(১) সংলাপ-আন্দোলন একসঙ্গে চলবে (২) সংঘর্ষ-গুলি, নিহত ৫ (৩) আ.লীগ অনড়। ২৬ অক্টোবরে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরগুলো দেশজুড়ে কেবল অশান্তি আর দাবানলের ইঙ্গিতই দিচ্ছে। জনমনে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা তৈরি করেছে। সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য! শান্তি বিতাড়িত। এভাবে আর কতদিন চলবে? দেশ রক্ষায় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই এ পথ পরিহার করতে হবে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দু’দলের দু’নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সবিনয় অনুরোধ, কোন অবস্থাতেই ধ্বংসযজ্ঞ আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের দিকে বাংলাদেশকে ঠেলে দেবেন না। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আপনাদেরকে আজ অনেক বেশি সংযমী হতে হবে। বিরোধীদলের যেমন উচিত, সরকারের উচিত জাতীয় সঙ্কট মোকাবেলায় সংলাপে বসা; সংকট উত্তরণে খোলা মনে আলোচনা করা। সেসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাই ধৈর্য ও বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। দেশের নাগরিকদের এখন যথেষ্ট সতর্ক হওয়ার সময়। কোনভাবেই নৈরাজ্য-সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দায়িত্বশীল রাজনৈতিকদেরও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্তরিকভাবে একে অপরের সাথে কথা বলা, সংলাপের বসা। প্লিজ আপনারা ধ্বংস, নৈরাজ্য, উস্কানি ছেড়ে আলোচনায় বসুন। এর কোন বিকল্প নেই। গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারি দলের নয়। এ দায়িত্ব বিরোধীদলেরও।
জনগণ অশান্তি চায় না; জনগণ শান্তি চায়। সোনার পালং চায় না, হীরা মনি-মুক্তা চায় না, কেবল চায় শান্তি। হরতাল চায় না, ভাংচুর চায় না, জীবন্ত মানুষ পোড়ানো চায় না, গুলিবিদ্ধ লাশ চায় না—রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে কেবল মুক্তি চায়। দেশে একটু শান্তি চায়। চুরি, ছিনতাই, গুম, হত্যা চায় না; দেশের প্রতিটা মানুষের সম্পদ আর স্বজনদের জীবনের নিরাপত্তা চায়, চায় একটু স্বস্তি। ঘুমানোর সময় নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চায়। সকালে সংবাদপত্র খুলে ভালো খবর পড়তে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের হুঙ্কার হুমকি-ধামকি, মারামারি, বোমাবাজি আর পুলিশের গোলাগুলি দেখতে দেখতে দেশের মানুষ আজ ভীত-সন্ত্রস্ত, ক্লান্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আপনারা কেউই সুস্থ রাজনীতি করছেন বলে মনে হয় না। ক্ষমতার রাজনীতিই আপনাদের কাছে মুখ্য বলে মনে হচ্ছে। তাই সম্প্রতি দলীয় নানা কর্মসূচি নিয়ে অগ্নিগর্ভ হচ্ছে রাজপথ। মরছে মানুষ; রক্তাক্ত হচ্ছে জনপথ; জ্বলছে গাড়ি, ব্যাংক, শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেবল সম্পদই নষ্ট হচ্ছে না প্রতিদিনই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। হোঁচট খাচ্ছে দেশীয় অর্থনীতি। ব্যবসা-বণিজ্যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। জনগণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের পক্ষে; সংঘাতের পক্ষে নয়। দেশের অর্থনীতিতে কেন আঘাত হানা হচ্ছে? এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের অর্থনীতি মন্দায় পড়বে দেশ।
ক্ষমতায় টিকে থাকা আর ক্ষমতার লোভ আমাদের দলগুলোকে অন্ধ করে দিয়েছে। বোধ করি দলগুলো বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলেছে। প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত লাশ দেখেও তাদের বিবেক জাগ্রত হচ্ছে না। যা হচ্ছে তা কেবল ক্ষমতার জন্যই হচ্ছে। জনসম্পদ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, দেশের অর্থনীতি, দেশের ভাবমূর্তি কোনটারই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। এর আগেও দেশে এই চিত্র আমরা লক্ষ্য করেছি। সেবার বিএনপি ছিল একগুঁয়ে, আওয়ামী লীগ নিয়েছিল রাজপথে ফয়সালার পথ। এবার আওয়ামী লীগের সরকার একগুঁয়ে, বিএনপি নিয়েছে রাজপথে ফয়সালার পথে। সেবার বিএনপি পুলিশ দিয়ে বিরোধীদল দমনের পথ নিয়েছিল। এবার নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সেবারও রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা ঠেকানো যায়নি। এবার ঠেকানো যাচ্ছে না। সমঝোতার বদলে সংঘাতের পথে হাঁটছে দেশের রাজনীতি। সব মহলে তাই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। দেশে এখন রাজনীতির নামে চলছে শক্তির লড়াই। সভ্যতা, মানবতা, সহনশীলতা, ভালোবাসা আজ নির্বাসিত এদেশের রাজনীতি থেকে। অসভ্যতা, নোংরামি, হিংস্রতা, দুর্নীতি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, সন্ত্রাস, খুনসহ অপরাধের সমস্ত কিছুই বর্তমান এদেশের রাজনীতিতে। দুটি রাজনৈতিক দলের সহিংস চলমান রাজনীতি বর্তমানে এমন পর্যায়ে যে, এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে নিজেদের হাতেই জাতি ধ্বংস হতে কতক্ষণ?
শক্তির খেলা অনেক হয়েছে। আমাদের জনগণও বুঝে গেছে, কি চাইছে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। আর জামায়াত শিবিরের চাওয়া-পাওয়াতো দেশবাসীর কাছে স্পষ্টই। আমরা এর পরির্বতন চাই। রাজনীতি হোক মানুষের কল্যাণে। কোনভাবেই, কোন অজুহাতেই জনধ্বংস বা সম্পত্তি ধ্বংস বা গোলযোগ সৃষ্টি বা কঠোর হাতে মোকাবেলা বা কঠিন কর্মসূিচ প্রত্যাশিত নয়। আশাকরি জনগণের তথা দেশের শান্তি সমৃদ্ধির কথা ভেবেই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর শুভবুদ্ধির উদয় হবে। দু’নেত্রীকে সবিনয় অনুরোধ রাখবো— অন্তর দিয়ে একবার দেশের কথা ভাবুন, অন্তর দিয়ে একবার জনগণের কথা ভাবুন। আপনাদের সুচিন্তায় অবশ্যই দেশ রক্ষা পাবে; জনগণ পাবে মুক্তি, শান্তি, স্বস্তি। আর এটাই একমাত্র সমাধান। আমি বিশ্বাস করি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো উপরোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে বাস্তবে রূপ দিলে দেশে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধান হবেই হবে।
লেখক :সাংবাদিক
