পিতামাতার ভরণপোষণ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৩, ২১:১৫
সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও পিতামাতার ভরণপোষণ করিতে চাহে না এমন সন্তান বাংলাদেশে খুব বেশি খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে বলিয়া মনে হয় না। কারণ এই জনপদের ঐতিহ্য হইল একান্নবর্তী পরিবারের। পিতামাতা শুধু নহে, এমনকী দাদা-দাদি, চাচা-চাচি এবং তাহাদের সন্তানসন্ততিও এক পরিবারে মিলিয়া-মিশিয়া বসবাস করিয়াছে। গ্রহণ করিয়াছে একই হাঁড়ির অন্ন। গল্পের মতো শোনাইলেও এইসব বেশিদিন আগের কথা নহে। নগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ এবং ক্রমবর্ধমান আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থা ভাঙিয়া গেলেও সেই নাড়ির বন্ধন এখনও পুরোপুরি ছিন্ন হয় নাই। তবু পরিবারগুলিতে প্রবীণদের স্থান যে ক্রমেই সংকুচিত হইয়া আসিতেছে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বৃদ্ধ দাদা-দাদি শুধু নহে, এমনকী পিতামাতারও ঠাঁই হইতেছে না প্রাণপ্রিয় সন্তানের ক্ষুদ্রাকৃতির সংসারে। ফলে তাহাদের অসহায়ত্ব বাড়িতেছে। ক্ষেত্রবিশেষে অনন্যোপায় পিতামাতাকে জীবনের শেষ দিনগুলি কাটাইতে হইতেছে কোনো বৃদ্ধাশ্রমের চরম অনাত্মীয় পরিবেশে। হতদরিদ্রদের ক্ষেত্রে অবস্থা আরও শোচনীয়। মর্মস্পর্শী সেইসব খবর শুধু যে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হইতেছে তাহাই নহে, শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতেরও উপজীব্য হইয়া উঠিয়াছে বিষয়টি। ইহার অর্থ ও তাত্পর্য খুবই স্পষ্ট। অর্থাত্ বিষয়টি এখনও সামাজিকভাবে অগ্রহণীয় হইলেও এই রূঢ় বাস্তবতাকে ঠেকাইবার ক্ষমতা পরিবার বা সমাজ কাহারও নাই। এই প্রেক্ষাপটে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘পিতামাতার ভরণপোষণ বিল ২০১৩’ শিরোনামে একটি আইন পাস হইয়াছে। ইহাতে পিতামাতার ভরণপোষণ বাধ্যতামূলক করা হইয়াছে সন্তানের জন্য। রাখা হইয়াছে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধানও। পিতামাতার অবর্তমানে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের কথাও বলা হইয়াছে। দেওয়া হইয়াছে এই সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশনাও। সব মিলাইয়া, বিলটির উদ্দেশ্য যে মহত্ তাহা বুঝিতে অসুবিধা হয় না। এমনকী আমাদের অক্ষমতাপীড়িত সমাজও যে ইহাতে তাত্ক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তিবোধ করিবে তাহাতেও সন্দেহ নাই। কিন্তু যেই প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকিয়া যায় তাহা হইল— বংশানুক্রমিক নাড়ির বন্ধনও যেইখানে অকার্যকর, সেইখানে আইন আদৌ ফলপ্রসূ হইবে কিনা। ইহার সঠিক উত্তরটি পাইতে হইলে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নাই। সর্বাগ্রে জানা দরকার, সন্তানরা পিতামাতার ভরণপোষণে অনাগ্রহী কেন? ্ইহার মূল কারণ যে দারিদ্র্য— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। যেই দেশে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বসবাস দারিদ্র্যসীমার নিচে সেই দেশে পিতামাতার ভরণপোষণে সন্তানের এই অপারগতা যে মোটেও অস্বাভাবিক নহে— তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে যাহাদের বসবাস— এমন বিশাল জনগোষ্ঠীর অবস্থাও কোনো অংশে কম করুণ নহে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে প্রাণান্ত পরিশ্রম করিয়া কোনোমতে টিকিয়া থাকা সম্ভব হইলেও সেইখানে পিতামাতার ভরণপোষণের অবকাশইবা কোথায়? বিশেষ করিয়া নগর-মহানগরগুলিতে জীবনধারণের ব্যয় হু হু করিয়া বাড়িতেছে। সেই তুলনায় আয় বাড়িতেছে না। সেই সাথে আছে বিপুল কর্মহীনতা এবং চাকুরির অনিশ্চয়তাও। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে কয়েক কোটি কর্মক্ষম তরুণ এখনও বেকার। বিষয়টি নীতিপ্রণেতাদের অজানা থাকিবার কথা নহে। ইহা সত্য যে সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও অনেকে পিতামাতার প্রতি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব পালন করেন না। তবে তাহাদের সংখ্যা খুব বেশি নহে। ইহাদের ক্ষেত্রেও বিবেক জাগ্রত করা না গেলে শুধু আইনের ভয় দেখাইয়া খুব একটা কাজ হইবে বলিয়া মনে হয় না। প্রবীণ ও অসহায় ব্যক্তিদের দেখভাল করিবার দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের। উন্নত দেশগুলিতে দীর্ঘদিন যাবত্ এই ব্যবস্থা চলিয়া আসিতেছে। বিদ্যমান বাস্তবতাদৃষ্টে বলা যায় যে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিরও এইদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার সময় আসিয়াছে। শুধু আইন করিয়া এই দায়িত্ব এড়াইয়া যাইবার অবকাশ নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন