ফোনে আঁড়িপাতায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আঁড়ি!

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৩, ২১:২৭
ইন্টারনেট ও ফোনে ওয়াশিংটনের গোপন গোয়েন্দা নজরদারির কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন এডওয়ার্ড স্নোডেন। সাবেক এই মার্কিন গোয়েন্দা কর্মী সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, সারাবিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর অতি সন্তর্পনে নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ)। ‘প্রিজম’ নামের ওই গোয়েন্দা কর্মসূচির আওতা থেকে বাদ পড়ছে না নিজ দেশ এমনকি মিত্র দেশের নাগরিকরাও। সংশি¬ষ্ট দেশের সাধারণ মানুষ ওই তত্পরতার বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠার পর এবার একযোগে প্রতিবাদ জানালো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বিশেষ করে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের ফোনে নজরদারির নতুন তথ্য ফাঁস হওয়ায় নড়েচড়ে বসেন ইউরোপের ক্ষমতাসীনরা। স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যের সূত্র ধরেই গত কয়েকদিন ধরে নতুন করে প্রচার পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অতিগোপনীয় ‘প্রিজম’ কর্মসূচির কথা। একে একে এ সব তথ্য প্রকাশ করছে ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা ও জার্মানির দের স্পাইজেল ম্যাগজিনসহ বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম। এ সব তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। শুক্রবার ব্রাসেলসে ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে নেতারা এ বিষয়ে এক যৌথ বিবৃতি দেন। এতে তারা বলেন, ‘যে সন্দেহ বা অবিশ্বাসে ভর করে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশে গুপ্তচরবৃত্তিতে নেমেছে, তা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করবে’। এর আগে একের পর এক গোয়েন্দা নজরদারির তথ্য প্রচার হওয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এর ব্যাখ্যা চায় জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মধ্যে এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ফাটল দেখা দিয়েছে মনে করছেন অনেকে। সমপ্রতি গার্ডিয়ান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এনএসএ এরই মধ্যে মার্কেলের অসংখ্য ফোনকল রেকর্ড করেছে। সেই সাথে জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের লাখ লাখ নাগরিকের টেলিফোনেও আড়ি পেতেছে সংস্থাটি। এ সংক্রান্ত গোপন প্রমাণাদি হাতে আসার কথা দাবি করেছে গার্ডিয়ান। সংবাদপত্রটি জানায়, শুধু আঞ্জেলা মার্কেল নয়, ৩৫ জন বিশ্বনেতার ফোনে আড়ি পাতে এনএসএ। তবে সর্বশেষ জার্মানির দের স্পাইজেল ম্যাগাজিন জানায় আরো ভয়াবহ তথ্য। চ্যান্সেলর হবার আগে থেকেই নাকি অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের মোবাইলে নজরদারি করছে ওয়াশিংটন। ম্যাগাজিনের দাবি, এনএসএ’র ফাঁস হওয়া ২০০২ সালের গোপন তালিকায় মার্কেলের মোবাইল নম্বর রয়েছে। ২০১৩ সালের তালিকাতেও ঐ নম্বর তালিকাভুক্ত রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কিভাবে, কখন, কতটুকু নজরদারি করা হয়েছে বা নজরদারির ধরন কী, তা ঐ তালিকা থেকে জানা যায়নি। তবে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যে কোন মোবাইলের কথাবার্তা রেকর্ড করা বা তার সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারীদের তালিকা পাওয়া বর্তমান প্রযুক্তিতে সম্ভব বলে জানিয়েছে দের স্পাইজেল। জার্মান ম্যাগাজিনের দাবি, ইন্টারনেটে গুপ্তচরবৃত্তি বা ফোনে আড়ি পেতে তথ্য সংগ্রহের কাজটি করছে বার্লিনের খোদ মার্কিন দূতাবাস। ঐ ভবনের ভেতরের আছে ‘স্পেশাল কালেকশন সার্ভিসেস’ নামের একটি বিশেষ ইউনিট। যার কাজ হলো- আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বার্লিনের সরকারি আবাসিক এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা। ফাঁস হওয়া নথিপত্রে বলা হয়েছে, সারাবিশ্বের প্রায় ৮০টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিশেষ ইউনিট কাজ করছে। এর মধ্যে ১৯টিরই অবস্থান ইউরোপের বিভিন্ন নগরীতে। ব্রাসেলসে ইইউ শীর্ষ সম্মেলন চলাকালে বিবিসিকে অ্যাঞ্জেলা মার্কেল জানান, আমেরিকান বন্ধুদের আচরণে ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুবই মর্মাহত। শীর্ষ সম্মেলনে জানানো হয়, জার্মান চ্যান্সেলরের ফোনে নজরদারির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এবং এটা বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিতে এ সপ্তাহেই ওয়াশিংটন যাচ্ছেন জার্মানির গোয়েন্দা প্রধানরা (অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক)। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা নজরদারির ইস্যুটি ইউরোপের সাধারণ জনগণের মধ্যে তৈরি করেছে গভীর উদ্বেগ। তাই জার্মানি ও ফ্রান্স উভয়েই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে খোলামেলা আলোচনা চাইছে। যেখানে নতুন করে বোঝাপড়া তৈরি হবে। এর জন্য কোন কালক্ষেপন নয়, বরং চলতি বছরের শেষ নাগাদই আলোচনার দাবি জানিয়েছে তারা। আর এমন দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। আলোচনা প্রক্রিয়ায় ইউরোপের অন্যান্য দেশও অংশ নিতে পারবে বলে জানানো হয়েছে। বিবৃতির বাইরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদের বক্তব্য ছিলো বেশ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘যে অতীত জেনে আলোচনার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক বা কর্মপরিকল্পনা নেয়া হবে। যার লক্ষ্য হবে গোয়েন্দা নজরদারির সব ম্যাকানিজম বন্ধ করা’। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র কেইটলিন হেডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের ফোনে কখনো আড়ি পাতা হয়েছিলো কি-না। তিনি জানিয়েছিলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর যোগাযোগের কোন মাধ্যমেই অতীতে নজরদারি করা হয়নি, বর্তমানে করা হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে কোনকালেই তা করবে না ওয়াশিংটন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা তথ্য এবং বৈদেশিক সম্পর্কে এর প্রভাব খতিয়ে দেখছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেই। এ কাজে তিনি নিয়োজিত করেছেন নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞের বাইরে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের। তথ্য ফাঁস হবার পর কিভাবে আস্থা সমুন্নত রাখা যায় সে ব্যাপারটিও পর্যালোচনা করছেন তারা। এ সব গেলো রাষ্ট্রের বাহ্যিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা। বিশে¬ষকদের মতে, আসলে ইউরোপীয় নেতারা যেটা চাইছেন, তা হলো নতুন গোয়েন্দা সহযোগিতা চুক্তি। যেটা হবে ‘ফাইভ আইজ’ চুক্তির সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ১৯৪৬ সালে একটি টপ সিক্রেট গোয়েন্দা সহযোগিতা চুক্তি সই করে। পরে বিভিন্ন নথিপত্রে ঐ চুক্তির নাম ‘ইউকেইউএসএ এগ্রিমেন্ট’ হিসেবে উলে¬খ পাওয়া যায়। ঐ চুক্তিতে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে গোয়েন্দা সহযোগিতার মৌলিক বিষয় উলে¬খ ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঐ চুক্তিতে যোগ দেয় কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। পাঁচটি দেশের অংশগ্রহণ থাকায় চুক্তিটি পরে ‘ফাইভ আইজ’ বা ‘পঞ্চ চোখ’ নামে অভিহিত হয়। বিশে¬ষকরা বলছেন, ফ্রান্স ও জার্মানি চাইছে ঐ চুক্তির আদলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন চুক্তি। প্রাথমিকভাবে এর নাম হতে পারে ‘নো স্পাইং প্যাক্ট’।