হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার সন্দেহ নাই। প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে আমাদের দেশে এই অধিকারের যথেচ্ছ প্রয়োগ চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্। কিন্তু কোনো অধিকারই সীমাহীন নহে। ঔপনিবেশিক দুঃশাসন কিংবা স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের উত্তেজনাকর দিনগুলিতেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দিয়াছেন। সংবাদমাধ্যম ও চিকিত্সাসহ জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়কে বরাবরই হরতালের আওতামুক্ত রাখা হইয়াছে। স্বাধীন দেশে সেই দায়িত্বশীলতা আরও বাড়িবার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইহার উল্টোটাই যেন ঘটিয়া চলিয়াছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কথা বলা হইলেও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির মতো অনভিপ্রেত ঘটনা হইয়া উঠিয়াছে হরতালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকী হরতালের আগের দিনও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিতেছে নিয়মিত। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের বিষয় হইল, সংবাদমাধ্যম ও চিকিত্সার মতো জরুরি সেবাও আক্রান্ত হইতেছে। নির্বিচারে ধ্বংস করা হইতেছে ট্রেন ও বাসের মতো মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ। রক্ষা পাইতেছে না আদালতও। বিরোধী দলের ডাকা ৬০ ঘন্টার হরতালও ইহার ব্যতিক্রম নহে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে হরতাল চলাকালে দুইটি ট্রেনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছে জয়পুরহাটে। ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে রকেটমেইল এক্সপ্রেসের দুইটি বগি। রবিবার রাত্রির অন্ধকারে তিনশত ফুট রেললাইন উপড়াইয়া ফেলা হইয়াছে লালমনিরহাটে। রেললাইন ও ফিশপ্লেট উপড়াইয়া ফেলার কারণে লাইনচ্যুত হইয়াছে দুইটি ট্রেন। একইভাবে ভোররাত্রে অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে রাজধানীর গাবতলীতে বিআরটিসি ডিপোতেও। ইহাতে পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে বিআরটিসির সদ্য আমদানিকৃত ছয়টি দ্বিতল বাস। চাঁদপুর, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার শিকার হইয়াছে সংবাদপত্র বহনকারী যানবাহনও। ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি আটকাইয়া রাখিয়া সংবাদপত্র পরিবহনে বাধা দেওয়া হইয়াছে। অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে পত্রিকায়। মারধর করা হইয়াছে পরিবহনকর্মীদের। রক্ষা পায় নাই রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সও। ব্যাপক আকুতিমিনতি সত্ত্বেও চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়িতে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে গাড়ি হইতে জোরপূর্বক নামাইয়া দিয়া তাহাতে অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে। অসুস্থ শিশুকন্যাকে হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার পথে নগরীর দামপাড়ায় ইটপাটকেল নিক্ষেপে আহত হইয়াছেন শিশুটির মা ও নানি। সীতাকুণ্ডে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করা হইয়াছে। অগ্নিসংযোগ করা হইয়াছে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের সংরক্ষিত নথি শাখায়। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হইলেও পুড়িয়া গিয়াছে তিন শতাধিক মামলার নথি। খাগড়াছড়ি ও রাজশাহীতে কালীমন্দিরে হামলার খবরও ছাপা হইয়াছে সংবাদপত্রে। সামগ্রিক চিত্রটি শুধু যে উদ্বেগজনক তাহাই নহে, বরং যেই উদ্দেশ্যে এই হরতাল আহ্বান করা হইয়াছে তাহার মৌল চেতনারও পরিপন্থী বলিয়া আমরা মনে করি।
আমরা হরতালের বিপক্ষে নহি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকল দলেরই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার রহিয়াছে। প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে হরতালের প্রয়োগও নূতন বা আকস্মিক নহে। ক্ষমতাসীন দলও অতীতে অনেক হরতাল করিয়াছে। আবার স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে বর্তমান সরকারি ও বিরোধীদল উভয়ে যৌথভাবেও এই হাতিয়ারটি ব্যবহার করিয়াছেন ব্যাপকভাবে। অতএব, হরতাল লইয়া আমরা ততটা উদ্বিগ্ন নহি। আমাদের উদ্বেগের মূল কারণ হইল— সীমালঙ্ঘন। হরতাল আহ্বানকারীরাও স্বীকার করিবেন যে উপরে যেই চিত্রটি তুলিয়া ধরা হইয়াছে তাহা নিঃসন্দেহে সেই সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যম ও চিকিত্সাসহ জরুরি সেবাগুলিকে অবশ্যই হরতালের আওতামুক্ত রাখিতে হইবে। সর্বোপরি, হরতালের নামে ট্রেন ও বাসসহ সর্বপ্রকার জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের আত্মঘাতী প্রবণতার লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে শক্ত হাতে। সরকারি ও বিরোধী উভয় দলেরই দীর্ঘসময় দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রহিয়াছে। অতএব, দরিদ্র এই দেশটির সম্পদের বিপুল সীমাবদ্ধতার বিপরীতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা এইসব সম্পদের গুরুত্ব কতোখানি— তাহা না বলিলেও চলে।
