তাহা হইলে আদালত তাত্ক্ষণিকভাবে ওই ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করিবেন এবং রেজিস্টার্ড চিকিত্সক কর্তৃক তাহার শরীর পরীক্ষার আদেশ দিবেন।
উপরন্তু বিলটি জনস্বার্থসংশ্লি¬ষ্ট। কেবলমাত্র জিজ্ঞাসাবাদের কথা থাকিলেও রিমান্ড বলিতেই ক্ষতিগ্রস্তের নিকট ইহা মূর্তিমান এক বিভীষিকা। হয়রানিমূলক মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় সম্পূর্ণ নির্দোষ মানুষকে কেবল গ্রেফতার করাই হয় না, রিমান্ডে লইয়া প্রবলভাবে নির্যাতন করা হয়। এই রীতি প্রায়শই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদিগকে দুর্নীতিগ্রস্ত হইতে প্ররোচিত করে। বিগত সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বিশেষ সকল রাজনীতিবিদকে হেফাজতে নিয়া ব্যাপক নির্যাতন করা হইয়াছে। সংবিধানের বিধান লংঘন করিয়া ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হইয়াছিলো। গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে ইহা চরম অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী কার্যকলাপ। বিলের বিশেষ দিক হইলো হেফাজতে কাহারও মৃত্যু হইলে দোষী ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হইবে। অধিকন্তু, অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই প্রমাণ করিতে হইবে যে তাহার কারণে অভিযোগকারী ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন নাই। তবে সরকার বিদায় হইবার শেষ মুহূর্তে এই বিল পাস হওয়ায় সন্দেহ জাগিয়াছে যে ক্ষমতাসীনরা তাহাদের পিঠ বাঁচাইতেই এইরূপ একটি বিল বিলম্বে পাস করিয়াছে। সরকার পরিবর্তন হইলে বা বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কোনো অগণতান্ত্রিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবির্ভূত হইলে তাহাদের উপর সমূহ নির্যাতন নামিয়া আসিতে পারে, ইহার সম্ভাবনা পুরামাত্রায় রহিয়াছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেইখানে প্রশাসন তাহার স্বাধীন সত্তা হারাইয়া সরকারি দলের আজ্ঞাবহ দায়িত্ব পালন করে সেইরকম একটি পরিস্থিতিতে এই ধরনের একটি বিল নাগরিককে কিছুটা হইলেও সুরক্ষা দিবে।
