বাংলাদেশের ক্ষমতা হস্তান্তর অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াই আজ স্বাভাবিক

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৪৪
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিয়মতান্তিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে এটাই স্বাভাবিক। এমনটি আমরা দেখতে পাই উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। অথচ বিশ্বের নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হওয়াটাই একটি অস্বাভাবিক বিষয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা জনগণের রায় অনুযায়ী ক্ষমতা ছাড়তে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন না। যে কোনো প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। যে কারণে ক্ষমতাসীনদের চেষ্টা থাকে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে নির্বাচনের ফলাফল Manipulate করার মাধ্যমে ফলাফলকে নিজেদের পক্ষে রাখার। অপরপক্ষে বিরোধী দল সচেষ্ট হয় এমন প্রক্রিয়ায় যেতে, যাতে করে তারা ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে এই অবস্থা সৃষ্টি হবার অন্যতম কারণ হলো এখানে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ না হওয়া। ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ও দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘর্ষ তাই একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্ত দেশগুলো কর্তৃত্ববাদী বা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আবির্ভূত হয়েছে। এই সমস্ত রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্রায়ণ শুরু হলেও প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে না। এই সমস্ত নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো প্রকৃত পক্ষে Quasi authoritarian কিংবা Quasi democracy হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকগণ নব্য গণতান্ত্রিক এই সমস্ত রাষ্ট্রগুলোকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে এগুলোতে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র নেই। এই বিষয়টি আমার পূর্বের একাধিক লেখাতে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা দীর্ঘদিনের নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে বৃটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন হবার পর থেকে এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে অধিকাংশ সময় কর্তৃত্ববাদী বা একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রক্রিয়া চালু ছিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলেও প্রকৃত অর্থে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষকগণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন না। কাজেই স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে এমন আশা করা বাতুলতা মাত্র। ১৯৪৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ক্ষমতা হস্তান্তর স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো ২০০১ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর। ১৯৯০ সালের পর হতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হবার পর ক্ষমতাসীন দলগুলো সচেষ্ট থেকেছে মেয়াদ শেষে কিভাবে ক্ষমতায় থাকা যায় সেই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায়। যে কারণে বারবার ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেও এবার ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। যে কোনো কারণেই হোক জনগণ এবং বিরোধী দলের মধ্যে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে আওয়ামী লীগ যেনতেন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা ধরে রাখতে চাচ্ছে। কাজেই বিরোধী দল আওয়ামী লীগ কর্তৃক সৃষ্ট নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে নারাজ। উভয়পক্ষ শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। অতীতেও এই অবস্থা আমরা দেখতে পেয়েছি। এই অবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত হয়েছে। এই অস্বাভাবিক অবস্থাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতে জন্ম দিয়েছে অগণতান্ত্রিক শক্তি। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে যে জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে অগণতান্ত্রিক শক্তির আবির্ভাব ঘটলে আশ্চর্য হবার কিছু থাকবে না। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল এককভাবে নিজের ইচ্ছাকে স্বেচ্ছাচারীভাবে প্রয়োগ করবে এমনটি হওয়া উচিত নয়। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দেখা যায় যে গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে আস্থায় এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এই সংস্কৃতি অনুপস্থিত। বাংলাদেশে তো বটেই। বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় সচেষ্ট থেকেছে ক্ষমতা ধরে রাখতে। সে সময় বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের আবির্ভাব ঘটতো না। একইভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী করার সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপিকে আস্থায় নিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে আজকের এই জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। উভয়পক্ষই শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে উভয় দলকে নমনীয় হতে হবে। শক্তি প্রদর্শন গণতন্ত্রের ভিত্তি হতে পারে না। গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো। বিগত কিছু দিনের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে উভয়পক্ষই প্রস্তুত হয়েছে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য বিরোধীদলের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় কোনো মীমাংসায় আসতে সচেষ্ট ছিলো না বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকেই সেটি মনে হয়েছে। তিনি এক চুলও নড়বেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেটি তার একগুঁয়েমির দৃষ্টান্ত। শেষ পর্যন্ত তিনি নড়ে এসে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোনে আলোচনায় বসার আহ্বান জানালে, বিরোধী দলীয় নেতার আচরণে মনে হলো যে তিনিও শক্তি প্রদর্শনের জন্য মনস্থির করে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোনের পর বিরোধীদলীয় নেতা কি পারতেন না হরতাল স্থগিত করতে? পারতেন বলেই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু তা না করে বিরোধী দল চাইছে শক্তি প্রদর্শন করতে। উভয়ের এই শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান দেবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বর্তমানে দেশে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তা সমাধানের জন্য ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল উভয়কেই আন্তরিক হতে হবে। উভয় দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি সমস্যার সমাধান করতে অপারগ হন এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকেন তবে অতীতের মত অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান অবসম্ভাবী। কাজেই উভয় দলের কাছেই স্বনির্বন্ধ অনুরোধ শক্তি প্রদর্শন পরিহার করে সমঝোতায় আসুন এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে দেশবাসীকে উদ্ধার করুন। লেখক:অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়