[ রা জ নী তি ]

গণতান্ত্রিক ধারা কি অব্যাহত থাকবে

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৩৮
২৬ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী দিন। ওইদিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে ফোন করেন এবং দুই নেত্রীর মধ্যে প্রায় ৩৭ মিনিট কথা হয়। প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানান এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট সমাধানের জন্য তার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাকে ৩ দিনের হরতাল প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানান। বিরোধীদলীয় নেত্রী তা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, বিরোধীদলীয় নেত্রী তার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেয়া বক্তৃতায় ২৫ ও ২৬ অক্টোবরের মধ্যে সংলাপের প্রক্রিয়া আরম্ভ না করলে ২৭ অক্টোবর থেকে ১৮ দলীয় জোট ৩ দিনের হরতালের কর্মসূচি পালন করবে বলে ঘোষণা করেন। বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রতি সন্মান দেখিয়ে এবং দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ফোন করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানান বলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ বলেন। ওদিকে বিএনপির তরফ থেকে বলা হয় যে, গত কয়েকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল যে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ফোন করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যদি এ ফোনটি ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সমাবেশের আগে করতেন তাহলে আলোচনাও শুরু করা যেত এবং আলোচনার মাধ্যমে সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছা গেলে হরতালের কোন প্রয়োজন হত না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর ফোনালাপ নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি পাল্টাপাল্টি যতই বাকযুদ্ধ হোক, বিভিন্ন মহলে ফোনালাপের উদ্দেশ্য, বিধেয় ও নিহিতার্থ নিয়ে যতই ব্যবচ্ছেদ হোক না কেন, আমার কাছে এটিকে ঐতিহাসিক ঘটনা বলে মনে হয়েছে। শেষঅব্দি কি হবে জানি না, তবে নেতা-নেত্রীরা যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে পারেন, দলীয় সভা-সমাবেশে যদি তারা একে অপরের চরিত্র হনন না করেন, রাজনীতির বাইরে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানে তাদের মধ্যে যদি বন্ধুত্বপূর্ণ আদান-প্রদান ও মেলামেশা হয়, তাহলে তা সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের গণতন্ত্র কোনভাবেই শক্তিশালী ভিত্তি পাবে না, সারাবিশ্বের কোথাও তা হয়নি। আগেকার অনমনীয় অবস্থান থেকে সরে এসে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য থেকে সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন এবং পরে তিনি সংকট সমাধানের জন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ফোন করেন। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা, সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব এবং সংকট সমাধানের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওদিকে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর ফোনকলে সাড়া দিয়ে নানা বিষয় নিয়ে ৪০ মিনিট ধরে কথা বলেছেন। এজন্য বিরোধীদলীয় নেত্রীও প্রশংসা ও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর উদ্যোগ, আয়োজন এবং কথাবার্তায় অনেকেই যেমন আশার আলো দেখছেন, আমিও তেমনি এর মধ্যে নতুন এক রাজনীতি বিকাশের অমিত সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু সেই সম্ভাবনাটা কত দূর যাবে, কতটা বিকশিত হবে, আদৌ বিকশিত হবে কি না, নাকি ভোজবাজির মত একটা চমক হয়েই থাকবে তা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও আত্মত্যাগ করার মানসিকতা এবং দেশি-বিদেশি কিছু গোষ্ঠী ও কায়েমী স্বার্থের ধারক ও বাহকদের কার্যক্রমের ওপর যারা বাংলাদেশের রাজনীতির পালাবদলে বিভিন্ন সময় নির্ধারকের ভূমিকা পালন করেছেন। প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, একটি ডানপন্থি ও উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দল হওয়া সত্ত্বেও বিএনপি যেন জামায়াতের দিকে বেশি ঝুঁকে না পড়ে অথবা জামায়াতের গর্ভে তলিয়ে না যায় সে ব্যাপারে আওয়ামী লীগ, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। অস্বীকার করছি না যে, ’৭৫-পরবর্তী সময়ে জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের পুনর্বাসনে মূল ভূমিকা পালন করেছিল বিএনপি, আবার বিভিন্ন সময়ে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থনে অথবা জামায়াতকে নিয়ে সরকার গঠনও করেছে। আবার একথাও সত্য যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা এবং সেক্টর কমান্ডারও ছিলেন। আবার বিএনপির মধ্যে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিএনপি সমর্থক তরুণ প্রজন্ম জামায়াত শিবিরকে পছন্দ করে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে নানা সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ তার প্রমাণ। আবার আওয়ামী লীগ, প্রগতিশীল গোষ্ঠী ও সুশীল সমাজ দায়িত্বশীল হলেই যে হবে তাও নয়, বিএনপিকেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আরও শানিত হতে হবে এবং জামায়াতের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে অথবা জামায়াতকে পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশকে নিয়ে জামায়াতের ভিন্ন এজেন্ডা রয়েছে। বাংলাদেশকে তারা একটি পশ্চাত্পদ ও সামপ্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, এককভাবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের শক্তি তাদের নেই। ফলে তারা বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়ে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চায়। আর এখানেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সুশীল সমাজ ও প্রগতিশীল শক্তিকে অনেক বেশি সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। কেননা মতভিন্নতা, ক্ষোভ, বিদ্বেষ, আদর্শের অমিল থাকার পরও আমরা চাই এ ভূখণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সমৃদ্ধ ও অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। ইতিমধ্যে অর্থনীতি, সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও খেলাধুলায় বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তার বিকাশের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাবে এবং দু’জনের ফোনালাপের প্রেক্ষিতে যে আশাবাদের সূচনা হয়েছে তা সুষ্ঠু, অবাধ ও সকল দলের অংশগ্রহণে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পথ সুগম করুক সেটাই সকলের চাওয়া। কিন্তু জামায়াত শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়াকে আলোচনায় আসতে দেবে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেননা সকল দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের চেয়ে জামায়াতের লক্ষ্য হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের দণ্ডিত নেতৃবৃন্দকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করা। দ্বিতীয় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের অব্যাহত হানাহানি ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এবং দুর্বল নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগের সুযোগে একটি গোষ্ঠী ওয়ান ইলেভেনের মত পরিস্থিতি তৈরি করে দেশে অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতি কতটা জামায়াত নিয়ন্ত্রিত হবে এবং অগণতান্ত্রিক কোন শাসক বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে জেঁকে বসবে কি না তা নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর ফলপ্রসূ আলোচনার ওপর। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং দেশ ও জাতির স্বার্থের কথা বিবেচনায় রেখে আলোচনায় বসবেন এবং অতিসত্বর সমঝোতায় পৌঁছাবেন বলে প্রত্যাশা করি, নইলে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন