আলোকপাত

একদল অতৃপ্ত মানুষের কথা

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪০
পাবনা জেলা শহরের মানুষের জন্য এক চিলতে বিনোদন পার্ক বলতে কিছুই নেই। এই শহরের বিত্তবান মানুষ ছাড়াও প্রায় অর্ধেক মানুষই এখন আর্থিকভাবে সচ্ছল। বৃটিশ ভারতের এই জেলা শহরটি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলার একটি। অথচ এখানে আজ পর্যন্ত মানুষের বিনোদনের কোন ব্যবস্থাই নেই। নেই একটি পৌরপার্ক পর্যন্ত। শহরের অলিগলি হতে এখন এলিয়ন, প্রিমিও গাড়ি বের হয়। অনেকেই প্রাডো গাড়িতে চড়ে বেড়ান। রাস্তাঘাট মোটর সাইকেলের ভীড়। বিকেল হলেই মানুষজন একটু নিশ্বাস ফেলার জায়গা খোঁজেন। বিশেষ করে ছুটির দিনে বা উত্সবের সময় মানুষ হন্যে হয়ে একটু বিনোদনের জায়গার খোঁজে ছুটে বেড়ান। এবার ঈদ উল আযহার পরদিন শিলাইদহের উত্তর ঘাটে গিয়ে দেখলাম লোকে লোকারণ্য। কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী, দম্পতি সবাই শহর হতে এতোদূর এসেছেন একটু বিনোদনের প্রত্যাশায়। সেখানে তারা কার, জীপ, মোটরবাইক, ইজিবাইক চড়ে ভীড় জমিয়েছেন। জায়গাটা ফুচকা, চটপটি, রুটি, কলা, বিস্কুটের অস্থায়ী দোকানে ভরে উঠেছে। পদ্মা নদীর এবড়ো-থেবড়ো তীর দিয়ে তারা হেঁটে বেড়াচ্ছেন, যুগলবন্দি হয়ে কেউবা গল্প করছেন। এসব দেখতে দেখতে মনে হলো মানুষমাত্রই ভ্রমণ পিপাসু। কেউ দেশের মধ্যেই বা নিজস্ব গণ্ডির মধ্যেই একটু বেড়ানো বা বিনোদনের জায়গা খোঁজেন, আবার কেউ এজন্য বিদেশ পাড়ি জমান। কিন্তু সব শ্রেণির মানুষের পক্ষেই বিদেশ ভ্রমণ সম্ভব নয়। এমন অনেকেই আছেন যাদের জীবন শুধুমাত্র নিজ জেলা শহরেই সীমাবদ্ধ। বয়সের কারণসহ আর্থিক কারণ, যাতায়াত সমস্যা, পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা ইত্যাদি কারণে অনেকেই নিজ জেলার বাইরে যেতে পারেন না বা যেতে চান না। এমনকি অনেকে যানজটের কারণে ঢাকা পর্যন্ত আসতে চান না। এ অবস্থায় পাবনা শহরে তাদের জন্য একটু বসার বা একটু হাঁটার পর্যন্ত জায়গা নেই। এই জেলা শহরে যারা পূজা, ঈদ ইত্যাদি উত্সবের সময় ছুটি কাটাতে নিজ পরিবারের সান্নিধ্যে আসেন তারা দুই একদিনের মধ্যেই হাঁপিয়ে ওঠেন। এ বাড়ি ও বাড়ি যাতায়াত করে কিছু সময় অতিবাহিত হলেও বাকি সময় তাদের ঘরের মধ্যেই বন্দি থাকতে হয়। এভাবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই জেলা শহরে অবস্থান করা তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। কারণ বিনোদন দূরে থাক এই জেলা শহরে একটু হাঁটাহাঁটি চলাফেরা করা বা নির্মল পরিবেশে একটু বসার জায়গাও নেই। অথচ মানুষের জীবনযাপন বা স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য এই ধরনের স্থান বা পার্কের একান্ত প্রয়োজন। মানুষ কেবলমাত্র খেয়েপরেই বাঁচতে পারে না। পেটের খাদ্যের পাশাপাশি মানুষের মনের খোরাকও প্রয়োজন। আমাদের দেশটি ভূমি স্বল্পতার দেশ (LAND HUNGRY)। অন্যান্য দেশে প্রচুর ভূমি থাকায় সেখানকার প্রতিটি শহর, গ্রাম, পার্ক, মাঠ, ময়দানে ভরপুর। আর সেসব পার্ক মাঠ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। সবুজ খাস আর ফুলে ফুলে ভরা মাঠ এবং পার্কগুলো দেখলে প্রাণ জুড়ে যায়। এমনকি সিঙ্গাপুরের মত অল্প ভূমির দেশও এসবের ব্যতিক্রম নয়। আমাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে কিন্তু জমি বাড়েনি। কিন্তু তাই বলে বৃটিশ আমলের একটি জেলা শহরে মানুষের বসা বা হাঁটাচলার জন্য একটি পার্ক নেই এমন জেলা শহর বোধ হয় আমাদের দেশেও নেই। পাশের বগুড়াসহ অন্য জেলা শহরেও সুন্দর সুন্দর পার্ক আছে। শুধুমাত্র পাবনা জেলা শহরেই আজ পর্যন্ত একটি পার্ক স্থাপন করা হলো না। এখানে বহু বছরের আগে হাতে নেয়া বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ঈশ্বরদী ঢালারচর রেলপথও বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু একটি বিনোদন পার্কের ধারণা এতোদিনেও কোন সরকারের মাথায় আসে নাই। আমি মাঝে-মধ্যেই পাবনা শহরে এসে অবস্থান করায় এ বিষয়টিতে শহরবাসীর হা-পিত্যেশ অনুভব করি। ঈদের পরদিন শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার ধারে গিয়ে অনুরূপ একদল মানুষের মর্মবেদনাই অনুভব করলাম। সেখানে বেড়ানোর মত, হাঁটার মত, বসার মত কোন ব্যবস্থাই নেই। অনেকেই বললেন, কি করবো, একটু হাঁটতে, একটু বসতে, একটু ঘুরতে কোথায় যাব? এ অবস্থায় পাবনার সন্তান বর্তমান পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয়কেই বিড়ালের গলায় ঘন্টাটি বাঁধতে বলবো। জনাব, আমি আপনার সামনে একদল অতৃপ্ত মানুষের কথা তুলে ধরলাম। এবার আপনি একটা কিছু করুন। পাবনা শহরে বিনোদন পার্ক নামে একটি প্রকল্প অন্তত হাতে নিন। প্রকল্পটি হাতে নিলে দেখবেন একদিন তা বাস্তবায়িত হবে লেখক :মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন